বর্জ্য পানিতে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি দিতে পারে অগ্রিম পূর্বাভাস


111 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বর্জ্য পানিতে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি দিতে পারে অগ্রিম পূর্বাভাস
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

বাংলাদেশে বর্জ্য পানিতে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় এমনটি জানা গেছে। তারা বলছে, নিয়মিত বর্জ্য পানি পরীক্ষা করোনাভাইরাসের উপস্থিতি সম্পর্কে অগ্রিম পূর্বাভাসের একটি ব্যবস্থা হতে পারে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ জুলাই থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত নোয়াখালীর একটি আইসোলেশন কেন্দ্রের আশপাশের কয়েকটি জায়গার ড্রেন থেকে বর্জ্য পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষকদের একজন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির জিনোম রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান ড. মুহাম্মদ মাকসুদ হোসেন। তিনি বলেছেন, যেভাবে মানুষের শরীরের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয় সেরকমই রিয়াল-টাইম পিসিআরে পরীক্ষা করে আমরা সংগ্রহ করা বর্জ্য পানিতে করোনাভাইরাসের কয়েকটি জিনের অস্তিত্ব পেয়েছি।

তিনি জানান, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণে ইতিমধ্যেই যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো দিয়েই এই পরীক্ষা খুব কম খরচে করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পানি থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কোন তথ্য এখনো জানা নেই। কিন্তু বর্জ্য পানিতে করোনাভাইরাসের জিন শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

এর আগে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যে সুয়ারেজ থেকে সংগ্রহ করা পানি পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

যুক্তরাজ্যের সেন্টার ফর ইকোলজি অ্যান্ড হাইড্রোলজি বলছে, বর্জ্য পানি পরীক্ষা করে জানা সম্ভব সেখানে কি পরিমাণে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে। অন্তত এক সপ্তাহ আগে একটি এলাকায় কি ধরনের সংক্রমণ হতে যাচ্ছে সেটির সম্ভাব্য পরিস্থিতি আঁচ করা সহজ করে দিতে পারে বর্জ্য পানি গবেষণা।

বাংলাদেশে গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ।

তিনি বলেন, বর্জ্য পানি পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে অগ্রিম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির উপসর্গ দেখা দিতে কয়েকদিন সময় লাগে। তারপর টেস্ট করতে আরও কয়েকদিন। কিন্তু শরীরে করোনাভাইরাস প্রবেশের পর মানুষের মলে এর উপস্থিতি থাকে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার অনেক আগেই এই ভাইরাস মলের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থায় চলে যায়।

তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকার বর্জ্য পানি পরীক্ষার মাধ্যমে একটি ম্যাপিং করা সম্ভব। কোন এলাকায় এর উপস্থিতি কত বেশি রয়েছে সেই অনুযায়ী সরকার আগেভাগে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা নিতে পারবে। কোথায় লকডাউন লাগবে বা কোথায় আর একটু সহজ ব্যবস্থা নিলেই হবে সে ব্যাপারে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।

কিছুদিনের মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ আসছে কিনা সেটি সম্পর্কে এই অগ্রিম পূর্বাভাস অনেক কাজে দিতে পারে-যোগ করেন তিনি।

অনেকেই করোনা পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। ড. মুহাম্মদ মাকসুদ হোসেন এ বিষয়ে বলেছেন, কোন এলাকায় বর্জ্য পানিতে করোনাভাইরাসের জিনের উপস্থিতি থাকা মানে সেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছেন। এক্ষেত্রে বাড়িবাড়ি গিয়ে সার্ভেইলেন্স করে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত করা সম্ভব।

পাইপের মাধ্যমে যে পানি আমরা পাই তার মাধ্যমে কি করোনাভাইরাস সংক্রমণ সম্ভব-এমন প্রশ্নের জবাবে ভাইরোলজিষ্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ঢাকা শহরের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ঢাকাতে সার্বক্ষণিক পানি সাপ্লাই করা হয় না। পানির পাইপে যদি সবসময় পানির সাপ্লাইয়ের প্রেশার থাকে তাহলে যদি পাইপে ফুটো থাকেও সেখান থেকে অন্য কিছু প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু যখন পানির পাম্প বন্ধ করা হয় তখন এই প্রেশারটা থাকে না। সেক্ষেত্রে বাইরের পানি ওই পাইপলাইনে প্রবেশ করে। ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে পানির লাইন ও সুয়ারেজ লাইন পাশাপাশি গেছে। সুয়ারেজ লাইনেও যদি ফুটো থাকে তাহলে সেখান থেকে নোংরা পানি সাপ্লাই পানির লাইনে ঢুকে যেতে পারে।

তিনি বলেন, পানিতে করোনাভাইরাস কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এটি নির্ভর করে কোন ধরনের পানিতে সে রয়েছে। তাই আশঙ্কা থেকেই যায় যে, পানির মাধ্যমেও হয়ত সংক্রমণ সম্ভব। যদিও এ ব্যাপারে আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করছেন।

যেসব হাসপাতালে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে, যেসব ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে এবং আইসোলেশন সেন্টারগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেন থেকে যে বর্জ্য পানি বের হয় তা শোধন করার কথা বলছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরে সুয়ারেজ লাইনের পানিতে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যাবেই। কারণ এখানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছে। আমরা হাসপাতালের বর্জ্য পানি পরিশোধনের কথা অনেকবার বলেছি। হাসপাতাল বা আইসোলেশন সেন্টারগুলোর বর্জ্য পানিতে অনেক করোনাভাইরাসের উপস্থিতি খুব বেশি থাকবে। তাই সেখানে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানো দরকার।

নজরুল ইসলাম বলেন, সেখান থেকে যে বর্জ্য পানি বের হয় তা প্রধান সুয়ারেজ লাইনে পৌঁছানোর আগেই যেন তা শোধন করা যায়। এতে এসব হাসপাতাল থেকে করোনাভাইরাসের জিন শহরের প্রধান সুয়ারেজ ব্যবস্থায় প্রবেশ ঠেকানো যাবে। এটি ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করার একটি উপায় হতে পারে।