বাংলাদেশে শিশু শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও করণীয়


1194 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বাংলাদেশে শিশু শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও করণীয়
ডিসেম্বর ৩, ২০১৮ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

 

মোঃ আবু তাহের :
গবেষণা থেকে জানা যায় জন্ম থেকে আট বছর শিশুর বিকাশ ও শিখনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই শিশুর শিখনের শুরুটা হওয়া দরকার একটা মজবুত ভীত্তির মধ্য দিয়ে। এসময় শিশু যদি পিছিয়ে থাকে তাহলে শিখনের পরবর্তী স্তরে তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষজ্ঞগণ বলেন, শৈশবকালীন শিক্ষা শিশুর জীবনব্যাপী শেখার ভীত্তি রচনা করে এবং পরবর্তীতে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে। সোলার ও মিলার (২০১০) এর মতে এই বয়সে শিশুদের জন্য উপযুক্ত শিখন-শেখানো কৌশল নির্বাচন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ একইভাবে শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ ও শিখনের উপযুক্ত বিষয়বস্তু ও ক্ষেত্র নির্বাচন করাও অপরিহার্য।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো প্রারম্ভিক স্তরের শিক্ষার স্বরূপ কি হওয়া উচিত? কি থাকবে এই স্তরের শিক্ষাক্রমে? সহায়তাকারী/পরিচর্যাকারী (শিক্ষককের) ভূমিকাই বা কেমন হবে? শিক্ষার্থীরা কি নিষ্ক্রিয় থেকে শিক্ষক কর্তৃক সরবরাহকৃত বিষয়বস্তু গলাধঃকরণ করবে? নাকি শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারাও হবে এই প্রক্রিয়ার অংশীদার? উপরি-উক্ত বিষয়গুলো যুগযুগ ধরে শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কখনও সমালোচিত আবার বিতর্কিত হতে দেখা গেছে।
বিশ্বের দুটি উন্নত দেশে (জাপান ও যুক্তরাজ্য) পড়ালেখার সুবাদে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বিষয়ে অধ্যয়নকালে এবং নিজস্ব পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে জেনেছি ও দেখেছি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য উভয় বলয়েই শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে যেকোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় অনেক ভেবেচিন্তে এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে। আমার জাপানে অধ্যয়নকালে দেখেছি বিদ্যালয় আঙ্গিনায় একটা দোলনা স্থাপন করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে দিনের পর দিন কাজ করতে। তিনি দেখার চেষ্টা করেছেন দোলনাটি শিশুদের জন্য কতটা নিরাপদ, এটিতে কোন ঝুঁকি আছে কিনা, এটা সকল শিশুর জন্য উপযুক্ত কিনা, এটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং কিনা ইত্যাদি। জাপান এবং যুক্তরাজ্য উভয় দেশেই শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক স্তরে তিন বছর বা তার বেশি সময় (ওয়েলসে চার বছর) অতিবাহিত করে। উভয় দেশে শিশুদের বিদ্যালয়ে পদচারণা শুরু হয় তিন বছর বয়সে। এখানে শিশুরা অতিবাহিত করে তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলো। এসব দেশে শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে খেলাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে বলে রাখা ভালো সকল ধরণের শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার নির্ধারিত শিক্ষাক্রম গাইডলাইনের আলোকেই পরিচালিত হয়। অবশ্য আমাদের দেশের মত এত সুনিয়ন্ত্রিত এবং সুনির্দিষ্ট শিক্ষাক্রম সেখানে নেই। সরকার শিক্ষাক্রম প্রণয়নের জন্য একটা গাইডলাইন সরবরাহ করেন, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব চাহিদার আলোকে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করে বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আমাদের অনেকের জানা আছে যে, জাপানের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্রয়াত্ব কিন্ডারগার্টেন। এছাড়াও রয়েছে ডে-কেয়ার বা নার্সারী। উক্ত প্রাতিষ্ঠানসমূহ প্রাইমারী স্কুল থেকে আলাদা এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সাজানো হয় প্রকৃতির নানান রশদ দিয়ে। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের যাবতীয় উপায় ও উপকরণ সেখানে থাকে। এক কথায়, পরিবেশটা হয় শিশুবান্ধব ও শিশুর জন্য স্বর্গরাজ্য। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পরিবেশের সম্মিলনে শিশুর কৌতুহল নিবারণে, প্রকৃতিকে নিজ হাতে পরখ করার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সেখানে রয়েছে। প্রতিটি কিন্ডারগার্টেনে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের ভিতরে ও বাইরে খেলার নানা সামগ্রী। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক পরিবেশ অনুযায়ি সংস্থান রয়েছে সবজিবাগান, ফুলের বাগান ও পশুপাখির।
প্রতিটি কিন্ডারগার্টেন এর কর্ণধর (অধ্যক্ষ) হিসেবে সংযুক্ত থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। তিনি কেবল রুটিন মাফিক প্রতিষ্ঠানটি তত্ত্বাবধানই করেন না, তাঁর সাথে শিশুদের রয়েছে অন্তরঙ্গ এবং মধুর সম্পর্ক। শ্রেণি পর্যবেক্ষণকালে তিনি শিশুদের সাথে কথা বলেন, মজা করেন এবং খেলা করেন। একদিন দেখলাম, একজন অধ্যক্ষ তিন বছর বয়সি শিশুদের শ্রেণিতে আসলেন। শ্রেণিতে প্রবেশের সময় তিনি শিশুদের সাথে লুকোচুরি খেলার ভঙ্গিতে দেয়ালের আড়ালে লুকালেন। এসময় দুই তিন জন শিশু তাঁকে দেখে ফেলল এবং ম্যাডাম, ম্যাডাম (সেনসেই) বলে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তখন তিনি সহাস্যে শ্রেণিতে প্রবেশ করলেন, শিশুদের সাথে কুশল বিনিময় করলেন। তখন ছিল দুপুরের খাবারের সময়, শিশুরা তাদের খারারের বক্সগুলো নিয়ে দলগতভাবে টেবিলে বসেছে। অধ্যক্ষ মহোদয় নিজে তাঁর খাবারের বাটিটি বের করলেন এসময় পাঁচটি দল থেকেই নিজ নিজ দলের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য অধ্যক্ষ মহেদয়কে আবেদন জানানো হল। তখন তিনি একটি দলের সাথে বসে পড়লেন এবং বাকী দলদেরকে বললেন পর্যায়ক্রমে তাদের সাথেও তিনি খাবেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষনিক দায়িত্বে থাকেন একজন উপাধ্যক্ষ। যিনি শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনাসহ সার্বিক কার্যক্রমের তদারকি করেন। প্রত্যেক শ্রেণির দায়িত্বে থাকেন একজন স্থায়ী মূল শিক্ষক সাথে প্রয়োজনবোধে থাকেন এক/একাধিক খন্ডকালীন শিক্ষক।
বিশ্বব্যাপী শিশু শিক্ষায় দু’ টি ধারা প্রচলিত রয়েছে (ক) পরিবেশের মাধ্যমে শেখা এবং (খ) খেলার মাধ্যমে শেখা। জাপান প্রথম ধারণাটির লালন ও চর্চা করে থাকে। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়। পরিবেশ থেকেই শিশুরা খেলার ছলে শিখে থাকে। পড়ালেখার কোন ধরনের বাড়তি চাপ শিশুরা সেখানে কখনও অনুভাব করে না। আমাদের দেশের প্রচলিত অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেনের লিখি-পড়ি-মুখস্ত করি এধরনের কোন ধারণাই তাদের নাই। দেরিতে হলেও আশার কথা হলো ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা করে একটি মনোবিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে এ শ্রেণিতে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে (এ বিষয়ে পরবত আলোচনা করা হবে)। জাপানে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের জন্য একাডেমিক পড়ালেখার বোঝা চাপানোকে শিশুর পড়ার আনন্দকে মাটি করে দেওয়ার সামিল মনে করা হয়। অভ্যাসগতভাবে আমি একদিন একটি কিন্ডারগার্টেন এর পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের সকালের প্রথম পিরিয়ডে কি পড়ানো হবে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ বলেন, “পড়ালেখা ! এ বয়সে পড়ালেখা তো শিশুর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা তাদেরকে কোন কিছু পড়াই না। তারা খেলতে খেলতে শেখে”। অথচ যে শিশুদের কথা আমি জানতে চেয়েছিলাম তারা ঐ প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় বছরের শেষপ্রান্তে। এথেকে আমরা কি বুঝতে পারি না আমাদের শিশুদের প্রতি কি অনাচার আমরা করে থাকি? অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি আমাদের দেশে শিশুদের স্কুলজীবনের প্রথম দিনেই শেখানো হয় বাংলা স্বরবর্ণ, ইংরেজি বর্ণমালা, সাধারণ জ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয় এবং এগুলো শিশুদের মুখস্থ করতে হয় কারণ সামনে যে তাকে পরীক্ষায় বসতে হবে। অথচ শ্রেণিটির নাম প্লে/নার্সারী বা এরকম কিছু। অবিশ্বাস্য বটে! বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কি শিশুর সব আনন্দের দিন শেষ হয়ে গেল। শিশু কি হারিয়ে ফেলল তার সবচেয়ে প্রিয় কাজকে (খেলা)। হ্যাঁ ফ্রয়বেল বলেছিলেন, “খেলাই হলো শিশুর কাজ (পাউন্ড ২০০৫)”।

লেখক- ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, সদর, সাতক্ষীরা।

(চলবে)