সুন্দরবনের রায়মঙ্গল নদীর ত্রি-মোহনায় বিজিবি-বিএসএফ এর মধ্যে যৌথ অনুশীলন


1798 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনের রায়মঙ্গল নদীর ত্রি-মোহনায় বিজিবি-বিএসএফ এর মধ্যে যৌথ অনুশীলন
মার্চ ১৩, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

এম কামরুজ্জামান, সুন্দরবনের রায়মঙ্গল ত্রি-মোহনা থেকে ফিরে :
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এর সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার মহাপরিদর্শক শ্রী সন্দীপ সালুনকি বলেন, সীমান্ত অতিক্রম করে কোন জেএমবি জঙ্গি বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করছে এমন কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের এই বিশাল সীমান্ত পথে বিএসএফ ও বিজিবি পূর্ন নজরদারি রেখেছে। বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসীরাই সীমান্তের মূল অপরাধী একথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, তাদেরকে খুজে বের করে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে বিজিবি ও বিএসএফ কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমরা সীমান্ত সন্ত্রাস দমনে সতর্ক রয়েছি। দুই দেশের দুই বন্ধুপ্রতীম সীমান্তরক্ষী স্থলভাগ ছাড়াও জল সীমানায় ভাসমান বিওপি স্থাপন করে পূর্ন নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।

20160313_142808

ভারতীয় বিএসএফ এর দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রধান রোববার সুন্দরবনের রায়মঙ্গলে তিন নদীর মোহনায় বিএসএফ ও বিজিবির যৌথ অনুশীলনকালে ভাসমান স্থাপনায় দুই বাহিনীর প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন। এসময় বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবির দক্ষিন পশ্চিম রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফরিদ হাসান উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজেও বিজিবির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

 

Satkhira Photo--02
বিএসএফ প্রধান আরও বলেন, ভারতীয় এলাকায় ফেন্সিডিলের অবাধ ব্যবহার থাকলেও সাম্প্রতিককালে তা উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে ফেন্সিডিল পাচারের প্রবনতাও হ্রাস পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকাজুড়ে অবৈধভাবে যে সমস্ত ফেন্সিডিল কারখানা গড়ে উঠেছিল তা গুড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যাপারে বিএসএফ কড়া নজরদারি অব্যহত রেখেছে। দক্ষিনের সুন্দরবন একটি বৃহৎ বানিজ্য রুট উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদী সীমান্ত পথে সব ধরনের চোরাচালান দমনে বিজিবি ও বিএসএফ যৌথ টহলের ব্যবস্থা করেছে। এর মাধ্যমে মাদক, অস্ত্র এবং জালনোট সহ অন্যান্য সব ধরনের চোরাচালান শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিজিবির রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ফরিদ হাসান বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে গবাদি পশুর চোরাচালান শতকরা ৭০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে গরু আনার জন্য ভারতে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। এতে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ গবাদি পশু পালনে আরও বেশী মনোযোগী হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এদের সহায়তা দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গবাদি পশুর মাংস এখন বাজারে অপেক্ষকৃত সহজলভ্য দরে বেচাকেনা হচ্ছে।

Satkhira photo--03

যৌথ অনুশীলন পরবর্তী বিজিবি ও বিএসএফ এর প্রেস ব্রিফিংয়ে দুই বাহিনীর দুই কর্মকর্তা বলেন, সুন্দরবন অঞ্চলে জলদস্যূদের উৎপাত দমনে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুধু জলদস্যুই নয়, সব ধরনের সীমান্ত অপরাধী দমনে আমরা একযোগে কাজ করে যাচ্ছি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ ঘটছে এক ভারতীয় সাংবাদিকের এমন অভিযোগের জবাবে বিএসএফ এর সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার প্রধান তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। এমন কোন তথ্য তার কাছে নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, নারী ও শিশু পাচার বন্ধে বিজিবি ও বিএসএফ একযোগে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুই বাহিনীর যৌথ মহড়া ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত মন্তব্য করে বিএসএফ এর সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার প্রধান সন্দীপ শালুনকি আরও বলেন, এই ধরনের অভিযানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের জনবহুল সীমান্ত জীবন নিরাপদ রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সন্ত্রাসই সীমান্তের জন্য প্রধান হুমকি এই মন্তব্য করে যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এসব অপরাধ দমনে দুই বাহিনী সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।
সুন্দরবন এলাকায় তিনদিন ব্যাপী যৌথ অনুশীলনের তৃতীয় দিন রোববার রায়মঙ্গল, ইছামতি ও কালিন্দী নদীর টি জংশন এলাকায় ভাসমান বিএসএফ বিওপি কামাক্ষ্যায় এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

IMG_20160313_121634

এর আগে বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা জাহাজে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী তল্লাশির মহড়া প্রদর্শন করেন। এসব কর্মসূচীতে বিজিবির পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন, খুলনার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোঃ ইকবাল, বিজিবির ৩৪ ও ৩৮ ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার যথাক্রমে লে. কর্নেল মাকসুদ আহমেদ ও লে. কর্নেল আরমান হোসেন, আরবিজি অধিনায়ক লে. কমান্ডার রেদোয়ান সহ বিজিবির কর্মকর্তারা। অপরদিকে বিএসএফ এর পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন, ৩ ব্যাটেলিয়ন কমান্ড্যান্ট অজয় কুমার ও ১১৬ বিএসএফ কমান্ড্যান্ট অজিত কুমার পি। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিজিবি ও বিএসএফ এর মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক সীমান্তে এই যৌথ মহড়ার এটাই ছিল প্রথম। এর মাধ্যমে দুই দেশের দুই বাহিনীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক আরও সংহত হবে বলে মন্তব্য করেন তারা। বিজিবি ও বিএসএফ সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহন করেছে মন্তব্য করে ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, যৌথ অনুশীলনের মাধ্যমে সীমান্তের অপরাধীদের চিহ্ণিত করে তাদের দমনের সব উদ্যোগ গ্রহন করেছে। যথাযথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অনুশীলন অব্যাহত থাকবে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের জেলেরা ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়লে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদেরকে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কোস্টগার্ড অথবা ভারতীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে বিএসএফ এর কিছুই করার থাকে না। ভুল করে তারা নদী সীমান্তে ঢুকে পড়লেও তাদের প্রতি আইনী ও মানবিক আচরন করা হয়ে থাকে। ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, টহলদারি, তল্লাশি এবং সন্ধ্যায় ফ্লাড লাইটের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্ণিত করার কাজ করা হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

20160313_143058(1)

—————————————————————-
বিজিবি-বিএসএফ এর মধ্যে সুন্দরবন এলাকায় যৌথ অনুশীলন এর বিষয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি

—————————————————————-

১২-১৪ মার্চ ২০১৬ তারিখ পর্যন্ত ৩৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের আওতাধীন কৈখালী বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সুন্দরবন এলাকায় বিজিবি-বিএসএফ এর মধ্যে যৌথ অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত যৌথ অনুশীলনে বাংলাদেশ পার্শ্বে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার ফরিদ হাসান, পিবিজিএম, রিজিয়ন কমান্ডার, দক্ষিণ পশ্চিম রিজিয়ন, যশোর এর নেতৃত্বে কর্ণেল মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, সেক্টর কমান্ডার, সেক্টর সদর দপ্তর, খুলনা, পরিচালক অপারেশন, দক্ষিণ পশ্চিম রিজিয়ন, যশোর, অধিনায়ক ৩৪ ও ৩৮ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন, ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স গ্রুফ কমান্ডার, দক্ষিণ পশ্চিম রিজিয়ন, যশোর, অধিনায়ক রিভারাইন বর্ডার গার্ড কোম্পানী, নীলডুমুর, অতিরিক্ত পরিচালক (অপারেশন), সেক্টর সদর দপ্তর, খুলনা, ইন্ট অফিসার ৩৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন, নীলডুমুর, উপ পরিচালক (অপারেশন প্লাটুন), রিভারাইন বর্ডার গার্ড কোম্পানী, নীলডুমুর এবং মেডিক্যাল অফিসার, ৩৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন, নীলডুমুরসহ  অন্যান্য পদবীর ১১৪ জন বিজিবি সদস্য এবং ভারতীয় পার্শ্বে আইজি শ্রী সন্দীপ সালুনকি, আইপিএস, ফ্রন্টিয়ার কমান্ডার, সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার এর নেতৃত্বে সেক্টর কমান্ডার, কলকাতা সেক্টর, নোডাল অফিসার, সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার, কমান্ড্যান্ট ৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন, ০৭ জন স্টাফ অফিসারসহ অন্যান্য পদবীর ১১০ জন বিএসএফ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। উক্ত যৌথ অনুশীলনে লক্ষ্য সমূহ নিম্নরুপ (১) সুন্দরবন এলাকার জল সীমানায় সাধারণ সমস্যা এবং ঝুকিসমূহ পর্যবেক্ষণ করা, (২) বিজিবি-বিএসএফ কর্তৃক সুন্দরবন এলাকায় নিজ নিজ সীমানার মধ্যে থেকে যৌথ টহল পরিচালনা করা, (৩) যৌথ টহল পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকল রুটে চলাচলকারী কার্গো এবং মাছ ধরার ট্রলারে তল্লাশী কার্যক্রম অনুশীলন করা ও (৪) উভয় দেশের ফরেষ্ট ক্যাম্প ও কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হওয়া। এই অনুষ্ঠানটি পরিচালনা প্রসংগে গত বছর অনুষ্ঠিত ডিজি বিজিবি ও ডিজি বিএসএফ সম্মেলনে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছিল। এ ধরণের অনুশীলন দু‘বাহিনীর বিরাজমান সুসম্পর্ক ও আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে। উল্লেখ্য, বর্তমানেও আমরা সুন্দরবন এলাকায় উভয় বাহিনী সৌহার্দ্য ও আস্থার মাধ্যমে নদীপথে যৌথ টহল পরিচালনা করে আসছি। এ অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের এই কর্মতৎপরতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত এবং কার্যকর হবে বলে আমরা আসা করি।