‘বাংলা’ নয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’


494 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘বাংলা’ নয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’
নভেম্বর ১৬, ২০১৮ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

অনেকদিন ধরেই সম্ভবতঃ ২০০৪ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গর নাম ‘বাংলা’ করা হবে বলে প্রচারিত হয়ে আসছিল। এ প্রসঙ্গে কথা উঠেছিল ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’কে ‘রয়েল ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বলা হবে না। তাই পশ্চিমবঙ্গ বা ওয়েস্ট বেঙ্গলকে ‘বাংলা’ বলতে হবে। কেনো ‘বাংলা’ নামকরন করা হবে তা নিয়ে ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তি প্রদর্শনের পালা শুরু হয়েছিল এভাবেই। পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তিই এসেছিল। তবে বিষয়টি ছিল ভারতীয়দের নিজস্ব । এ নিয়ে অন্য কারও মাথা গলানোর কোনো কারণ ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হয়েছিলেন । বারবার এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। চুলচেরা বিশ্লেষন করেছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধান সভায় বিল হিসাবে এনেছিলেন বিষয়টি। তাতে সম্মতি আসে যে ‘পশ্চিমবঙ্গ’র নাম হবে ‘বাংলা’। এই পরিবর্তিত নামকরনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তা আবিস্কার করা আমার পক্ষে কঠিন। তবে বলতে পারি এর মধ্যে এমন কিছু লুক্কায়িত রয়েছে যা এক সময় পুরো বাঙ্গালি জাতিকে নানাভাবে আহত করতে পারে। এ নিয়ে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ ও ভারত বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারে। সৃষ্টি হতে পারে মন কষাকষির। যা এগুতে পারে অনেকদুর।
তবে মমতা ব্যানার্জির সরকার মনে করে ভারতের ২৯ টি রাজ্যের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ ভৌগলিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি রাজ্য। কেন্দ্রের তালিকায় পশ্চিবঙ্গকে ইংরাজীতে লেখা হয় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ । কেন্দ্রিয় সরকার যখন সিরিয়াল অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গকে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ নামে ডাকে তখন ইংরাজী বর্ণমালার ২৬ বর্ণের ২৩ তম বর্ণ হিসাবে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ এর ইংরাজী আদ্যক্ষর ‘ডাবলিউ’ (ড) চলে আসে। এর অর্থ তালিকাগতভাবে তার অবস্থান অনেক নিচে। পশ্চিমবঙ্গর মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে এর ফলে আমরা ডাকে পেছনে পড়ে থাকছি। আমরা অবহেলার শিকার হচ্ছি । আমরা বঞ্চিতও হচ্ছি। এই বঞ্চনা আমরা আর ধারন করতে চাই না। ‘তাই আমরা হবো ‘বাংলা’। ইংরাজীতে নাম ডাকা হলে আমরা হবো ইবহমধষ এর আদ্যক্ষর দই’ । আবার হিন্দিতে ‘বঙ্গাল’ বা ইড়হমধষ নাম ডাকা হলে তারও আদ্যক্ষর হবে ইংরাজীর ‘ই’ । সূতরাং আমরা ইংরাজী বর্ণমালার দ্বিতীয় বর্ন ই তে পৌঁছে যাবো। এতে আমরা অনেক উপকৃত হবো । উন্নয়ন বঞ্চনা হ্রাস পাবে।
কোনো রাষ্ট্র প্রদেশ কিংবা কোনো ভূখন্ডের নাম এই কারণে বদলানো হতে পারে এটা আমার জানা নেই। সূতরাং পশ্চিমবঙ্গকে ‘বাংলা’ নামকরন করার এই যুক্তিও কোনোভাবে গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশের অনেক লেখক সংস্কৃতিকর্মী এবং রাজনীতিক বিষয়টি নিয়ে নানাভাবে লিখেছেন এবং মন্তব্যও করেছেন। তারা এক বাক্যে বলেছেন ‘পশ্চিমবঙ্গ’ ‘বাংলা’ হতে পারে না। এই যুক্তির সাথে একমত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়সহ অন্যান্য সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিজ্ঞ। তারা বলেছেন যদি আদ্যক্ষর ইংরাজী বর্ণমালার ই কে আনতে হয় তাহলে পশ্চিমবঙ্গর নাম পাল্টে রাখা যেতে পারে বঙ্গ, বঙ্গরাজ্য, বঙ্গপুর, বঙ্গভূমি, বঙ্গস্থান, বঙ্গমাটি ইত্যাদি। এতে কোনো প্রকার মতানৈক্যের সৃষ্টি হবে না। কোনো প্রশ্নও হয়তো উঠবে না। কিংবা কোনো ধরনের বিব্রতকর অবস্থায়ও পড়তে হবে না কোনো দেশ ভারত কিংবা বাংলাদেশকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গর নাম পাল্টে উপর্যুক্ত নামগুলির যে কোনো একটি রাখা হলে তাতে কারও কোনো আপত্তিও থাকবে না হয়তো। যেমন ভারতকে তিন নামে চেনা যায় । ১. ভারত ২. ইন্ডিয়া। ৩. হিন্দুস্থান।
আমাদের সবার মনে রাখা দরকার যে ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশি ভারতের অবদান অনেক। তারা মিত্রবাহিনী হয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। নবগঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে ভারত সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদাকে তুলে ধরেছে। এক কোটি শরণার্থীকে ভারত সরকার টানা নয় মাস আশ্রয় খাদ্য ও চিকিৎসা দিয়েছে। এর ফলে দুইয়ের মধ্যে এক ভ্রাতৃত্ব ও কৃতজ্ঞতার বাঁধনের সৃষ্টি হয়েছে। এই কৃতজ্ঞতায় যেনো ছেদ না পড়ে এ প্রত্যাশা নিশ্চয়ই দুই দেশের মানুষের । কিন্তু যদি সত্যিকারেই পশ্চিমবঙ্গর নাম পাল্টে ‘বাংলা’ করা হয় তাহলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গর মানুষের মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাদের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে পারে। ‘বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ এই দুটি নাম নিয়ে সাধারনের মধ্যে গোলতাল পাকতে পারে।
‘বাংলা’ নামের সঙ্গে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ‘বাংলাদেশ’র একটি নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে। ‘বাংলা’ একটি ভাষার নাম। তার সাথে একাত্তরে যুক্ত হয়েছে ‘দেশ’ শব্দটি। সেই হিসাবে এটি হয়েছে ‘বাংলাদেশ’। ‘বাংলা’ ভাষা পৃথিবীর আট নম্বর ভাষা। একটি গুরুত্বপূর্ন ভাষাও বটে। হিন্দি ভারতের প্রধান ভাষার নাম। কোনো কারণে কি ভারতের কোনো রাজ্যের নাম ভারত ‘হিন্দি’ রাখতে পারে ? নিশ্চয়ই না। তেমনি ‘বাংলা ভাষা’ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয়েরই। তাই বলে ভাষার নাম ‘বাংলা’ কি পশ্চিমবঙ্গ ভূখন্ডের পরিবর্তিত নাম হতে পারে। নিশ্চয়ই না। কাজেই কোনোভাবেই ‘পশ্চিমবঙ্গ’র নাম ‘বাংলা’ হতে পারে না। এটা যৌক্তিক নয়, স্বীকার্য বিষয়ও নয়।
এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ খবর হলো ভারতের কেন্দ্রিয় সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ’র পরিবর্তিত নাম ‘বাংলা’ প্রস্তাব ফেরত দিয়েছে। বিষয়টি সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অনুমোদন দেয়নি। একইভাবে বিদেশ মন্ত্রকও অনুমোদন দেয়নি। ফলে সেটি লোকসভায় বিল আকারে উঠছে না। বলা যায় মোদী সরকার বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে এই প্রস্তাবনা ফের পশ্চিমবঙ্গে ফেরত দিয়েছে (সূত্র , ভারতের বিভিন্ন গনমাধ্যম) । ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান (পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান) ও ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ বা পশ্চিম বাংলা নামকরণ করা হয়। আমরা পরিচিত ছিলাম পূর্ববঙ্গ বা পূর্ববাংলা হিসাবে। এরই মধ্যে আমরা ৭১ বছর পার করেছি। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন অভিষেক হয়েছে। আমরা পেয়েছি ‘বাংলাদেশ’। তারপর কেটেছে প্রায় ৪৭ বছর। এখন হঠাৎ ‘পশ্চিমবঙ্গ’কে ‘বাংলা’ বানানোর সাধ কেনো জাগলো তা বোধগম্য নয়। মনে রাখা দরকার এই ‘বাংলা’কে মাতৃভাষা হিসাবে বুকে ধারন করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গর দামাল ছাত্র সমাজ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ইতিহাস রচনা করে গেছেন। সেটাতো ‘বাংলা’ ভাষা, আমাদের মাতৃভাষা। পশ্চিমবঙ্গরও মাতৃভাষা। সেই ‘বাংলা’ তো কোনো ভূখন্ডের নাম হতে পারে না।
পশ্চিমবঙ্গর রাজ্যসভায় আসন সংখ্যা ৪২ টি। মহারাষ্ট্রের ৪৮ টি আসন। উত্তর প্রদেশের আসন সংখ্যা ৮০ টি। ত্রিপুরা ও তামিলনাড়–র আসন সংখ্যা ৩৯ টি করে। তাহলে কী আদ্যক্ষর বিবেচনায় উত্তর প্রদেশের নাম ইংরাজী বর্ণমালার শেষের দিকে অবস্থানকারী বর্ন ইউ ( ট) পাল্টাতে নতুন নামকরন করতে হবে?
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। তিনি কি বাংলাদেশ বা তৎকালিন পূর্ববঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে দেখেছেন । নিশ্চয়ই না। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম’ । তিনি কি পৃথক কিছু বুঝাতে চেয়েছেন। নিশ্চয়ই না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’। ডিএল রায় লিখেছেন‘ বঙ্গ আমার জননী আমার’। আসলে সেই পুরাকাল থেকে দেশ বা ভূখন্ডবাচক শব্দ বঙ্গ, বাংলা, বাংলাদেশ যেমন ইতিহাস ঐতিহ্য ও চিরায়ত সংস্কৃতিগতভাবে জনপ্রিয় ব্যবহার পেয়েছিল তেমনি ভাষা বাচক শব্দ ‘বাংলা’র ব্যবহার উঠেছিল শীর্ষে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমাদের নতুন অর্জন বাংলা + দেশ = ‘বাংলাদেশ’। তাই এই লাল সবুজের বাংলাদেশ খন্ডিত হয়ে কারও স্বার্থে ভূখন্ডগত ‘বাংলা’ নাম হবার কোনো সুযোগ নেই।

—— সুভাষ চৌধুরী , দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভির সাতক্ষীরা করেসপন্ডেন্ট।