বাগদা চিংড়ি দক্ষিণাঞ্চল ও বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম


352 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বাগদা চিংড়ি দক্ষিণাঞ্চল ও বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম
মে ২৬, ২০২২ কৃষি ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

চিংড়ি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি খামারে উত্তম চাষ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। চিংড়ি চাষ থেকে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার উপরে রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাও আরো উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন ও গুনগত মানসম্পন্ন প্রবর্তন দরকার।সারাদেশে মোট চিংড়ি চাষের ৫০% সিংহভাগ আয় আসে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট থেকে। এ অঞ্চলের লোনা পানির বাগদা, হরিণা চিংড়ি খুব সুস্বাদু, প্রোটিন-আয়োডিন সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জনপ্রিয়, সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম অর্থকারী সম্পদ দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি চাষ প্রকল্প।

চিংড়ি চাষে বিরুপ প্রভাব: বর্তমানে চিংড়ি চাষে ব্যাপক ধ্বস নামতে শুরু করেছে কয়েকটি কারণে। লাভজনক এই চিংড়ি চাষ এখন লোকসানের পথে। সাধারণ চাষীরা এখন চিংড়ি চাষে অনীহা প্রকাশ করছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে চিংড়ি রেণু পোনা সরবরাহ নেই এলাকাভিত্তিক। চিংড়ি রেণু পোনা সরবরাহ ও মজুদের জন্য কিছুকিছু নার্সারি ও নার্সিং পয়েন্ট রয়েছে সেগুলো পর্যাপ্ত চাহিদা নেই। কক্সবাজার ও সমুদ্র থেকে বাগদা রেণুপোনা সরবরাহ করা হয় সেগুলো চাহিদা কম, মজুদ কম। যার পেরিপ্রেক্ষিতে অবৈধভাবে ভারত থেকে চোরাপথে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভারতীয় নিম্নমানের, অসুস্থ্য ও অনিষিক্ত বাগদা চিংড়ির নোপলি (রাণী বাগদার ডিম) ও চিংড়ি-গলদা রেণুপোনার রমরমা ব্যবসা সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরাতেই। বাগদা চিংড়ির এক একটি নোপলি (ডিম) এনে নার্সিং পয়েন্টে/স্থানীয় শ্রিম্প কোম্পানিতে ডিম ফুটিয়ে কয়েক লক্ষ রেণু পোনা উৎপাদন করা হয়। আর রেণুপোনা গুলো নার্সিং ব্যবসায়ীরা মজুদ রেখে কিংবা সরাসরি মৎস্য ঘেরে সরবরাহ করে।পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গুনগত মান ছাড়াই মৎস্যচাষীরা এসব চিংড়ি রেণুপোনা ঘেরে সরবরাহ করে চরম ক্ষতির সম্মুখে পড়ছে, চিংড়ি চাষে ঝুঁকি বাড়ছে,লাভজনক হ্রাস পাচ্ছে। ভাইরাস ও জীবানু ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে মারা যাচ্ছে বাগদা চিংড়িপোনা। আর এই নিম্নমানের অসুস্থ্য রেণুপোনার কারণে বাগদা চিংড়ি চাষে ঘেরে চিংড়িগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, আকার আকৃতিতে ছোট, বাড়ছে না, মোটাতাজা হচ্ছে না। যার কারণে চাহিদা কম হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা কম ও মান কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার মনিটরিং না থাকার কারণে সিন্ডিকেটের কারণে মাঠ পর্যায়ে চাষীদের লাভজনক কম দিচ্ছে এবং শিপমেন্ট ব্যবসায়ী ও মালিকপক্ষ এই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

প্রশাসনিক প্রতিকার: অবৈধভাবে ভারতীয় অসুস্থ্য, অনিষিক্ত নোপলী (ডিম) ও রেণুপোনা পাচার চক্র বন্ধ করার জন্য বিজিবি, নৌপুলিশ, নৌবাহিনীর কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সীমান্তবর্তী নজরদারী বাড়িয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। তালিকা করে অসাধু ব্যবসায়ী দের আইনের আওতায় এনে সিন্ডিকেট চক্র বিছিন্ন করতে হবে।
বাগদা চিংড়ি চাষে সরকারি উদ্যোগ ও পদক্ষেপ: (১) বাগদা চিংড়ি ও মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন। যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষা থাকবে।

মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এলাকাভিত্তিক এ প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
(২) দেশীয় পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ সুস্থ্য, সবল, পরিপক্ব ও গুনগত বাগদা রেণুপোনা নোপলি (ডিম) সরবরাহ বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য চিহ্নিত সামুদ্রিক এলাকা ও গভীর সমুদ্রের ডিমযুক্ত রাণী বাগদা সরবরাহে সরকারি পদক্ষেপ বাড়াতে হবে।
(৩) দেশীয় নদনদী ও সমুদ্র থেকে জেলেদের বাগদা চিংড়ি রেণুপোনা সরবরাহ বাড়াতে হবে সরকারি উদ্যোগে।
(৪) দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ। বিক্রিজাতযোগ্য বড় বাগদায় সকল পুশ (জল, সাগুও অন্যান্য পদার্থ) ও ভেজাল বিরোধী অভিযান চালাতে হবে অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতি।

(৫) চাষিপর্যায়ে রোগমুক্ত ও গুণগতমানসম্পন্ন চিংড়ি পোনার সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জীবাণু ও ভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ড ফিশের যৌথ উদ্যোগে পিসিআর প্রটোকল ও প্রযুক্তি সম্পন্নকরণ পাশাপাশি পিসিআর পরীক্ষিত পোনা মজুদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
(৬) চিংড়ি চাষকে আরো লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করার নিমিত্ত জলাশয় বা ঘেরের গভীরতা বৃদ্ধির প্রকল্পের পাশাপাশি চিংড়ির পিএল নার্সিং-এর মাধ্যমে ঘেরে জুভেনাইল।
(৭) মৎস্যঘেরে জৈবসার ব্যবহারের সচেতনতা বাড়িয়ে জমিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক দ্রব্য বন্ধে কঠোর অভিযান বাড়াতে হবে।
(৮) ওয়াপদা রাস্তা কেটে নাইনটি ওভারফ্লো পাইপ বন্ধ করে এলাকাভিত্তিক ১/২টি পয়োনিষ্কাশন ও সুষ্ঠু লোনাপানির সরবরাহ জলপথ নির্মাণ করতে হবে সরকারি উদ্যোগে। নাইনটির পানিতে চিংড়ি চাষ বিঘিœত হচ্ছে।
(৯) পর্যাপ্ত পরিমাণে সরকার অনুমোদিত প্রযুক্তি ও পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্নকরণে রেণু পোনা মজুদে নার্সিং পয়েন্ট ও ডিম ফুটানোর জন্য হ্যাচারি বাড়াতে হবে, ব্যবসায়ীদের উদ্যোগী করতে হবে।
(১০) সরকারি উদ্যোগে জনবলের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে চাষীদের রেণুপোনা সরবরাহের সময়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই তবে মৎস্য রেণু পোনা ছাড়তে উৎসাহিত করতে হবে। মাটি ও পানির পিপিটি পরীক্ষা, পিএইচ ও লবণাক্ততা পরীক্ষা করাতে সাহায্য করতে হবে।
(১১)সরকারী তালিকাভুক্তি অনুযায়ী বাগদা চিংড়ি ও মৎস্য চাষী ঘের মালিক এবং সরকার অনুমোদিত ও লাইসেন্সধারী চিংড়ি রেণুপোনা ব্যাবসায়ীদের, শিপমেন্ট মালিক ব্যবসায়ীদের মাঝে সমন্বয় করে উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

(১২) সরকারি তালিকাভুক্তি সম্পন্ন বাগদা চিংড়ি ঘের মালিকদের স্বল্পসুদে/মওকুফ হারে চাহিদা মোতাবেক সরকারী ঋণ দিতে হবে।
(১৩) সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিদেশী সংস্থা ও এনজিওর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে বৈধভাবে সরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিক চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে শক্তিশালী বাগদা চিংড়ি নোপলি (ডিম) ও পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন রেণু পোনা সরবরাহ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত লাইসেন্সধারী হতে হবে।
(১৪) বাগদা চিংড়ি ঘেরে চোর ও চুরি-ডাকাতি বন্ধে ইউনিয়ন পরিষদ চৌকিদারি ও প্রশাসনিক নজরদারী সহ আইনগত পদক্ষেপ বাড়াতে হবে।
(১৫)অসাধু বাগদা চিংড়ি ও রেণুপোনা ব্যবসায়ীদের তালিকা অনুযায়ী কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাসহ সীমান্তবর্তী নজরদারী আরো বাড়াতে হবে।

অসাধু ব্যবসায়ী ও চোরাই সিন্ডিকেট: সাতক্ষীরা সুন্দরবন অভ্যন্তরীণ জলপথ, শ্যামনগর কৈখালীর নিদয়া ও পরাণপুর, কালিগঞ্জ টাকি-হিঙ্গলগঞ্জ, দেবহাটার কুলিয়া ব্রিজের নিচে গড়ে উঠেছে ভারতীয় গলদা ও বাগদা রেণু পোনার বাজার। সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তের লক্ষ্মীদাঁড়ী ২ নাম্বার, ইমিগ্রেশন অফিসের পেছন দিয়ে, শাঁখরা ও পদ্মশাঁখরাসহ দেবহাটা, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ সীমান্তের বিভিন্ন চোরাপথে প্রতিরাতে ২শ’ থেকে ৩শ’ বল বাগদা ও গলদা রেণু পোনা আসে। এসব রেণু পোনা সরাসরি চলে যায় শ্যামনগর বংশিপুর, হরিনগর, নওয়াবেকী, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, কয়রা উপজেলাসহ দেবহাটা উপজেলার কুলিয়ার পোনা বাজারে।

শ্যামনগরের চোরাকারবারি কৈখালী সীমান্ত, সন্দেহভাজন রেণুপোনা ব্যবসায়ী চক্র, ভারতের ইটিন্ডির ঢ্যামঢেমির সীমান্ত পার করে দেয় এই সিন্ডিকেট চক্র। ভোমরা সীমান্তের লক্ষ্মীদাঁড়ী এলাকা ও ভোমরা বন্দরের টাওয়ার মোড় এলাকা বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ী ও চক্র রাতের আঁধারে বিজিবি ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা সীমান্ত থেকে এসব চিংড়ি রেণু পোনা নিয়ে পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট স্থানে।
জাতীয় চিংড়ি রপ্তানি ও আমদানীনীতি নানাবিধ অপপ্রচার ও নেতিবাচক কার্যক্রমকে মোকাবিলা করে এ ক্রমবর্ধনশীল শিল্পকে অধিক স্থায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর সরকারি-বেসরকারি সুফলভোগীদের নিয়ে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে ও সচেতন বাড়াতে হবে।

#