বাঙালি,বাংলা ও আইন-আদালতের ভাষা


781 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বাঙালি,বাংলা ও আইন-আদালতের ভাষা
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক ::

ভাষা মানুষের নিজস্ব সত্তা, অমূল্য সম্পদ। মানুষ জীবনের প্রতি মুহুর্তে স্পন্দন ও প্রবাহের মধ্যদিয়ে তার জীবিত ও জাগ্রত সত্তাকে অস্তিত্বময় ও প্রাণবন্ত করতে ভাষার কোনো বিকল্প খুঁজে না। মানুষ বৈচিত্র্যতার সমাহারে নান্দনিকতার উন্মেষ ঘটাতে অস্তিত্ব, অবস্থান, গতি-প্রকৃতি, শক্তির সমন্বয় ও রচনাকে সমৃদ্ধ করে ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে। ভাষার কারণে দেহে শক্তির সঞ্চার হয়, অঙ্গ-প্রতঙ্গ সঞ্চালিত হয়, মস্তিস্ক কোটর, চেতনা-চৈতন্য, স্মৃতিকোষ, অনুভূতির ক্রিয়া সম্পন্নতায় বোধগম্যের সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষা জীবনের সঙ্গে সর্বতোভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের সংবিধানে আছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে ১৯৮৭ সালে পাশ হয় আইন। বাঙালির মা, মাটি ও মানুষের সাথে মিশে আছে বাংলা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পিচ ঢালা কালো রাজপথ লাল বর্ণ ধারণ করে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য। বিশ্বের ১৯৫টি রাষ্ট্র বাংলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও দেশের উচ্চশিক্ষা ও উচ্চ আদালতসহ সর্বস্তরের ভাষা হয়ে উঠতে পারিনি বাংলা। ২১ ফ্রেব্রুয়ারিতে ভাষাপ্রীতি আর পহেলা বৈশাখে একদিনের বাঙালি থেকেই যাচ্ছি আমরা বছরের পর বছর। অন্যদিকে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, কখনও কি চালু হবে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন?
মা-মাতৃভূমি-মাতৃভাষার ওপর আঘাত এলে কোন ব্যক্তি, জাতি বা গোষ্ঠী মেনে নিতে পারে না। তারই এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত ভাষা আন্দোলন। বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা বাংলা ভাষাকে রক্ষা এবং মাতৃভাষা রূপে আলিঙ্গন করতে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনের ডাক দেন। মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে বাংলার ছাত্র-জনতা-পেশাজীবীরা সংগ্রাম গড়ে তুললে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, শফিক, জব্বারের রক্তে পিচ ঢালা পথে রক্তের ¯্রােত বয়ে যায়। এই বাংলার সূর্য সন্তানেরা ২১ ফেব্রুয়ারি সফলতার সঙ্গে অর্জন করে গৌরবগাঁথা এক উজ্জ্বল নজিরবিহীন ইতিহাসের সৃষ্টি করে পৃথিবীর বুকে। ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের পর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম পেরিয়ে ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হল রাষ্ট্রভাষা রূপে।
বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সংবিধানের এই বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কার্যকর করা হয়। এই আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালন, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশীদের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের ছোয়াল-জওয়াব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। ধারায় আরো বলা হয়েছে, ‘উল্লেখিত কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন, তাহলে উহা বেআইনী ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে।’ তবে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রুল এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি এ ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। হাইকোর্ট বিভাগের রুলের চতুর্থ অধ্যায়ের ১ নং বিধিতে বলা হয়েছে, হাইকোর্টে দাখিলকৃত দরখাস্তগুলোর ভাষা হবে ইংরেজি। তবে পঞ্চম অধ্যায়ের ৬৯ নং বিধিতে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ এবং ডিক্রি আদালতের ভাষায় প্রস্তুত করতে হবে। একইভাবে দেওয়ারি কার্যবিধির ১৩৭ ধারায় আদালতের ভাষা নির্ধারণ করতে গিয়ে ১৩৭(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোন আদালতের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা ব্যতীত অন্য কিছু লিখিতভাবে সম্পাদক করার জন্য অত্র কোর্ট আদেশ যা অনুমোদন করে তা ইংরেজিতে লেখা যাবে।’ তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে কোন ফৌজদারি আদালতের বিচারিক রায় আদালতের ভাষায় অথবা অন্য কোন ভাষায়-যা আসামী অথবা তার আইনজীবী বুঝতে সক্ষম সে ভাষায় ঘোষণা অথবা উক্ত রায়ের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ করতে হবে।’ তাহলে বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করতে, ডিক্রি বা আদেশ প্রদান করতে বাধা কোথায়? বাধা আসতে পারে অনেক আইন, আইনের ব্যাখ্যা, দৃষ্টান্ত ইংরেজিতে। সেক্ষেত্রে রায় দেওয়ার সময় ইংরেজির ধারাগুলো বাংলায় অনুবাদ করলেই তো হয়।
আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা শতভাগ চালু না হওয়ায় রাষ্ট্রের নাগরিকরা সাংবিধানিকভাবে পাওয়া মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হয়েও বিচারপ্রার্থী হয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে অসহায়ের মতো। যে ভাষায় তার আইনজীবী বিচারকের সাথে কথা বলে তিনি তা বুঝতে অক্ষম। বিচারক যে ভাষায় রায় দিচ্ছেন তাও বুঝতে তিনি অক্ষম। ভাষা আন্দোনের মাধ্যমে অর্জিত বাংলা আজ ধুকে ধুকে হারিয়ে যেতে বসেছে সমাজে।
ভাষার জন্য আন্দোলন, সংগ্রামের ফসল হলো বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়নি। শিক্ষার ক্ষেত্রে, গবেষণার ক্ষেত্রে, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, গুটিকয়েক গণমাধ্যমে প্রচার করা হয় বাংলিশ (বাংলা মিশ্রিত ইংলিশ)। সরকারের বিভিন্ন অফিসে চিঠি আদান-প্রদান করা হয় ইংরেজি ভাষায়। আর বাংলা ভাষা প্রয়োগ ও সর্বস্তরে ব্যবহারের জন্য যারা বিভিন্ন সময় আদেশ দিয়েছিলো তারাই অনেকক্ষেত্রে মানে না সেটি। অর্থাৎ খোদ উচ্চ আদালতে পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলা চালু হয়নি এখনও। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বহুল আলোচিত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় বাংলা ভাষায় লিখে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলনের ক্ষেত্র পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে গেছেন। তবে অন্যরা কোন পারছেন না?
সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলন ও বাংলা ভাষার দূষণ রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে দিন দিন বাংলা ভাষার প্রচলন ছোট হয়ে আসছে ও দূষণের মাত্রা বাড়ছে। ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন বিষয়ে এবং বেতার ও টেলিভিশনে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ ও দূষণ রোধে উচ্চ আদালতের রুলসহ নির্দেশনা রয়েছে। বেতার ও টেলিভিশনে বিকৃত উচ্চারণ, ভাষা ব্যঙ্গ ও দূষণ করে অনুষ্ঠান প্রচার না করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং একটি রুল জারি করা হয়, কিন্তু রুলের নিষ্পত্তি হয়নি আজও।
দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষাতেই কথা ও কাজ চালিয়ে থাকে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও বাংলা সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দাফতরিক যোগাযোগ এবং বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের লৈখিক তৎপরতায় ইংরেজি চলছে প্রধানভাবে। এর একটি অন্যতম কারণ ঔপনিবেশিক আমলের ভিত্তিমূলে গড়ে ওঠা আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠির মানসিকতা। আমরা দেখি, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানীর মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও বুলগেরিয়া, তুরস্কের মতো কম প্রভাবশালী রাষ্ট্র প্রয়োজন ছাড়া ইংরেজি ব্যবহার করে না। তবে ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন ও বিদেশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রক্ত¯œাত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রয়োজ্য হবে কেন? বাংলা ভাষার নান্দনিক আবেগী শব্দ, গৌরব, বিজ্ঞানসম্মত রচনা শৈলী এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক। আমি ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও চর্চার বিরোধী নয়। আমাদের উন্নতি করতে হলে ইংরেজি ভাষা চর্চা ও উন্নতভাবে শিখতে হবে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে অফিসের ভাষা, ইংরেজি ব্যতীত শিক্ষার ভাষা, সাইন বোর্ড, বিল বোর্ডের ভাষা, পত্র যোগাযোগ, গণমাধ্যমের ভাষা অবশ্যই বাংলা হতে হবে।
বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে বাংলা। বাংলা ও বাঙালি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাতৃভাষা মানুষের কাছে সবচেয়ে মধুর। মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবাস জীবন ছেড়ে বাংলার টানে ফিরে এসেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের হয়ে নোবেল জয় আর কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হয়েছেন বাংলা ভাষায় রচনা করে। আমাদের দেশের ৬৮ ভাগ মানুষ শিক্ষিত। যদিও তাদের ইংরেজি জ্ঞানের গভীরতার কথা আমার অজানা নেই। দেশের আদালতে বর্তমানে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের আনাগোনা বেশি। তারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে শুধুমাত্র ভাষার কারণে। অন্যদিকে পথে-প্রান্তরে ইংরেজিতে কি লেখা আছে তাও তারা জানতে পারছে না। আমি আশা করি, বাংলা ভাষা প্রচলন আইন অনুসারে সব ক্ষেত্রে অবিলম্বে বাংলা ভাষা ব্যবহারে আমাদের যে সাংবিধানিক অধিকার, যে আইন পাশ করেছে জাতীয় সংসদ, যে রুল দিয়েছে আদালত তা সরকার ও তার প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে কার্যকর করবে। এ জন্য বিচার বিভাগসহ সরকার ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবেই।

লেখক : প্রাক্তন সভাপতি, ল স্টুডেন্টস ফোরাম, সাতক্ষীরা।