বাঙালির শোকের দিন আজ


574 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বাঙালির শোকের দিন আজ
আগস্ট ১৫, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :

কবি রবীন্দ্র গোপ লিখেছেন, ‘দিকে দিকে পাপমুক্তির আনন্দে/ মানুষ বেরিয়ে পড়বে/ রাজপথ লিখবে আবার/ অভিশাপমুক্তির কলঙ্ক মোচনের ইতিহাস।’ জনক হত্যার সেই পাপমুক্তি ঘটলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের প্রতি বাঙালি জাতি ও বিশ্বমানবতা ধিক্কার জানাবে কালের পর কাল। যত দিন পৃথিবী থাকবে, তত দিনই ঘৃণার নহরও বয়ে চলবে নিরবধি।

শোকাবহ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস আজ। বাঙালির শোকের দিন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭৫-এর এই কালো দিনটিতেই জাতি হারিয়েছে তার গর্ব, আবহমান বাংলা ও বাঙালির আরাধ্য পুরুষ, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও ইতিহাসের এই মহানায়ককে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিনটি পালনে সারাদেশে আজ নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আজ সরকারি ছুটি। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। এতে ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণকারী জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

পঁচাত্তরের সেই রক্তঝরা দিনটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজনসহ নৃশংসভাবে শাহাদাতবরণ করেন ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি কিছু বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিকের কূট চক্রান্ত এবং সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন প্রাণ হারান তার প্রিয় সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল এবং নবপরিণীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। তবে প্রবাসে থাকায় সেদিন প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

আগস্টের মধ্যভাগের সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞে আরও প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগি্নপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে এই শহীদদেরও।

অভিশপ্ত দিনটিতে বাঙালি জাতির ললাটে যে কলঙ্কতিলক পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বেশি সময় পর ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি সে কলঙ্ক থেকে জাতির দায়মুক্তি ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার চূড়ান্ত বিচারের রায় অনুযায়ী ওই দিন মধ্যরাতের পর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তবে পুরো জাতি এখনও প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে বঙ্গবন্ধুর বাকি ছয় পলাতক খুনির ফাঁসি কার্যকরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের।

আজকের কর্মসূচি :দিবসটি পালনে সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।

সকাল সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনী গার্ড অব অনার প্রদান করবে। সেখানে বিশেষ মোনাজাত ও কোরআন তেলাওয়াত অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণকারী জাতির পিতার পরিবারের সদস্য ও অন্য শহীদদের কবরে এবং সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। বাদ জোহর সারাদেশের সব মসজিদে জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ এবং দোয়া মাহফিল হবে। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা ছাড়াও দুস্থ এবং এতিমদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হবে।

এ উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সরকারি-বেসরকারি রেডিও এবং টিভি চ্যানেলগুলো শোক দিবসের অনুষ্ঠানমালা সরাসরি সম্প্রচারসহ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।

জাতীয় শোক দিবসে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে রয়েছে, আজ সূর্যোদয়ক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবন ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দলের সর্বস্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল পৌনে ৭টায় ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতি ও সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, কবর জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল, ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল, দুপুরে অসচ্ছল দুস্থ মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ এবং বাদ আসর মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় নেতারা ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা বক্তব্য রাখবেন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে আজ সকাল সাড়ে ৮টায় ক্লাব লবির দেয়ালে জাতির জনকের প্রতিকৃতি স্থাপন ও শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পঁচাত্তরের কালরাতে শাহাদাতবরণকারী জাতির পিতা ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হবে। একই সময় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে শোক সমাবেশ বরবে। ‘সাংবাদিক সমাজ’ সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সর্বধর্ম প্রার্থনা সভার আয়োজন করবে। জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে দিনব্যাপী ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প বলা’, তার দুর্লভ ছবি, গ্রন্থ ও ডাকটিকিট প্রদর্শনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে জাদুঘর প্রাঙ্গণে। বাংলা একাডেমি বিকেল ৪টায় একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক একক বক্তৃতানুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকা ক্লাবে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ২৮টি বিভাগে বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা প্রদান করবে। গণজাগরণ মঞ্চ বিকেল ৪টায় শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে আলোচনা সভা করবে।

এ ছাড়া সিপিবি, গণফোরাম, জাসদ, ন্যাপ, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, তরুণ লীগ, ওলামা লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, শিল্পকলা একাডেমি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, এফবিসিসিআই, খেলাঘর, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, আওয়ামী শিল্পীগোষ্ঠী, বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, শ্রদ্ধা নিবেদন, কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, প্রার্থনা সভা, খাবার বিতরণ, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিনামূল্যে চিকিৎসা, আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, স্বেচ্ছায় রক্তদান ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে।