‘বানের সাথে আমাগির বাস করতি হতিছে, বাধ একটু বান্দি দাও’


265 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
‘বানের সাথে আমাগির বাস করতি হতিছে, বাধ একটু বান্দি দাও’
মে ২৮, ২০২০ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

এম কামরুজ্জামান

‘ঘুর্ণিঝড় আম্পান আমাগির সব ভাসায় নিয়ে গেছে। বানের সাথে বাস করতি হতিছে। সবখানে নদীর জল। রান্না করার জো নেই। নদীর জোয়ারের জল ঘরের মধ্যি উঠতিছে। শেখের বেটি শেখ হাসিনাকে বলতিছি, আমাগির নদীর বাধ একটু বান্দি দাও। ঝড়ে যেন আর এমনি সর্বনাশ করতি না পারে’।

সুপার সাইক্লোন আম্পানে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া সাতক্ষীরা উপকূলবর্তী আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর এলাকার সত্তর বছর বয়স্ক দীলিপ কুমার বাছাড় আজ এভাবেই তার আকুতি প্রকাশ করছিলেন।

শুধু দীলিপ কুমার বাছাড় নয়, হাজারও দীলিপ কুমার আম্পানের তান্ডবে আজ দীশেহারা। বশত বাড়ি থেকে শুরু করে সব হারিয়ে আজ তারা পথে বসেছে।

আম্পানের ভয়াল থাবায় এই মুহুর্তে আশাশুনির উপজেলার কপোতাক্ষ তীরবর্তী প্রতাপনগর ইউনিয়নের ১৭ টি গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জোয়ার-ভাটা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে তাদের ভাত খাওয়ার থালা পর্যন্তও রেখে যায়নি । ঘুর্নিঝড় আম্পান সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন খাদ্য ও পানির খোঁজে গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটছে দুর্গত এলাকার মানুষ। আাশ্রয়ের জায়গা টুকুও নেই। প্রতি বছর ভেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামত প্রকল্পে সরকার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু আম্পানের তম মহাদুর্যোগে বুঝা যায় সেই টাকা কতটুকু কাজে লেগেছে।

আশাশুনির শ্রিউলা ইউনিয়নের বাঁধ ভেঙে কয়েক হাজার মানুষের ঘরের ভিতর কোমর পানি উঠেছে। দুর্গত এলাকায় জোয়ারের পানি হু হু করে বাড়ছে। জোয়ারের পনি সড়কের উপর দিয়ে প্রবল বেগে বযে যাচ্ছে। ঘর বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। রান্নার জায়গা নেই। খেয়ে, নাখেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে দুর্গত এলাকার মানুষ ।

সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে আনুমানিক ৪৫ কি.মি ভিতরে প্রতাপনগর ইউনিয়ন এই অঞ্চলটি সম্পূর্ণ নদীর সাথে একাকার। জুয়ারের সময় মেইন রাস্তাটিও পানির নিচে তলিয়ে যায় । তাদের কথা অনুযায়ী দিনের বাকি সময় গুলো রাস্তার উঁচু বাজার গুলোতে সময় কাটান। কিন্তু মেইন রাস্তা থেকে একটু ভিতরেই যাদের বাড়ি তাদের দূর্দশার শেষ নেই।

জোয়ারের পানিঠেলে অর্ধডোবা বাড়িতে যাওয়া অসাধ্যই হয়ে পড়ে। স্থানীয় সাইক্লোন সেন্টাল গুলোতে কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। বাকিরা রাস্তার উপর।এখানকার হাজার হাজার মানুষ নদীর বানের সাথে রিতিমতো যুদ্ধ করে চলেছে। কবে বা কতদিন পরে শেষ হবে তাদের এই অস্ত্রহীন ভয়ানক যুদ্ধ তা কেউ জানেও না। নদীতে যখন জোয়ার শুরু হচ্ছে তখন আশাশুনি-কোলা-হিজলা সড়কের উপর কোমর সমান পানি প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে গ্রামের দিকে। গ্রামের পর গ্রাম প্লাাবিত হচ্ছে।

প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান ‘আইলা, সিডরের মতো বড় বড় দুর্যোগ মোকাবেলা করেছি। কিন্তু এমন ভয়ানক দুর্যোগের মুখোমুখি আগে কখনো হয়নি। দুর্গত মানুষগুলো আজ বেড়িবাধ সংস্কারের জন্য মরিরা হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার মানুষ আজ বাধ রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়েছে। তাদের জীবন কাহিনী আজ সব মানবতাকে যেন হার মানিয়েছে। ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা। ঈদুলফেতর যে কবে কখন, কিভাবে চলেগেছে তা কেউ বলতেও পারে না।

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের মাজেদ আলী মাষ্টার বলেন, একদিকে করোনার মহামারি, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছে গোটা আশাশুনি উপজেলা। বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এলাকার হাজার হাজার মানুষ। তাই এবার ভেসে গেছে ঈদের সব আনন্দ। এখন চলছে শুধু কোনো রকমে বেঁচে থাকার লড়াই।

সুপার সাইক্লোন আম্পান ছোঁবলে নদীর ভেড়িবাধ ভেঙে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর , গাবুরা ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় এখনো ভেড়িবাধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। বিধায় জোয়ার ভাটার সাথে তাদেরকে বসবাস করতে হচ্ছে। নদী এখনো উত্তল। জোয়ারের পানিতে মুন্সিগঞ্জ-নীলডুমুর সড়ক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বসত বাড়ি পানিতে ডুবে থাকায় দুর্গত এলাকায় রান্না-খাওয়া প্রায় বন্ধ।

দুর্গত এলাকায় গবাদী পশু আর হাঁস মুরগী পানিতে ডুবে মারাগেছে। জোয়ার ভাটার কারনে প্রতি মুহুর্তে স্থানীয়দের ঘরের কাঁচা দেয়াল ধসে পড়ছে।

শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার কয়েক হাজার চিংড়ি ঘের পানিতে ভেসে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়ছে। চিংড়ি চাষিরা সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে আমপানে ১৭৬ কোটি টাকার চিংড়ি শিল্পের ক্ষতি হয়েছে। ১৩৭ কোটি টাকার কৃষি ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাণিসম্পদেও ক্ষতি হয়েছে ৭৭ কোটি টাকার।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক সাতক্ষীরার দুর্গত এলাকা পরিদর্শন শেষে বলেছেন শিঘ্রই টেকসই ভেড়িবাধ নির্মান কাজ শুরু হবে। সেনা বাহিনী কাজের তদারকী করবে। বেড়িবাধের পাশে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এই বাধ টিকে থাকবে। কোন দুর্যোগে এই এলাকার মানুষকে আর এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে না।

#