বিচার না পেয়ে, ক্ষোভ আর ঘৃনায় দগ্ধ হয়ে ১৮ দিন পর হাসপাতল ছেড়েছে শিশু বীথি


475 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বিচার না পেয়ে, ক্ষোভ আর ঘৃনায় দগ্ধ হয়ে ১৮ দিন পর হাসপাতল ছেড়েছে শিশু বীথি
সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

 

 
মোজাফ্ফর রহমান :
নির্যাতনের বিচার না পেয়ে ক্ষোভ আর ঘৃনায় দগ্ধ হয়ে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতল ছাড়লেন দশ বছর বয়েসের দেশ ব্যাপী আলোচিত বর্বর নির্যাতনের শিকার সেই কাজের মেয়ে বীথি। অবশেষে হতদরিদ্র রিবারের মা-হারা শিশুটির জায়গা হয়েছে বাগেরহাটের শিশু সংশোধনাগারে। শনিবার সকালে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল থেকে বাগেরহাটের শিশু সংশোধনাগারের উদ্দেশ্যে রওনা হয় শিশুটি।
এদিকে, সাতক্ষীরা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: নূরুল ইসলামের বাসা থেকে ১৮ দিন আগে উদ্ধার কঙ্কালসার সেই শিশুটি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে মাত্র আড়াই সপ্তাহের ভাল চিকিৎসা ও খাবার পেয়ে তার চেহারা ও শারীরিক গঠন পদলে গেছে। তার স্বাস্থ্য ও চেহারার পরিবর্তন দেখে চেনার  উপায় নেই নির্যাতনের শিকার বীথিকে। আড়াই সপ্তাহ ব্যাবধানের এই চেহারায় বলে দেয়, ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় কি ধরণের খাবার কষ্ট ছিল শিশুটির।
বিথি শনিবার সকালে হাসপাতাল ত্যাগের আগেই জানালেন, আমি লেখাপড়া শিখে পুলিশ অফিসার অথবা বিচারক  হতে চাই। সমাজে যারা শিশুদের নির্যাতন করবে তাদেরকে আমি নিজের হাতে শাস্তি দিতে চাই। মেয়েটি বলে, বিচারক  নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাতাশা বেগম সেদিন পায়ে ধরে ছিল, যেন তার নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশ কিংবা অন্যকাউকে আমিনা বলি। এ কারনে ভয়ে গত ১৯ আগষ্ট সাতক্ষীরার বিচারক নুরুল ইসলামের বাসা থেকে উদ্ধারের সময় সব কিছুই চেপে গিয়েছিল শিশু বিথি। বিথির পিতা গোলাম রুসুল কে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বড় আমিনিয়া গ্রাম থেকে ডেকে এনে একটি অভিযোগ লিখে নিয়েছিল ঠিকই সে দিন। কিন্ত অজ্ঞাত কারণে মামলাটি রেকর্ড করেননি পুলিশ।

সচেতন মহল বলছেন, সাতক্ষীরার বিচার বিভাগ, পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, মানবাধিকার কর্মীদের কাছ থেকে নির্যাতনের বিচার চেয়ে না পেলেও সামাজিক বিচার পেয়েছে শিশুটি। সাতক্ষীরার সচেতন নাগরিকরা বিচারের দাবীতে রাস্তায় নেমে একাধিক সভা-সমাবেশ করে শিশু নির্যাতনের বিচার চেয়েছে। তারা আন্দোলন করেছে। শিশু বীথী এজন্য যাওয়ার সময় সাতক্ষীরাবাসীকে ধন্যবাদ জানাতে ভূলেনি।
সাতক্ষীরায় জুডিশিয়াল আদালতের  বিচারক নরুল ইসলাম ও স্ত্রী নাশাতার পৈশ্বাচিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর গত ১৮ দিন ধরে ১০ বছরের শিশু বীথি চিকিৎসা নিয়েছিল সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। বিথির শরীরে আগের মত দগ দগে গরম খুনতির স্যাঁকা ও নির্যাতনের সেই দগদগে ঘাঁ  শুকিয়ে গেলেও শুকায়নি সেই নির্যাতনের চিহৃ।
গত ৩০ আগষ্ট দ্বিতীয় দফায় রাত  সাড়ে ১১ টা ১৫ মিনিটে বীথির বাবা মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বড় আমিনিয়ার গ্রামের গোলাম রসুল বিশ্বাস সাতক্ষীরা থানায় গিয়ে লিখিত ভাবে অভিযোগ দেয়। তিনি তার মেয়ের উপর বর্বর নির্যাতনের বিচার চেয়ে এজহার দায়ের করেন। কিন্তু দ্বীতয় দফায় দাখিল করা পুলিশ সেই এজহারটিও মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি।
গত ১৯ অগাস্ট সাতক্ষীরার বিচারিক হাকিম নুরুল ইসলামের সাতক্ষীরা শহেরের পলাশপোল এলাকার ভাড়া বাসা থেকে নির্যাতনের শিকার শিশু বিথিকে উদ্ধার করা হয়। সেদিন  সাতক্ষীরা চীফজুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা, সাতক্ষীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদর (সার্কেল) এএসপি আনোয়ার সাঈদ, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদ শেখ এবং সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রট নুরুল ইসলামের বাসা থেকে শিশু বিথিকে উদ্ধার করে। কঙ্কালসার শরীর নিয়ে বিথিকে দ্রুত ভর্তি করা হয় সাতক্ষীরা হাসপাতালে। সেখানে পুলিশ হেফাজতে চলে বিথির কিকিৎসা।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া মা-হারা বিথি আর কখনও তার বাবার কাছে ফিরে যেতে চাই না। কারন হিসেবে বিথি জানায় তার বাবা বিচারকের বাসায় কাজ করতে না দিলে তার এত নির্যাতন সহ্য করতে হতো না।
সাতক্ষীরা সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আনোয়ার সাঈদ জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয় আদালতে। আদালত শিশু বিথিকে সুস্থ্য হওয়ার পর বাগেরহাটা শিশু সংসোধনাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের আদেশে তাকে পাঠানো হয়েছে বাগেরহাটের শিশু সংশোধনাগারে।
এদিকে, শনিবার সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎিসাধিন বিথিকে দেখতে গিয়ে অন্য এক বিথিকে দেখা গেল। বিচারক নুরুল ইসলামের বাসায় তার স্ত্রী নাতাশার সেই খুনতির স্যাকা গরম পানি দিয়ে ঝলসে দেয়া শরীরের দগদগে ঘাঁ আর নেই বিথির শরীরে। চিকিৎকেরা তাকে সুস্থ্য করে তুলেছে। হাসি খুশি বিথি এখন খুই ভাল আছনে। তার সেই কঙ্কালসার শরীর আর নেই। সে এখন স্বাস্থবান কিশোরী। তবে বিথির শরীরে এখন শুধুই রয়ে গেছে নির্যাতনের সেই চিহৃ। যা কখনও মুছবার নয়।

বিথি জানালেন আমি  (বিথি) খুব ভাল আছি। টেংরা মাছের ঝোল, গরুর মাংস, বিরানী তার খেতে ইচ্ছা হলেই পুলিশ আংকেলরা তাকে খেতে দেয়। কিন্ত বিথি যখন ম্যাজিট্রেট নরুল ইসলামের বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে থাকত তখন কতবার তার সামনে ভাল খাবার তারা (ম্যাজিট্রেট নরুল ইসলাম ও স্ত্রী নাতাশা) খেয়েছে তার হিসেব নেই, কিন্তু তাকে দিত না। খেতে চাইলেই মারপিট করত। কারণে অকারণে বিথিকে বিচারকের স্ত্রী নাতাশা প্রায়ই মারতো। হাত-পা বেধে রাখত। কাজ না পারলে গরম খুনতির স্যাকা দিত। গরম পানি তার শরীরে ঢেলে দিত। এভাবে সাতক্ষীরা বিচারক নুরুল ইসলামের বাসায় কেটেগেছে কমপক্ষে ৬ মাস বিথির ওপর নির্যাতন। খেতে না পেরে শরীর কঙ্কার হয়েগেছে এমন দাবী সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সামছুর রহমানের।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদ শেখ জানান, অভিযোগপত্র মঙ্গলবার হাতে পেয়েছি। মামলা রেকর্ড করার ব্যাপারে পর্যালচনা চলছে। কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
লিখিত ওই অভিযোগে বাদি গোলাম রসুল উল্লেখ করেছেন, এক বছর দুই মাস আগে তার গ্রামের রুস্তম আলি বিশ্বাসের ছেলে, সাতক্ষীরা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কর্মচারি সোহরাব হোসেন ওরফে সাগর তার মেয়ে বীথিকে ভালকাজ ও পাশাপাশি লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। পরে সে বীথিকে সাতক্ষীরার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: নুরুল ইসলামের পলাশপোলের ভাড়া বাড়িতে গৃহকর্মী হিসাবে রেখে দেয়। এর পর থেকে তার মেয়ের সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি। এমনকি ফোনে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি গত ১৭ এপ্রিল  স্বশরীরে সাতক্ষীরাতে এসে অনেক চেষ্টার পর সাতক্ষীরার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা’র রুমে তার মেয়েকে দেখতে পান।  কিন্তু সেখানে তেমন কথা বলার সুযোগ পাননি তিনি।
শিশু বিথির উপর নির্যাতনের ঘটনায় সাতক্ষীরা মাববন্ধন-মিছিল-সমাবেশ হলেও শেষ পর্যন্ত বিথির নির্যাতনের ঘটনায় মামলা রেকর্ড হয়নি। পুলিশ মামলা নেয়নি। ফলে বিথির শারীরিক নির্যতনকারী সাতক্ষীরা জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট নরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাতাশা থেকেই গেলো ধরা ছোয়ার বাইরে।
‘এই ঘটনায় কি জবাব দেবের সাতক্ষীরার বিবেকমান মানুষেরা’ এই প্রশ্ন রেখেই সাতক্ষীরা থেকে বিদায় নিলেন বীথি ও তার স্বজনেরা।