বিপাশা’র স্মৃতির ভাঁড়ার


537 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বিপাশা’র স্মৃতির ভাঁড়ার
আগস্ট ৯, ২০১৫ ফটো গ্যালারি বিনোদন
Print Friendly, PDF & Email

শিল্পের যিনি অভিযাত্রী – তাঁর বিস্ময় ও অন্বেষণ তো সর্বত্র: দেখায়, আঁকায়, যাপনে, পরিভ্রমণে, জীবনের নানা পরতে পরতে। একজন শিল্পী কখনো কখনো আনন্দ-ভ্রমণকারীও। চেনা, চিরপরিচিত জায়গাতে, অভ্যস্ত সংসারে, সদাব্যস্ত পৃথিবীতেও তাঁর জন্য অবাক করা সৌন্দর্য, সোনালী অতীত কিংবা বিস্ময়াবিষ্ট রূপ কিংবা কালিমাক্লিষ্ট মদিরা অপেক্ষা করে থাকে।

বিপাশা হায়াৎ যত বড় অভিনয় তারকা, শিল্পী হিসেবে ঠিক ততটা খ্যাতিমান নন, কিন্তু তাঁর শিল্পের প্রতি নিবেদন, সাধনা যে কোনো বড় শিল্পীর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সাড়ে তিন বছর ধরে একটি সিরিজ নিয়ে নিমগ্ন, ধ্যানমগ্ন থেকেছেন শিল্পী বিপাশা হায়াৎ। সিরিজটির নাম Realm of Memory বা স্মৃতির রাজ্য। নিজের সমস্ত স্মৃতির টুকরোটাকরা তিনি জড়ো করেছেন তাঁর ক্যানভাসে, বিমূর্ত প্রকরণে।

৩ আগস্ট, বিকেলবেলায় বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জের কর্মীদের নিয়ে নিজের শিল্পকর্মগুলো স্থাপন করছিলেন গ্যালারিতে বিপাশা। তাঁর নিমগ্নতা, দেয়ালে ঝোলানো-সাজানো নিয়ে খুঁতখুঁতানি প্রমাণ করে, বিষয়টা নিয়ে তিনি কত বেশি মনোযোগী। সেখানেই, দুটো ক্যানভাসের সামনে বেঞ্চ পেতে আলাপ হলো শিল্পীর সাথে তাঁর চতুর্থ একক প্রদর্শনী নিয়ে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বিপাশা আপা, ৮ আগস্ট আপনার প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে, এই প্রদর্শনীটা আসলে আপনি কি কি মাথায় রেখে সাজিয়েছেন?
বিপাশা হায়াৎ: আমি যে কাজগুলো করছি গত তিনবছর ধরে, তা স্মৃতি নিয়ে। মনোজগতে স্মৃতির যে বিচরণ সেটিকে আমি আসলে নিজে দেখার চেষ্টা করেছি। সবসময় মনোজগৎ নিয়ে কাজ করতে আমার ভালো লাগে। যদি বলি যে, সেজন্যই বিমূর্ত ধারার কাজ এগুলো । কারণ মূর্ত যে বিষয়গুলো আছে আমাদের চারদিকে, যেগুলো আমরা দেখতে পাই, আমার ছবিতে কোনো ডিফাইনড সেরকম ফর্ম নেই, যদিও আমার কাজগুলো আবার ফর্মবেইজড। স্মৃতির প্রতিটি, খণ্ড খণ্ড স্মৃতি যেটা সেটাকে আমি আসলে মিলিয়েছি পুরনো সভ্যতায়, মানে আমরা যখন সেরকম কোন জায়গায় যাই, পুরনো সভ্যতা, ভেঙে পড়া, প্রাচীন সাম্রাজ্যের অংশ বা আর্কিটেকচারাল যে পার্টিকলসগুলো সেই জিনিসগুলো থেকে আমি ফর্ম নিয়েছি, কারণ আমার ছোটবেলাটাতে আমার এমন অনেক ইন্ট্যার্যাুকশন হয়েছে এমন এনসিয়েন্ট সভ্যতার বিভিন্ন সাইটসগুলোতে। এখানে যেটা হয়েছে, আমি আমার মনোজগতকে প্রকাশ করেছি। প্রত্যেকটা ক্যানভাসই হচ্ছে আমার মনোজগতের একটা ভিস্যুয়াল প্রেজেন্টেশন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপা, অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে যখন কোন শিল্পী কাজ করেন, তখন দর্শকদের স্বাধীনতা অনেক বেড়ে যায় শিল্পকর্মটি উপভোগের জন্য। শিল্পী যেন নিজের আঁকা শেষ করে ক্যানভাসটি তার কাছে ছেড়ে দেন, নিজের ভাবনা ও স্বকীয় স্মৃতি, চিন্তা এসব যুক্ত করে, দর্শক তখন সেটা উপভোগ করেন। ফলে, দর্শক, সে তার মতো করে কানেক্টেড হয়, সেটা হয়তো তারও মনোজগতে একধরনের ছাপ ফেলে। শিল্পীর ধ্যান ও চিন্তা এই প্রক্রিয়ায় শেয়ারড হয় দর্শকের সাথে। একটা যোগাযোগসেতু তৈরি হয়। এবং স্মৃতি শব্দটা এলেই কিন্তু আমাদের সবার শৈশবের কথা মনে হয়। এখানে যে কাজগুলো দেখতে পাচ্ছি, কালার দেখতে পাচ্ছি, অনেক স্প্যাচুলার দাগ দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি ঘর ঘর ঘর ঘর, বিমূর্ত তো বটেই, এই যে আবার আবার দেখা, এটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন! বিমূর্ত কাজ তো সময়ভেদে ভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন দেয়, আপনি যখন এঁকেছেন, তখন কাজগুলো আপনার সাথে একরকম ইন্টারপ্রিটেশন দিয়েছে, এখন যখন কাজগুলো গ্যালারিতে ঝুলিয়ে দেখছেন, দর্শক হিসেবে, তখন একধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে আপনার মধ্যেই, আপনার এখনকার প্রতিক্রিয়া জানতে চাচ্ছি।
বিপাশা হায়াৎ: আমি ভাবছি যে, ভাবনাটা বলার আগে, আমার ধারণাটা আমি বলে নিই। আমার ধারণাটা হচ্ছে যে, আমাদের শরীরের একটা মাপ আছে, নির্দিষ্ট মাপ, ধরেন পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি আমার হাইট, কিন্তু আমার ভেতরে যে মন সেটার ব্যাপ্তি অসীম, এবং এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমার মনে হয় যে মনের কিন্তু কোন সীমা পরিসীমা নেই, মন একটা অসীম স্পেস, আমি মনে করি যে, এই যে বিশ্বজগৎ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার চাইতেও বড়, নেভার এন্ডিং এবং ইনফিনিটি একটা স্পেস, এটা কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার যে আপনি জানেন না মনের অবস্থান কোথায়! এটাও আমরা জানিনা। এটা আমার মস্তিষ্কে, নাকি বুকের ভেতর!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নাকি হৃদয়ে!
বিপাশা হায়াৎ: হৃদয়টাই বা কোথায়! হৃদয় বা মন, এটার অব্স্থান আমরা বুঝতে পারি না। এবং এটার ব্যপ্তি যে কত বড়, আপনি এখানে চোখ বন্ধ করে কিন্তু চাঁদের দেশেও বসে থাকতে পারেন। বা আপনি মঙ্গলগ্রহে বেড়িয়ে আসতে পারেন, বা আপনি অন্য একটি ইউনিভার্সে ঘুরে আসতে পারেন। এই যে এতো মুভিজ হচ্ছে, যেগুলো হচ্ছে এলিয়েনসদেরকে নিয়ে, সেটা কি! সেটা তো আসলে মানুষের মনোজগৎ নিয়ে!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানুষের কল্পনাপ্রতিভা!
বিপাশা হায়াৎ: এই যে কল্পনা, ইমাজিনেশন, ইমাজিনেশনের আসলে কোনো ব্যারিয়ার নেই, কোন বাঁধা নেই, আপনার ভাবনাকে কেউ আসলে বাঁধা দিয়ে আটকাতে পারে না, কেউ বাঁধা দেবে না। এখানে, আমার, যত বড় ক্যানভাসই হোক না কেন সেটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ আমার মনের। যেখানে স্মৃতিরা এভাবে আনাগোনা করছে এবং কখনো স্মৃতিরা খুব প্রকটভাবে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, কখনো আবার কিছু স্মৃতি খুব ক্ষয়ে যাওয়া, কোন কোন স্মৃতি খুব উজ্জ্বল, কখনো অনুজ্জ্বল। কোনো কোনো ক্যানভাসে আমি হয়তো যে দিনটির কথা ভেবেছি, সে দিনটির রঙগুলি নিয়ে আমি কাজ করেছি। আবার কিছু ক্যানভাস আছে, যেমন এই ক্যানভাসটাতে (পেছনের ক্যানভাসটা দেখিয়ে), স্মৃতিগুলো কিভাবে আমার মধ্যে বিচরণ করে সেভাবে কাজগুলো করেছি। আবার হয়তো, এমন হয়েছে, যেমন সামনে যে ক্যানভাসটা আছে—

শিমুল সালাহউদ্দিন: এটাতে আবার প্রচণ্ড উজ্জ্বল সব কালার—
বিপাশা হায়াৎ: এই যে বৃষ্টির ভেতরে, অনেক বৃষ্টির ভেতরে যখন হঠাৎ করে রোদ উঠলো, তখন আমার মনে খুব চনমনে আনন্দ হলো, এই যে একটা আনন্দ, সূর্য এবং আলো, এটা যে মানুষের জীবনীশক্তির উৎস, সেটাকে ধরে রাখার জন্য আমি এই কালারগুলি ব্যবহার করেছি। দেখলেই যেন মনে হয় যে, হ্যাঁ, এখানে একধরনের পাওয়ার আছে, যে পাওয়ারটা আমাদের সোলার সিস্টেম থেকে আমরা পাচ্ছি, মানুষ পাচ্ছে, কাজ করার জন্য, স্ট্রেংথটা, নট অনলি শক্তি অর্থে, পাওয়ারটা আমি বলছি জীবনীশক্তি, কর্মশক্তি অর্থে। তো আমার এই ভাবনার স্মৃতিটা ধরে রাখার জন্য কিন্তু এই ক্যানভাসটা। এই কাজের ধারায় কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে আমার জন্য যত বড় ক্যানভাস হয়, ততবেশি আমার মজা, যে আমার মনের জগৎটা, মনোজগৎটা কত বড় যদি আমি দেখাতে পারতাম!

bipasha-2.jpg
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্! অসাধারণ বলেছেন। আপা, ২০১১ তে আপনার সর্বশেষ প্রদর্শনী হলো বেঙ্গলে, শিল্পীর জন্য তো নিমগ্নতা প্রয়োজন হয়,আমরা তো আপনার অনেকগুলো ব্যস্ততার কথা জানি, ইদানিং আপনি অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাও করছেন, স্ক্রিপ্ট লিখছেন নাটকের জন্য, অভিনয়তো করছেনই! এতকিছু ম্যানেজ করছেন কিভাবে আসলে?

বিপাশা হায়াৎ: (হাসি) হা হা হা, আসলে আমি ছবিই আঁকছি। গত পাঁচ ছয় বছর ধরে চিত্রকর্মটা, ছবিটাই আমার মূল কাজের জায়গা। নাহলে হয়তো আমার পক্ষে এভাবে প্রদর্শনী করা সম্ভব হতো না। কারণ, আমার ছবির জন্য প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। নাটকের যেটা বিষয়, সেটা আসলে আমরা বড় হয়েছি এটার ভেতরে। অনেক দিনের, একটা পারিবারিক চর্চার ভেতরে আছি, এবং ছবি আঁকতে আঁকতে আমি কিন্তু ভাবি, ছবি আঁকলেই কিন্তু হয় না, ভাবনার জন্যও সময় লাগে, আমি হয়তো কিছু করছি না, মানুষ হয়তো ভাবছে আমি কিছু করছি না, কিন্তু আমি ভাবছি ছবি নিয়ে। ভাবছি গল্প নিয়ে, নাটক নিয়ে। আমার ভালো লাগছে যে আমি সবগুলো শিল্প মাধ্যমগুলোর সাথে আমি যুক্ত আছি, এবং আমাদের নিজেদের প্রোডাকশন হাউস আছে, সেটার জন্য আমরা করি একসাথে ( স্বামী অভিনেতা তৌকির আহমেদর সাথে)। গত ছয় বছর ধরে আমি বছরে হার্ডলি দুটা নাটকে অভিনয় করি। বা স্ক্রিপ্ট লিখলেও সেটা হয়তো ম্যাক্সিমাম বছরে দুটা তিনটা স্ক্রিপ্ট লিখি। আমার এর আগের একযুগের তুলনায় এটা কিন্তু সংখ্যায় খুবই কম। খুবই কম। আমি মূল কাজটাই করছি ছবি নিয়ে। আপনি যদি আমার বাসায় যান, দেখবেন যে আমি আসলে সারাক্ষণই এই কাজটা নিয়ে আছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমি আমার সংসার খুবই আনন্দ নিয়ে করি। ছবি আঁকা আমার সেই সংসারেরই একটা অংশ। আমার সংসার, আমার সন্তান, আমার স্বামী—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিল্পের সংসার, শিল্পের যাপন—
বিপাশা হায়াৎ: একদম। এবং এখানে আমি বলতে চাই, বারবারই বলতে চাই যে, আমার স্বামী, তৌকির, তৌকিরের কথা বলবো, যে ওর সাপোর্ট ছাড়া, আমি কিছুই করতে পারবো না। কারণ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা নারী, বা একজন মেয়ে এতো কাজ করবে, এটা কিন্তু খুব কঠিন কাজ, এবং আমি কন্টিনিউয়াসলি যে ওর সাপোর্টটা পেয়ে যাচ্ছি, আমি আসলেই ওর কাছে কৃতজ্ঞ। বাবা-মার কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না, বাবা মা সবসময় মানসিকভাবে আগলে রাখে, সন্তানের ইন্টারেস্টকে মূল্য দেয়, কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে সেই মূল্যটা পাওয়া এবং সেই পরিমাণ উৎসাহ পাওয়া, প্রতিটি মুহূর্তে, আমি মনে করি যে এটা কিন্তু আমার জন্য সৃষ্টিকর্তার অনেক বড় একটা উপহার আমার জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অভিনন্দন আপনাকে। আপা, পুরো গ্যালারিজুড়েই অনেক বড় বড় ক্যানভাস দেখছি, এবং প্রচুর কাজ। আমরা জেনেছি, আপনি দীর্ঘ তিনবছর ধরে এই সিরিজটা নিয়ে কাজ করছেন, তিনবছর ধরে একটা সিরিজ নিয়ে কাজ করতে পারা কম কথা নয়, প্রচণ্ড নিমগ্নতা, একটা মৌল ব্যাপার নিয়ে লেগে থাকা, কঠিন সাধনারও বিষয়। এবং এই সিরিজের সব কাজ দিয়ে আপনি প্রদর্শনীটাও করছেন না, বাছাই করা কাজ দিয়ে করছেন। এই প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে কি আপনার এই সিরিজটায় কাজ করা শেষ হচ্ছে?
বিপাশা হায়াৎ: খুবই খুশি হলাম এই প্রশ্নটা শুনে, আমার মনে হলো যে আপনি ছবি নিয়ে অনেক ভাবেন, শিল্পীকে নিয়ে অনেক ভাবছেন, শিল্পকর্মগুলো নিয়ে ভাবছেন। এ প্রশ্নটা কেউ কখনো আমাকে করেনি, এর মধ্যে যারা ইন্টারভিউ করেছে। কিন্তু আমি নিজেই অনেককে বলেছি যে, আমার ধারণা, আমি হয়তো এই প্রদর্শনীটার পরে, এই ধারায় কাজ না-ও করতে পারি। কারণ আমি অলরেডি ভাবছি যে আমার নেক্সট প্রদর্শনীটার জন্য আমি আবার নতুন একটা ধারণা নিয়ে, নতুন একটা কন্সেপ্ট নিয়ে কাজ শুরু করবো।

আমার কালারের যে অ্যাপ্লিকেশন সেটা হয়তো আমার মতোনই হবে, যেমন আমি স্ক্রিপ্ট লিখছি প্রতিদিন নতুন নতুন, ছবি আঁকছি, নিজস্বতা কিন্তু একটা কিছু থাকেই মানুষের। হ্যাঁ, যেমন ধরেন আমার হ্যান্ডরাইটিংটা কিন্তু আর কারো মতোন না, অন্য কারো হ্যান্ডরাইটিং আমার মতোন সেইম হবে না। আমার যে আপব্রিঙ্গিং, আমার যে বেড়ে ওঠা, আমার চারপাশের প্রভাব পড়বে আমার স্বকীয়তায়, কিন্তু দিনশেষ আমি যা কিছু করছি, সেটাই আমি। এ কাজগুলো করতে গিয়ে কিন্তু আমি রঙের ভেতরে তাদের যে কেমেস্ট্রি, সেটা কিন্তু আমি নানানভাবে আবিষ্কার করেছ

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্! দ্যাটস গ্রেট—
বিপাশা হায়াৎ: কোন কালারটা আসলে অন্য কালারগুলোকে এভাবে ইনফ্লুয়েন্স করছে, বা যদি বলি যে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার ভেতরে প্রভাব রাখছে!
বিপাশা হায়াৎ: হ্যাঁ, কমপ্লিমেন্ট করছে। ক্যানভাসের মধ্যে কমপ্লিমেন্ট করছে একটা কালার আরেকটা কালারকে, মানে, এটাও একটা অনেক মজার একটা খেলা আসলে, তো, নেক্সট-এ, আপনি যেটা বললেন, আমার ইচ্ছা আছে, নেক্সট ইয়ারে একটা প্রদর্শনী করার, যেখানে আমি একেবারেই হয়তো, যেটি আমাকে ভাবাবে, বা ভাবাচ্ছে সেই বিষয়টিই হয়তো তুলে আনবো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমাদের এখানে নারীশিল্পীদের মধ্যে বিমূর্ত ধারায় কাজ করেন এমন শিল্পী প্রায় অপ্রতুল। একজন নিমগ্ন শিল্পী হিসেবে এই শহরের এসময়ের শিল্পচর্চা নিয়ে আপনার ভাবনা কি আসলে, এসময় আর যারা যারা কাজ করছেন তাদের কাজ নিয়ে আপনি কি ভাবছেন?
বিপাশা হায়াৎ: আমি আসলে ভাবতে চাই গ্লোবালি। আমি আসলে শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিজেকে দেখতে চাই না। আমি ভাবছি যে, পৃথিবীতে কী হচ্ছে, আমি সারাক্ষণই গুগল সার্চ করি, আমার অনেক আর্টিস্ট লিংকস আছে, ফেসবুক আছে, আমি দেখছি সারাক্ষণই যে পৃথিবীর কোথায় কী ধরনের শিল্পচর্চা হচ্ছে। পেইন্টিং নিয়ে। সবাই কিন্তু বিভিন্ন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করছে। এবং সবকিছু এখন খুব বেশি অনুভূতি-বেইজড, ইমোশন-বেইজড কাজ এবং সেনসেটিভ ইস্যুজ নিয়ে প্রচুর কাজ হচ্ছে। আবার একই সাথে রিয়েলিস্টিক কাজও যে হচ্ছে না, তা না। হাইপার রিয়েলিস্টিক প্রচুর কাজ হচ্ছে, হাইপার রিয়েলিজম নিয়েও কাজ হচ্ছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সারাবিশ্বেই শুধু নয়, আমাদের এখানেও হচ্ছে।
বিপাশা হায়াৎ: হ্যাঁ, আমাদের এখানেও হচ্ছে। বাইরে আমি দেখে এসেছি, যেভাবে কাজ করা হয়, ফটোগ্রাফিক কোয়ালিটিটা এচিভ করাই অনেক শিল্পীর লক্ষ্য, সেটা আবার আরেক ধরনের কাজ, সেটার পেছনেও আরেক ধরনের চিন্তাভাবনা আছে। কিন্তু আমি সেরকম কাজ করিনি। আমি বলবো যে, আমাদের এখানে এখন যারা আছেন, তারাও কিন্তু বিশ্বমানের কাজ করছেন। তাদের অনেকেই অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং তারা সাকসেসফুল। নারীশিল্পীরাও কিন্তু ভীষণ সাকসেসফুল বাংলাদেশে। সো, নারীপুরুষ নির্বিশেষে আসলে শিল্পী। কোন একটা শিল্পকর্ম শিল্পীকে বিবেচনা না করেই দেখা দরকার। সেটা নারীর আঁকা না পুরুষের আঁকা, এটা কিন্তু বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে, মানুষ হিসেবে আমি আসলে কি অনুভব করি, সেভাবেই আসলে আমি প্রকাশ করতে চেয়েছি নিজেকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই প্রদর্শনী তো আট আগস্ট শুরু হচ্ছে। কিভাবে উদ্বোধন হবে প্রদর্শনীর?
বিপাশা হায়াৎ: উদ্বোধন করছেন হিজ এক্সেলেন্সি অ্যাম্বাসেডর অফ কোরিয়া মিঃ লি ইয়ুন ইয়াং। উনি খুবই শিল্পসমঝদার এবং আর্টিস্টদের প্রতি উনার একধরনের, কি বলবো—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং সম্প্রতি আপনারা কয়েকজন শিল্পী দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছিলেন!
বিপাশা হায়াৎ: হ্যাঁ, গতবছর আমরা কোরিয়া গিয়েছিলাম এবং উনিই ছিলেন আমাদের সাথে। আর্টিস্টদের প্রতি আসলে উনার একধরনের শ্রদ্ধাবোধ আছে, ছবির প্রতি একধরণের প্যাশন আছে উনার। এবং এতদিনে আমরা যেমন উনাকে দেখেছি যে উনি খুবই শান্ত, সোবার একজন মানুষ। আমার প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন তিনি এবং সাথে যিনি থাকবেন তিনি আমাদের সবার প্রিয়, সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক—
বিপাশা হায়াৎ: আপনারা সবাই জানেন, হ্যাঁ, উনাকে সবাই-ই জানে আসলে, আমি খুবই কৃতজ্ঞ তাদের দুজনের কাছে, যে, তারা দুজনই আসলে একসাথে ওপেন করবেন প্রদর্শনীটা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্! মনজুর স্যার কি আপনার আঁকাআঁকি দেখেছেন?
বিপাশা হায়াৎ: যেটা হয়েছিল মনজুর স্যার আসলে আমার প্রথম যে প্রদর্শনীটা হয়েছিল বেঙ্গল শিল্পালয়ে, সেখানে স্যারের একটি রাইট-আপ ছিলো আমার ক্যাটালগে, এবং স্যার সেটার জন্য আমার বাসায় এসে আমার ছবিগুলো ভীষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন, আমার সাথে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেছিলেন, আমি কিভাবে করেছি, টেকনিক, থিংকিং সবকিছু নিয়ে কথা বলেছিলেন, আমার থটপ্রসেস, সবকিছু নিয়ে কথা বলেছিলেন। আমার মনে হয় যে, সে ঘটনার এতদিন পরে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, স্যার হয়তো সেটা বুঝতে পারবেন এতদিন পরে। কারণ উনি এতো মেধাবী একজন মানুষ, উনি হয়তো স্ট্রংলি, বোল্ডলি, নিউট্রালি বলতে পারবেন আসলে আমার কিছু হলো বা না হলো কি না! যদিও আমাদের অনেক শ্রদ্ধেয় অগ্রজ শিক্ষকরা রয়েছেন, রয়েছেন শিল্প সমালোচকরা, তাদের মতামত ও সহযোগিতাকেও আমি সবসময় স্বাগত জানাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে আপনার সামনে পেছনে কাজগুলো দেখতে পাচ্ছি আমরা, হুইচ টেকনিকস আর অ্যাপ্লাইড?
bipasha-3.jpg
বিপাশা হায়াৎ: আমি বলবো যে আমি খুব সহজভাবে কাজ করেছি। আমার প্রথম প্রদর্শনীর সময়—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সহজভাবে মানে কী? স্বতস্ফূর্তভাবে?
বিপাশা হায়াৎ: না। সহজ বলতে, রঙের মিক্সচারে আমি এক্সপেরিমেন্ট করেছি, কিন্তু যেটা হয় যে, টেক্সচার নিয়ে এটা করা একটু, ওটা করা একটু, ওগুলোর ভেতরে আমি যাইনি। আমার কথা হলো যে, আমি চেয়েছি, আমার ছবি কথা বলুক, আমার টেক্সচার যেনো বেশি কথা না বলে। যেনো এটা টেক্সচার-বেইজড কাজ না হয়। টেক্সচার যদি আসে, সেখানে যেন নিজের কারণে আসবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসবে। যে আমার টেক্সচার যেগুলো আছে, সেগুলো কিছু রঙের টেক্সচার আছে, আমার কিছু রাইটিংস আছে, যেগুলা আমি ব্যবহার করেছি, অনেক লাইনস আছে, আবার রঙের উপরে যখন আমি একটা ওয়াশ দিয়েছি, তার টেক্সচারটা চলে এসেছে, অটোমেটিক্যালি। কিন্তু আমি আমার প্রথম প্রদর্শনীতে, আমার একধরনের ইয়ে ছিলো যে, সেটা হয়তো অনেক টেক্সচারসর্বস্ব ছিলো, বলে আমার এখন মনে হয়। কিন্তু এই ছবিগুলোতে আমি আমার মনের ভেতর ডুব দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমি সবকিছু ভুলে গিয়েছি। আমার শুধু মনে হয়েছে আমি নিজেকে উপস্থাপন করতে চাই, আমার মনোজগৎকে। ক্যানভাসে তুলে আনতে চাই এবং মানুষ যেন আমার মনোজগৎটিই প্রত্যক্ষ করে। প্রতিটা মানুষতো আলাদা, আপনি ছবি আঁকলে আপনার মনোজগৎ, ক্যানভাসও আলাদা হবে। আমার মনোজগৎ একরকম হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে এখানেই কী সেই স্বাতন্ত্রের প্রশ্ন!
বিপাশা হায়াৎ: হ্যাঁ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ধরেন, আপনি এই ছবিগুলো আঁকেন নাই, আপনি এই শিল্পীর স্বাতন্ত্রকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?সেটা কি পসিবল ফর ইয়্যু?
বিপাশা হায়াৎ: আমার তো মনে হয় যে পসিবল, ভেরি মাচ পসিবল। কারণ এখন তো আমি দর্শকই কেবল। আমার মনে হয় প্রতিটি ছবির ভেতরেই একধরণের স্মৃতির আনাগোনা আছে। অনুভূতির অনুরণন আছে স্মৃতির। এবং টুকরো টুকরো স্মৃতি, কথাটা কিন্তু আমরা বলি। আমরা এ ধরনের অনেক কথা বলি, যেমন আমরা, যখন একটা কোথাও বসে থাকি বলি যে আমার শিকড় গজিয়ে গেছে। এই যে কিছু কথা আছে, চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ো না— অ্যাবস্ট্রাকশন, আমাদের কথায় কিন্তু আমরা অনেক অ্যাবস্ট্রাকশন ব্যবহার করি। এই যে অ্যাবস্ট্রাকশন, এই যে টুকরো টুকরো স্মৃতি, আমরা কিন্তু এই কথাটা সচরাচর ব্যবহার করি, অসংখ্যবার ব্যবহার করি, এটাই আমি বলছি যে আমি ক্যানভাসে দেখিয়েছি, আমার মনের টুকরো স্মৃতিগুলো কি এবং এই টুকরো খণ্ডগুলো আমি রিলেট করেছি, পুরনো সভ্যতার যে ভাঙা টুকরোগুলো থাকে, যেখানে অনেক কিছু লেখা থাকে কিন্তু আমরা পড়তে পারি না, আমরা সেই লিপির পাঠোদ্ধার করার জন্য, আবিষ্কার করার জন্য তা নিয়ে নিমগ্ন হয়ে পড়ি, সেরকম, এখানে সমস্ত স্মৃতির মধ্যে আমার জীবনের স্টোরি আছে। এবং সেখানে লাইনসগুলো হচ্ছে সেই টেক্সটস। টেক্সট এর একটা অনুভূতি বা টেক্সট এর একটা ইনডিকেশন। হ্যাঁ, কেউ পড়ার চেষ্টা করতে যদি চায়, হয়তো তখন আমি থাকবো না, কিন্তু আমার স্টোরিগুলো থেকে যাবে। এরকম একটা অনুভূতি কাজ করছে এখন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অসাধারণ বলেছেন। বাহ্। আচ্ছা, বিপাশা আপা, বাসায় যখন আপনি কাজ করেন, আপনার সন্তানরা থাকেন, তৌকির ভাই থাকেন, এবং আপনার আশপাশের সমস্ত মানুষেরা থাকেন— অ্যাজ এন ওয়াইফ, অ্যাজ এ মাদার, অ্যাজ এন ওউম্যান আপনি কিভাবে আসলে এই ভূমিকাগুলো আপার শিল্পীস্বত্ত্বার সাথে ম্যাচ করান?
বিপাশা হায়াৎ: এটা আসলে কি বলবো! তৌকির না থাকলে এসব আমার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যেতো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি আসলে জানতে চাচ্ছি আপনার কাজের প্রসেসটা। আপনি কী একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করেন, না কি স্বামী সন্তান সংসার দেখাশোনা, বিভিন্ন রকম জৈবিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করেন?
বিপাশা হায়াৎ: আমার একটা সুবিধা হয়েছে কি, এই কাজগুলো আমার অনেকগুলি লেয়ারে করা। অনেক লেয়ার। সো, একটা কাজ হয়তো আমি একরাতে করে ফেলেছি, আবার স্পেশালি বাচ্চারা যখন ঘুমিয়ে যায়, তখন কাজগুলো করি, বা বাচ্চারা যখন খেলে, একটা বড়সময় ওরা স্কুলে থাকে, সেটাও ভালো সময় কাজ করার। তৌকিরের যেটা হয়, ও তো নিয়মিত অ্যাক্টিং করছে, ও লিখছে, ও ডিরেকশন দিচ্ছে, সো ও খুব বিজি থাকে ওর কাজ নিয়ে। কিন্তু একটা ব্যাপার কি, ওরা যখন বাসায় থাকে তখন আমি কিন্তু ওদেরকে সময় দেবার চেয়ে আমি ওদের কাছ থেকে আমার জীবনীশক্তিটা নিয়ে নিই। আমি ওদের আনন্দ দেই তা না, ওদের কাছ থেকেও কিন্তু আনন্দটা আমার নিতে হয়। এই যে আম আঁকছি, আমাকে জীবনীশক্তিটা কিন্তু নিতে হয় আমার সংসার থেকে। ওদেরকে সময় দেয়া কথাটা তাই আমি বলি না, আমি বলি যে, আমি ওদের কাছ থেকে নেই, আমার প্রাণশক্তিটা। যেখান থেকে হয়তো ওরা যখন থাকে না, সেই নির্যাস দিয়ে আমি কাজ করি। এবং যখন আমি কাজ করি, তখন হয়তো আমার মেয়ে আমার পাশে বসে আঁকতে থাকে। এবং ও-ও কিন্তু আমার মতো করে কাজ করতে থাকে। কিন্তু ওরটা আরো সুন্দর, আরো কালারফুল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ আপা, আপনার জন্য এবং আপনার কন্যার জন্য অজস্র শুভকামনা।
বিপাশা হায়াৎ: আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ, এখন গ্যালারিতে যখন মাত্র ছবি ঝুলছে তখন যে আপনারা খোঁজখবর করে আমাকে সময় দিলেন, এটা আমার জন্য অনুপ্রেরণার। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।