বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শিক্ষা : শিক্ষকের করণীয়


231 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শিক্ষা : শিক্ষকের করণীয়
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২ ফটো গ্যালারি শিক্ষা সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ উম্মে সালমা ॥

শিক্ষা প্রতিটি শিশুর জন্মগত মৌলিক অধিকার। জন্ম পূর্ববর্তীতে মায়ের অসতর্কতার বা জন্ম পরবর্তী কোন কারণে
কঠিন রোগে আμান্ত হয়ে পৃথিবীতে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু হয়ে জন্মে। তাদেরকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু
হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু শব্দটি ব ̈পক অর্থ নির্দেশ করে। এসব শিশুর গড় মান
সাধারণ শিশুদের চেয়ে কখনো কখনো বেশি হয়, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তা কমও হয়ে থাকে।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু বলতে সেই সব শিশুদের বুঝায় সমবয় ̄‹দের তুলনায় যাদের বুদ্ধি সংবেদন, শারীরিক
বৈশিষ্ট ̈, ভাব বিনিময় ক্ষমতা ও সামাজিক দক্ষতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ ̈ মাত্রার কম বা বেশী হয় তাকেই ব ̈তিμমী
শিশু বলে আখ ̈ায়িত করা হয়। এসব শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ শিক্ষা ব ̈ব ̄’ার প্রয়োজন হয়।
যদিও সরকার সবার জন ̈ শিক্ষা বা ̄Íবায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শিক্ষা
বা ̄Íবায়নের জন ̈ বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এজন ̈ প্রাথমিক বিদ ̈ালয় ̧লোতে নানা উদে ̈াগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তাদেরকে সরকারি প্রাথমিক বিদ ̈ালয় ̧লোতে ভর্তি নিশ্চিতকরণ ও পাঠদান করা হচ্ছে, দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন
উপকরণ। যেমন- হুইল চেয়ার, চশমা, μ ̈াচ, হেয়ারিং ডিভাইস। এতে শুধু একটি বড় সংখ ̈ক শিক্ষার্থী শিক্ষাই
পাচ্ছে না বরং সামাজিক বৈষম ̈ হ্রাস পাচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে তাদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, দূর হচ্ছে তাদের
প্রতিবন্ধকতাও। তাদেরকে সঠিক শিক্ষা, যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারাও সাধারণ মানুষের মতো
জীবনযাপন করতে পারবে।
আমরা সাধারণ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু আমরা দেখতে পাই। যেমন- শারীরিক বিশেষ চাহিদা
সম্পন্ন, দৃষ্টিতে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, বাক ও শ্রবণে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, বুদ্ধির বিকাশজনিত বিশেষ চাহিদা
সম্পন্ন, মানসিক ও আবেগিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, ধীর শিখনজনিত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, অটিজম/অটিজম
ে ̄úকট্রাম ডিজঅর্ডারজনিত, সেলিব্রাল-পালসিজনিত, ডাউন-সিনড্রোমজনিত ইত ̈াদি।
গণমাধ ̈মের তথ ̈ অনুয়ায়ী, দেশে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে চারজন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু। এসব শিশু সাধারণ
শিশুদের চেয়ে ব ̈তিμম, একেবারেই পৃথক তাদের শিখন কৌশল। ফলে তাদের চাহিদাটা বোঝা এবং আচরণের
অ ̄^াভাবিকতা ̧লো দূর করে সাধারণ শিশুদের সঙ্গে তাদের ̄^াভাবিক মেলামেশার চেষ্টা করানোটা বিশাল
চ ̈ালেঞ্জের। প্রতিটি শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে এসব শিশুর প্ল ̈াটফর্ম যেন শক্ত হয়, ওদের অধিকার ̧লো যেন ওরা
অর্জন করে নিতে পারে; সাধারণ শিশুদের সঙ্গে যেন তারা মেলামেশা করতে পারে, তাদের সঙ্গে খেলতে পারে,
̄^াভাবিক আচরণ করতে পারে এমন পরিবেশ তৈরি করা। প্রতিটি বিশেষ শিশুকে আলাদাভাবে ̧রুত্ব দিতে হবে।
প্রতে ̈কের প্রতি শিক্ষকদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হয় এবং খুব ধীরে ধীরে তাদের কোনও একটি বিষয় শেখাতে
হবে।
আমরা জানি যে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর কিছু কিছু অনেক দুষ্টু প্রক…তির হয়ে থাকে। তারা শিক্ষণে মনোযোগ
দেয়না। শিক্ষক যখন শেখাতে চান তখন খামখেয়ালী করে। শিখতে আসতে চায়না। ক্লাসরুমে কথা বলে।
অন ̈দের বকা ঝকা করে। গালিও দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বিশেষ শিশুদের মধে ̈ অনেকে আবার আছে যারা ভালো
করে শিক্ষকের কথা শোনে। ঠিক মতো পড়ালেখা করে। ক্লাসরুমে শিক্ষককে সাহায ̈ করে। একজন শিক্ষক তখন
ভালো শিশুটির বার বার দৃষ্টান্ত দিতে পারেন। ভালো শিশুটিকে পুর ̄‹ার দিয়ে দুষ্টু শিশুটিকেও ভালো করা যেতে
পারে। ভালো ব ̈বহার, প্রশংসা, বা পুর ̄‹ার পাবার জন ̈ দুষ্টু শিশুটিও ভালো হয়ে যাবে।
শিশু হচ্ছে ছোট্ট ফুলগাছ, আর শিক্ষক হলো ফুল-বাগানের মালি। ভালোবাসা দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, যতœ দিয়ে ছোট্ট
ফুল গাছে ফুল ফোটাতে পারলেই শিক্ষক জীবন ধন ̈। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সমাজ থেকে আড়াল করে,
শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে সমাজ তথা দেশের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
শিক্ষককে হতে হবে মেধাবী, পেশাজীবী মনোভাবসম্পন্ন, শিক্ষার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। তাকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস
করতে হবে প্রতিটি শিশু সম্ভাবনাময় এবং প্রতিটি শিশুই অনন ̈। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সহায়তাকল্পে
একজন শিক্ষকের কিছু বিশেষ ভূমিকা থাকা আবশ ̈ক। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাদান কাজে নিয়োজিত
একজন শিক্ষকের শ্রেণীকক্ষের ভূমিকা খুবই ̧রুত্বপূর্ণ।
সব সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং শিশুদের তাদের কথা বা তথ ̈টি সম্পূর্ণভাবে বলার সুযোগ দেয়া; এতে তারা উৎসাহ
পাবে ও যোগাযোগ করার প্রেরণা পাবে। এসব শিশুর পারিবারিক বিষয়ে বেশি করে খোঁজখবর নেয়া এতে
অভিভাবকেরা শিক্ষকদের প্রতি আশ্ব ̄Í হন এবং শিশুদের জড়তা অনেকখানি দূরীভূত হয়। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে
পূর্ব-প্র ̄‘তি নিয়ে শ্রেণীকক্ষে যাওয়া এবং আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান করা। শ্রেণীকক্ষে এক জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে
বা বসে না থাকা। শ্রেণীকক্ষের দেয়ালে পাঠ-সংশ্লিষ্ট ছবি, সংকেত বা অন ̈ান ̈ উপকরণ লাগিয়ে রাখা, সম্ভব হলে
সব পাঠ উপ ̄’াপনায় উপকরণ ব ̈বহার করা। শিশুদের দিকে সরাসরি মুখ করে পাঠদান করা, শ্রেণীকক্ষে এমন
̄’ানে দাঁড়ানো যেন শ্রেণীকক্ষের সব শিক্ষার্থীই বাধাহীনভাবে দেখতে পায়।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের প্রথম সারিতে বসানোর ব ̈ব ̄’া করা, প্রয়োজনবোধে এমন ̄’ানে বসানো যাতে
শিক্ষক সহজেই তাদের কাছে যেতে পারেন। সরল-সহজবোধ ̈-সাবলীল ভাষায় পাঠদান করা এবং প্রযোজ ̈ ক্ষেত্রে
যথাসম্ভব কথার পুনরাবৃত্তি করা যাতে দৃষ্টি ও শ্রবণে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর বুঝতে কোন সমস ̈া না হয়।
পাঠের বিষয় ̧লো যথাসম্ভব বোর্ডে লিখে পাঠদানের ব ̈ব ̄’া করা। বোর্ডে লেখার সময় ̄úষ্ট ও বড় করে লেখা;
এতে দৃষ্টি কম তীক্ষèতাসম্পন্ন শিশুদের দেখতে সুবিধা হয়। শিশুদের সব সময় উৎসাহিত করা; অপারগ শিক্ষার্থীদের
কখনো তিরষ্কার না করা। প্রতিবন্ধিতার জন ̈ কাউকে উপহাস না করা; বরং প্রতিবন্ধীদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব
পোষণ করা। অন ̈ সহপাঠীরা যেন তাদের বন্ধু মনে করে সেই জন ̈ সহপাঠীদের মোটিভেশন দেয়া। শুধু পাঠ ̈-
বইয়ের মধে ̈ শিক্ষার্থীদের আবদ্ধ না রেখে পাঠদান কার্যμমের সঙ্গে সঙ্গে সহ-পাঠ ̈μমিক কার্যμমও অধিক হারে
চালিয়ে যাওয়া। শিক্ষার্থীদের কোনভাবেই শারীরিক ও মানসিক শাি ̄Í না দেয়া। শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ
করে দলীয় কাজ প্রদান করা; পাঠদান শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক এবং কর্মভিত্তিক হতে হবে। পাঠদানের সময় যথাসম্ভব
শারীরিক অঙ্গভঙ্গিও ব ̈বহার করতে হবে। চলাচলে সমস ̈াসম্পন্ন শিশু (হুইলচেয়ার, ক্র ̈াচ ব ̈বহারকারী) কোন
শ্রেণীতে থাকলে সে শ্রেণীকে অবশ ̈ই নিচতলায় রাখার ব ̈ব ̄’া করা। শ্রেণীকক্ষের ভেতরে চলাচলের জন ̈ যথাসম্ভব
খালি জায়গা রাখতে হবে। সব সময় ক…তকার্যের জন ̈ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে বেশি বেশি করে বাহবা দিতে
হবে। অক…তকার্যের জন ̈ তিরষ্কার করা যাবে না বরং যথাসম্ভব বিষয়টি শিশুদের বুঝিয়ে দিতে হবে। অভিভাবকদের
সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও পরামর্শ প্রদান। নিয়মিত ও সময়মতো প্রতিবন্ধী শিশুকে বিদ ̈ালয়ে পাঠাতে
অভিভাবকদের উৎসাহিত করা। প্রয়োজনে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে অভিভাবককে অনুরোধ করা।

লেখক :

উম্মে সালমা
সহকারী শিক্ষক
শাঁকদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ ̈ালয়
তালা, সাতক্ষীরা