বিশ্বজুড়ে বৈষম্য কমাতে অঙ্গীকার


301 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বিশ্বজুড়ে বৈষম্য কমাতে অঙ্গীকার
এপ্রিল ৬, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে শেষ হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১৩৬তম সম্মেলন। বৈষম্য কমাতে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা, পার্লামেন্টকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করা, সবার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা, সামাজিক সংলাপ জোরদার ও মানবসম্পদ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে সম্মেলনে।

সম্মেলনের শেষ দিন গতকাল বুধবার আইপিইউর সাধারণ অধিবেশনে পাঁচ দফা ‘ঢাকা ঘোষণা’ সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈষম্য কমাতে মানবাধিকার সুরক্ষায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী এবং বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান হিসেবে পার্লামেন্টকে শক্তিশালী করতে হবে। সব জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্ব আহরণের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ঘোষণায়। এ ছাড়া শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী সম্পদের বৈষম্য বেড়ে যাওয়ায় আইপিইউ খুবই

উদ্বিগ্ন। বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম বেকারত্ব, সম্পদহীনতা এবং স্বল্প মজুরিসহ নানা সমস্যার কারণে ভুগছে। বৈষম্য কমাতে আইপিইউ সদস্য দেশগুলোর উদ্যোগ আশা করা হচ্ছে। ঘোষণায় নারী শ্রমিকের মজুরিবৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেবা, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে অল্প কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ কমে আসায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই সংসদীয় ফোরাম উদ্বেগ জানিয়েছে।

গত শনিবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে এই প্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এত বড় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এতে ১৩২টি দেশের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য, ‘রিড্রেসিং ইনইকুয়ালিটিজ :ডেলিভারিং অন ডিগনিটি অ্যান্ড ওয়েল বিং ফর অল’। এই প্রতিপাদ্যের ওপর রোববার মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ভারতের নোবেল বিজয়ী কৈলাস সত্যার্থী।

সম্মেলনে এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিভক্তি দেখা দেয়। গতকাল শেষ দিনেও প্রস্তাব গ্রহণের পর পর্তুগালের পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা করে বলা হয়, একটি দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আরেক দেশের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকতে হবে। এ ছাড়াও ইয়েমেন, আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সম্মেলনের শেষ দিনে ৮টি এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সম্মেলনের সমাপনী ভাষণে আইপিইউর প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে জঙ্গি হামলা সত্ত্বেও আমরা এখানে একত্র হয়েছি। আমরা এ সম্মেলন সফলভাবে শেষ করে ভয়কে জয় করেছি। আগামীতেও এ ধরনের যেকোনো ঝুঁকি মোকাবেলায় আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব। সন্ত্রাসবাদের অশুভ তৎপরতায় আমরা ভয় পেয়ে বসে থাকব না। চলতি বছরের অক্টোবরে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আইপিইউর ১৩৭তম সম্মেলন হবে। সেখানেও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে আমরা বসে না থেকে সেখানে যাব। সম্মেলনে ভাষণে ভারতের প্রতিনিধি আর কে সিং বলেন, এবারের আইপিইউ সম্মেলন তার দেখা সবচেয়ে সফল সম্মেলন।

সংবাদ সম্মেলন :আইপিইউর সাধারণ অধিবেশন শেষে প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সম্মেলনে যে প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন তারা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে ঢাকা ঘোষণা বাস্তবায়নে নিজেদের পার্লামেন্টকে উদ্যোগী করবেন। সফলভাবে ১৩৬তম সম্মেলন শেষ করতে পারা বড় অর্জন। জাতি হিসেবে এটা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্ব গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি। তিনি বলেন, সম্মেলনে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হলে আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। আইপিইউর সেক্রেটারি জেনারেল মার্টিন চুংগং বলেন, এ সম্মেলনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য কমে আসবে।

অন্য দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধে প্রস্তাব গৃহীত :স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধসহ বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণ করেছে আইপিইউ। মঙ্গলবার আইপিইউর শান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটিতে খসড়া প্রস্তাব পাস হওয়ার পর গতকাল বুধবার সাধারণ অধিবেশনে এটি গৃহীত হয়। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

মঙ্গলবার গৃহীত ১৮ দফা এ প্রস্তাবের মূল আলোচনায় ছিল_ একটি দেশের ওপর অন্য দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধের বিষয়টি। বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলে অঙ্গীকার করে প্রস্তাবের পক্ষের দেশগুলো। বিশেষ কোনো কারণে প্রয়োজন হলে জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী তা করার ব্যাপারে মত দেন তারা। গত দুই দিন বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যরা এ খসড়া প্রস্তাবের ওপর মতামত তুলে ধরেন। অনেক দেশের প্রতিনিধিই অন্য দেশের দোষারোপ করেন।

বুধবার সাধারণ অধিবেশনে পর্তুগালের প্রতিনিধি ১২টি দেশের অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারছি না। মানবাধিকার একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ করা উচিত। জবাবে সেক্রেটারি জেনারেল চুংগং বলেন, ‘এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়ে গেছে। ১২ দেশের কথা বলা হলেও তাদের অনেকেই এর বিরুদ্ধে নয়। কিছু সমস্যা থাকলেও আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ফিনল্যান্ড ও জার্মানির প্রতিনিধির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা সবাই সব এজেন্ডার সঙ্গে একমত।’

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগের কারণে তা বাতিল করা হয়। তাই এবারের আইপিইউ সম্মেলন আয়োজন ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পল্লী উন্নয়ন একাডেমি পরিদর্শনে আইপিইউ প্রতিনিধিরা :কুমিল্লা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি পরিদর্শন করেছেন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের ১০৪ দেশের প্রতিনিধিরা। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. আবদুর রব হাওলাদারের নেতৃত্বে তারা বার্ডে আসেন। বার্ড কর্তৃপক্ষ তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে। অতিথিরা বার্ড লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন এবং মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিকেলের দিকে ঢাকার উদ্দেশে বার্ড ছেড়ে যান। বার্ডের মহাপরিচালক মুহম্মদ মউদুদউর রশীদ সফদার জানান, দেশে পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রমের নানা দিক সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়েছে।