বিসিএস উত্তীর্ণ ৮ হাজার চিকিৎসকের কী হবে


77 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বিসিএস উত্তীর্ণ ৮ হাজার চিকিৎসকের কী হবে
নভেম্বর ৭, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ঘোষণা দিলেও সৃষ্টি হয়নি পদ

অনলাইন ডেস্ক ::

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ চিকিৎসকের বিপরীতে পদায়ন করা হয়েছে মাত্র ছয়জনকে। তাদের মধ্যে ডা. কামরুন নাহার মিলি গত ৫ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে যোগদান করে দু’দিন পরই মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে চলে যান। অন্য পাঁচজনের মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা ডা. চিন্ময় হালদার, আবাসিক চিকিৎসক ডা. জুনায়েদ হোসেন লেলিন, মেডিকেল অফিসার আশরাফুল ইসলাম, ডা. মো. কামরুজ্জামান ও ডা. রেফায়েত হোসেন। মেডিসিন, গাইনি, সার্জারিসহ বিশেষজ্ঞ কোনো পদেই চিকিৎসক নেই। যে পাঁচ চিকিৎসক আছেন, তারাও দায়িত্ব পালন করেন পালা বদল করে। প্রতিদিন গড়ে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে তিন শতাধিক রোগী চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ভিড় করেন। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় বেশিরভাগ রোগীকেই চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যেতে হয়। এতে করে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা ডা. চিন্ময় হালদার বলেন, যতসংখ্যক চিকিৎসকের পদ এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছে, তার এক-চতুর্থাংশ চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসাসেবা চলছে। অন্যান্য জনবলের চিত্রও প্রায় সমান। এই অপ্রতুল জনবল নিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা খুবই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও চেষ্টা করছি। যে পাঁচ চিকিৎসক আছেন, তারা সব বিভাগেই রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন। তবে রোগী জটিল হলে জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। সব বিভাগে চিকিৎসক থাকলে হয়তো এভাবে রেফার করার প্রয়োজন হতো না বলে মনে করেন তিনি।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মতো সারাদেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোরও চিত্র প্রায় অভিন্ন। সারাদেশে ১০ হাজারের ওপরে চিকিৎসকের পদ শূন্য পড়ে আছে। চিকিৎসক সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। অথচ বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চাকরি হচ্ছে না আট হাজার ৩৬০ চিকিৎসকের। নিয়োগের দাবিতে শুরুতে তারা মানববন্ধন, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও তা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েও পদ সৃষ্টিতে উদ্যোগী না হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এ সমস্যার। সমকালের সঙ্গে অন্তত ২০ চিকিৎসকের কথা হয়েছে। ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে তারা বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা ভর করেছে। তাদের বাইরে আরও প্রায় ৫০ হাজার চিকিৎসক এমবিবিএস ও বিডিএস পাস করেও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। কেউ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে, আবার কেউ চাকরি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থায় কেবল প্রধানমন্ত্রী চাইলেই সব বাধা দূর করে সরকারি চাকরিতে এই উত্তীর্ণ চিকিৎসকদের নিয়োগ দিতে পারেন বলে মনে করেন তারা। তাই এ বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা ডা. রাফা বিনতে নূর বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত। তিনি সমকালকে বলেন, ছোটবেলা থেকে অনেকের মতো তারও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। তীব্র ভর্তি পরীক্ষা শেষে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষে বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি হচ্ছে না। হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজতে হচ্ছে। অনেকের বেসরকারি হাসপাতালেও কাজ করার সুযোগ মিলছে না। হাজার হাজার চিকিৎসক বেকার হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার আকর্ষণ নষ্ট হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

দুই বছরেরও বেশি সময় আগে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত ছিল, বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এর পরও কেন চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া যায়নি- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতার কারণেই বিশেষ বিসিএসের ঘোষণা অনুযায়ী চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি পাচ্ছেন না চিকিৎসকরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, একসঙ্গে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ হলে মাঠপর্যায়ে যে চিকিৎসক সংকট আছে, তা কাটানো সম্ভব হতো। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তো আমরা সেটাই চাই। পিএসসি থেকে চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, এন্ট্রি লেভেলে শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। সুতরাং যতসংখ্যক শূন্য পদ আছে, কেবল সেগুলোতেই নিয়োগ হবে। সর্বশেষ অন্তত দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগের অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা রাজি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রস্তাব করা এবং তা অনুমোদন করার পরও দুই বছরে কেন পদ সৃষ্টি করা হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, তখন দুই স্তরে পাঁচ হাজার করে নতুন পদ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও সেই অনুযায়ী ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিভিন্ন বক্তৃতায়ও তিনি সেটি উল্লেখ করেছিলেন।

গাফিলতির চিত্র :স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশে চিকিৎসক সংকট নিরসনে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরের ৫ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন সচিব সিরাজুল হক খান বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ হাজার ৫০০ সহকারী সার্জন ও মেডিকেল অফিসার এবং ৫০০ সহকারী ডেন্টাল সার্জন নিয়োগের একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান। ওই মাসের ২১ তারিখ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এর পরই মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্নিষ্টরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ৩৯তম বিসিএসের মাধ্যমে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের ঘোষণা দিতে থাকেন। গণমাধ্যমেও তাদের সেই বক্তব্য প্রকাশ হয়। বেকার চিকিৎসকদের মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পিএসসি থেকে ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং ওই বছরের ৩ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় ৪০ হাজার চিকিৎসক অংশগ্রহণ করেন। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফলে উত্তীর্ণ ১৩ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। এর পরই ধরা পড়ে আসল ঘটনা। পিএসসি দেখতে পায়, ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত থাকলেও শূন্য পদ আছে মাত্র চার হাজার ৭৯২টি। মন্ত্রী, সচিব সভা-সমাবেশে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের ঘোষণা দিলেও সেই অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এরপর পিএসসি গত বছরের ১০ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নির্ধারিত শূন্য পদের বাইরে আরও দুই হাজার ২৫০ চিকিৎসককে নিয়োগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। সাত দিন সময় দিয়ে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে চিঠির জবাব পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়।

এর পরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ বিসিএস থেকে আরও দুই হাজার চিকিৎসকসহ মোট ছয় হাজার ৫৪২ চিকিৎসক নিয়োগ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। ততক্ষণে সময় শেষ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই সুপারিশ আমলে নেয়নি। এ কারণে সরকারি সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর পিএসসি মৌখিক পরীক্ষা শেষে চার হাজার ৭৯২ জনকে স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করে। বাকি আট হাজার ৩৬০ চিকিৎসককে নন-ক্যাডার হিসেবে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পদ না থাকায় আট হাজার ৩৬০ চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে পিএসসি থেকে তাদের জানানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ বলেন, শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের জন্য পিএসসিতে সুপারিশ করা হয়। ৩৯তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন ও ডেন্টাল সার্জনের যতগুলো পদ শূন্য ছিল, সেগুলোতে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। সুতরাং পদ শূন্য না থাকলে তো নিয়োগের সুপারিশ করা যায় না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নন-ক্যাডার পদে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বছরে পাঁচ থেকে ছয়টি করে পদ শূন্য হয়। এ বিষয়ে সাড়ে আট হাজার নন-ক্যাডার চিকিৎসককে নিয়োগ পেতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক সমকালকে বলেন, উত্তীর্ণ হওয়া চিকিৎসকদের নিয়ে কমিশনে আলোচনা হয়েছে। তাদের প্রতি কমিশনের সবার মনোভাব অত্যন্ত ইতিবাচক। নন-ক্যাডার চিকিৎসকের শূন্য পদের চাহিদা পেলেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। কিছু মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে নন-ক্যাডার চিকিৎসক পদ আছে। এসবের মধ্য থেকে শূন্য পদের চাহিদা পাওয়া গেলে চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে একসঙ্গে তো আর সবাইকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। যে কয়টি পদ শূন্য হবে, সেগুলোর বিপরীতেই তাদের নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ আছে।

বিশেষ বিসিএসে নন-ক্যাডার করার কোনো সুযোগ আছে কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, আইনে প্রত্যেকটিকে বিসিএস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ কিংবা বিশেষ বিসিএস বলে সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু বলা হয়নি। ৩৯তম বিসিএস ছিল শুধু স্বাস্থ্য ক্যাডারের জন্য। এখানে অন্য কোনো ক্যাডার নেওয়া হয়নি। সুতরাং চিকিৎসকদের নন-ক্যাডার শূন্য পদের বিপরীতে তাদের কেবল নিয়োগ দেওয়া যাবে। অন্য কোনো পদে তাদের নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। এই কার্যক্রমে কিছুটা জটিলতা আছে। তাই তাদের নিয়োগে বিলম্ব হচ্ছে।