বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রথম রায় কার্যকর


330 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রথম রায় কার্যকর
নভেম্বর ২২, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডেস্ক :
ঢাকা: একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর। চারদিকে যুদ্ধের দামামা চললেও বীর বাঙালি যে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে, সেটা নিশ্চিত হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্মের বারতা আসছে চারদিক থেকে।

বিজয়ের মাত্র ১২ দিন আগে ওই দিন ঢাকার চকবাজারে ‘আলবদর’ লেখা ব্যানারে একটি গাড়ি নিয়ে জনসমক্ষে বক্তৃতা করেন আলবদর বাহিনীর প্রধান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ এই প্রতিবেদন পরদিন ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

তার এ হুমকিই স্বাধীনতার উষালগ্নে ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেক বুদ্ধিজীবীকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যার প্রেক্ষাপট রচনা করে। সব বুদ্ধিজীবীকে একই কায়দায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একসঙ্গে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি, আলবদর বাহিনীর প্রধান এবং রাজাকার বাহিনীর অন্যতম স্থপতি মুজাহিদকে তাই বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং মূল নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

দেশের এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া চূড়ান্ত রায়ের আলোকে শনিবার (২১ নভেম্বর) দিনগত রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়েছে।

এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ একই অপরাধের দায়ে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। বিচারিক আদালতের সেই রায় বহাল রাখেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। দুই আদালতের রায়েই বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় আনা হয় ৬ নম্বর অভিযোগে। প্রমাণিত ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পরবর্তীতে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারাও ওই স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধজনক নানা কার্যক্রম চালায়। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ওই আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।

মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ক্যাম্পটিই পরে আলবদর বাহিনীর সদর দফতর ও মূল নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত হয়।

ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর সুপিরিয়র নেতা হিসেবে আর্মি ক্যাম্পে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন মুজাহিদ। এ ধরনের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই আলী আহসান মোহামদ মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযান পরিচালনা করেন বলে প্রমাণিত হয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হয় ট্রাইব্যুনাল ও সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়েও।

এ অভিযোগে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিতে (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব) থাকা নেতা হিসেবে গণহত্যা সংঘটিত করা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা, হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন ইত্যাদির ঘটনার দায়ও প্রমাণিত হয়েছে মুজাহিদের বিরুদ্ধে।

রায়ের বিভিন্ন অংশেও উল্লেখ রয়েছে, মুজাহিদের নেতৃত্বাধীন আলবদর বাহিনী বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে এ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের। আর শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকা এবং শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে মুজাহিদকে দায়ী করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত এ অভিযোগগুলো আনা হয়েছিল মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ১, ৫ ও ৬ নম্বর অভিযোগে। অর্থাৎ এ আসামির বিরুদ্ধে আনা ও প্রমাণিত হওয়া বেশিরভাগ অভিযোগই বুদ্ধিজীবী হত্যা সংশ্লিষ্ট।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে ১ নম্বর অভিযোগকে ৬ নম্বর অভিযোগের সঙ্গে সমন্বিত করে দু’টি অভিযোগের একসঙ্গে রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। এ দু’টি অভিযোগে একসঙ্গে ফাঁসি এবং ৫ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত হন এই আসামি।

তবে ১ নম্বর অভিযোগে শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে হত্যার দায়ে থেকে আপিল মামলার রায়ে খালাস পেয়েছেন মুজাহিদ। আর শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধাকে হত্যার দায়ে ৫ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশও বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

রায়ে বলা হয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মুজাহিদের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩-এর ৩ (২) (এ) (জি) এবং ৪ (১), ৪ (২) ধারায় বর্ণিত অপরাধ করেছেন মুজাহিদ। ওই আইনের ২০ ধারায়ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটন করেছেন তিনি।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রথম চূড়ান্ত রায়
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায়ে যে চারজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল, তার মধ্যে মুজাহিদের মামলারই চূড়ান্ত রায় এলো প্রথমে।

এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীকে। একাত্তরের আলবদর বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার ও সমগ্র পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি নিজামীর বিরুদ্ধেও যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তার মধ্যেও বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল। নিজামীও আপিল বিভাগে রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন। এ আপিল মামলাটির শুনানি শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।

অন্যদিকে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যাসহ ৪ ধরনের মোট ১১টি অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনাল-২ মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অপারেশন ইনচার্জ আশরাফুজ্জামান খান ও চিফ এক্সিকিউটর (জল্লাদ) চৌধুরী মাঈনুদ্দীনকে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পলাতক এ দুই ঘাতক আপিল করেননি।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় চূড়ান্ত রায় ও ফাঁসি কার্যকরের প্রথম উদাহরণ এটি। তিনি বলেন, আলবদর নেতাদের পরিকল্পনা ও নীলনকশায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের ফলেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মাহবুবে আলম বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত আর তা বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ।

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, নিজামীও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত। একই অপরাধে মুজাহিদের ফাঁসি বহাল থাকায় এ রায় নিজামীর আপিল মামলার রায়েও প্রতিফলিত হবে বলে আশা করছি।

যেভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা বাস্তবায়ন
১৯৭১ সালের জুলাই মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার শাখার সভাপতি হিসেবে, এরপর জুলাই মাসের ১ম সপ্তাহের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তান (অবরুদ্ধ বাংলাদেশ) শাখার সেক্রেটারি হিসেবে এবং পরবর্তীতে এই সংগঠনের প্রাদেশিক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনীর ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রধান ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী এবং অক্টোবর থেকে সে বাহিনীর প্রধান হন মুজাহিদ।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ তিন মাস আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। কিলিং স্কোয়াড এ বাহিনীর মূল দায়িত্ব পেয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের অপকর্ম শুরু করেন মুজাহিদ। এদিকে সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজিত হতে শুরু করলে তিনি তার কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন করেন। তিনি মুক্তিকামী সাধারণ বাংলাদেশী জনগণের পরিবর্তে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের হত্যা শুরু করেন। তিনি এবং তার দল ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য সরবরাহকারীর ভূমিকা পালন করেন। তালিকাভূক্ত বুদ্ধিজীবীদের হত্যার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেরাওকাজে মুজাহিদ ছিলেন অন্যতম নেতা।

বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশ যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে- সেজন্যই এ দেশকে মেধাশূন্য করার জন্য বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করেন মুজাহিদসহ হাইকমান্ড। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরাসরি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যরা হাইকমান্ডের নির্দেশে আলবদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে।

আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ করা হয় চৌধুরী মাঈনুদ্দিনকে এবং চিফ এক্সিকিউটর (জল্লাদ) নির্বাচিত হন মো. আশরাফুজ্জামান খান। তারা উভয়েই ছাত্রজীবন থেকে ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় সদস্য হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে হাইকমান্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন।

পরিকল্পনা অনুসারে ইপিআরটিসি’র কয়েকটি কাদামাখা মিনিবাস সরবরাহ করা হয় ঘাতকদের। সেসব মিনিবাসে করে চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও মো. আশরাফুজ্জামান খানের নেতৃত্বে ৮/১০ জনের অস্ত্রধারী আলবদর ভাগ ভাগ হয়ে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে নিয়ে যায় ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের আলবদর হেডকোয়ার্টারে। সেখানে নিজামী-মুজাহিদসহ আলবদর হাইকমান্ডের অন্যদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সেখানে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিসহ অজ্ঞাত স্থানে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজনের মরদেহ মৃতদেহ উদ্ধার করা হলেও বাকিরা আজও নিখোঁজ।

শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন হত্যা
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনের ছেলে সাংবাদিক শাহীন রেজা নূর। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূর রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্যে বলেন,  আলবদর কমান্ডার হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের পরিচালনা, তত্ত্বাবধান ও নির্দেশে চলে বুদ্ধিজীবী নিধনকার্য। আমি এ অপরাধের বিচার চাই। আমি আমার পিতার ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।
শাহীন রেজা নূর তার সাক্ষ্যে আরও বলেন, আলবদররা তার বাবাকে হত্যা করে। যেহেতু একাত্তরে মুজাহিদ আলবদরের কমান্ডার ছিলেন, সেহেতু বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন এবং সেই সূত্রেই শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে হত্যা করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত অভিযোগ ও রায়ে বলা হয়েছে, ওই সময় শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ছিলেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিজ পত্রিকায় ভাষ্যকার পরিচয়ে ‘ঠগ বাছিতে গা উজাড়’ শিরোনামে এক প্রবন্ধ লিখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এ দেশীয় এজেন্টদের বাংলাদেশের নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন।

ওই প্রবন্ধ প্রকাশের পর জামায়াতের দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে ‘অতএব ঠক বাছিও না’ শিরোনামে পাল্টা প্রবন্ধ ছাপা হয়। ওই প্রবন্ধে সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে সমালোচনা করা হয়। ওই প্রবন্ধে সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে সমালোচনা করা হয়। পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ এবং ‘ভারতীয় সেনাদের অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে পত্রিকায় লেখার জন্য নির্দেশ ছিল। যেহেতু তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই তিনি সব সময় ‘দুষ্কৃতকারী’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ দুটি সিঙ্গেল ইনভারটেড কমার ভেতরে লিখতেন। এ কারণে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও আলবদর বাহিনীর টার্গেটে ছিলেন।

অভিযোগ অনুসারে, ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৩টার সময় সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনের ৫ নম্বর চামেলীবাগের ভাড়া করা বাসায় মুজাহিদের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিচালনাধীন ৭/৮ জন রাইফেলধারী যুবক ঢুকে পড়ে। তাকে তারা নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তিনি তার নাম সিরাজ উদ্দিন বললে অস্ত্রধারী আলবদররা তাকে ধরে একটি মিনিবাসে অপহরণ করে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি মরদেহেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

১ নম্বরে বর্ণিত এ অভিযোগটিতে মুজাহিদকে ৬ নম্বর অভিযোগের সঙ্গে সমন্বিত করে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ অভিযোগেও মুজাহিদের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির দায় প্রমাণিত হয়েছিলো ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

তবে আপিল বিভাগ থেকে এ অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন মুজাহিদ।

সুরকার আলতাফ মাহমুদ হত্যা
আরেক শহীদ বুদ্ধিজীবী সুরকার আলতাফ মাহমুদকে হত্যা করা হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কয়েকজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে।

ট্রাইব্যুনাল ও আপিল মামলার রায়ে প্রমাণিত এ অভিযোগটি আনা হয়েছিল মুজাহিদের বিরুদ্ধে ৫ নম্বর অভিযোগে। মুজাহিদ যে সেপ্টেম্বর থেকেই শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার হোতা সেটাই প্রমাণ করেছে এ ঘটনা।

অভিযোগ অনুসারে, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সে সময়কার সেক্রেটারি আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ এবং গেরিলা যোদ্ধা জহির উদ্দিন জালাল (বিচ্ছু জালাল), বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালিগালাজ করেন এবং পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন যে, প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। আসামি মুজাহিদ অন্যদের সহায়তায় আটকদের একজনকে ছাড়া অন্যান্য নিরীহ-নিরস্ত্র বন্দিদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ গুমের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।

ট্রাইব্যুনাল এ অভিযোগেও মুজাহিদকে দোষী সাব্যস্ত করে একক শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন মুজাহিদকে। ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে বলেন, হত্যা ঘটনার সময় আসামি উপস্থিত না থাকলেও তার নির্দেশেই নিরস্ত্র-নিরীহ ওই কয়েকজনকে হত্যা করা ঘটেছে বলে প্রমাণ করতে পেরেছেন ট্রাইব্যুনাল। এটিও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির আরেকটি দায়- রায়ে সেটি প্রমাণিত হয়েছে। আর এ সাজা বহাল রাখেন আপিল বিভাগও।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী হত্যা
প্রমাণিত ৬ নম্বর অভিযোগ অনুসারে, ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ক্যাম্প করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধজনক নানা কার্যক্রম চালায়। এ ক্যাম্পটি ছিল আলবদর বাহিনীর হেডকোয়ার্টার।

এ ক্যাম্প থেকেই পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পরামর্শ করে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে পরিচালিত বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযান চালান। এখান থেকেই সারা বাংলাদেশে হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন ইত্যাদিসহ যাবতীয় মানবতবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা সংঘটিত ও পরিচালিত করেন মুজাহিদ।

একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত অপহরণ করা হয় এদেশের সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের। বিজয়ের পরে ১৭-১৮ ডিসেম্বর তাদের কয়েকজনের ক্ষত-বিক্ষত, গলিত-অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হলেও বাকিরা আজও নিখোঁজ। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ জন শিক্ষক, ছয় জন সাংবাদিক ও দুই জন চিকিৎসকসহ ১৮ জন শহীদ বুদ্ধিজীবী অপহরণ, নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুক্তিযুদ্ধের শেষ সপ্তাহে।

মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে আলবদর হেডকোয়ার্টারে বুদ্ধিজীবীদের নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে মুজাহিদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদানের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

এদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন ১৬ ডিসেম্বরও আত্মসমর্পণ করতে চাননি মুজাহিদ। আলবদর বাহিনীকে আত্মসমর্পণ না করে ‘জিহাদ’ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দানসহ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে অস্ত্রও চান মুজাহিদ।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সে সময়ও তার আলবদর বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণ না করার সিদ্ধান্ত নেন মুজাহিদ। তিনি আলবদর বাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণ না করে ‘জিহাদ’ চালিযে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ঢাকার আলবদর বাহিনীর হেডকোয়ার্টার থেকে তিনি এ নির্দেশ দেন।

এমনকি সেদিন মুজাহিদসহ আলবদর বাহিনীর শীর্ষ ৩ নেতা পাকিস্তানি বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে অস্ত্র দিয়ে সহায়তার আবেদন জানান। সেদিন মুজাহিদ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, আপনারা যেসব অস্ত্রসহ ভারতীয় আগ্রাসনকারীদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, সেগুলো আমাদের দিন।

যে ৩ আলবদর সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে অস্ত্র চেয়েছিলেন, তাদেরই একজন আশরাফুজ্জামান খানের (বুদ্ধিজীবীদের প্রধান খুনি) লেখা ‘সানসেট অ্যাট মিডডে’ বইয়ে এ তথ্য দেওয়া রয়েছে।

এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারী তথা মূল নায়ক ছিলেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।

সূত্র বাংলা নিউজ