বেতন বাড়ল দ্বিগুণ


1428 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বেতন বাড়ল দ্বিগুণ
সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ সচিবালয়সহ সারাদেশে সরকারি অফিস-আদালতে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নতুন স্কেলে মূল বেতন সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন আট হাজার ২৫০ টাকা। সর্বোচ্চ গ্রেডে বর্তমানের চেয়ে ৯৫ শতাংশ ও সর্বনিম্ন গ্রেডে শতভাগের বেশি মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো গত জুলাই থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন শুধু বেতন বাড়বে। ভাতা বাড়বে আগামী বছরের জুলাই থেকে।

গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে নতুন পে স্কেলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সর্বশেষ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা বাড়ানো হয় ২০০৯ সালে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও সরকারি চাকরিজীবীদের মতো গত ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন পাবেন। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের গ্রেড-১ অনুযায়ী বেতন দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তাদের বিষয়টি ফয়সালা করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির সুপারিশের আলোকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছেন।

নতুন পে স্কেল মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ায় উৎফুল্ল সরকারি চাকরিজীবীরা। তবে তাদের একটি পক্ষ থেকে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড রাখার যে দাবি ছিল, তা পূরণ করা হয়নি। অবশ্য এর পরিবর্তে বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে। এখন থেকে বৈশাখে নববর্ষের বোনাসও পাবেন তারা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে বিভাজনের বিতর্কিত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছে। তারা তাদের গ্রেড অনুযায়ী পরিচিত হবেন। নতুন পে স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেতন কাঠামো অনুমোদন করার পর অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, নতুন করে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা প্রেস ব্রিফিং করেন। এ সময় শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান ও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আলী খান উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, আগামী এক মাসের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করার মাধ্যমে পে স্কেল কার্যকর হবে। যে মাসে নতুন স্কেলে বেতন পাবেন, সে মাসেই জুলাই থেকে কয়েক মাসের বর্ধিত বেতন (এরিয়ার) পাবেন তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল হওয়ায় ক্ষতির চেয়ে লাভবান বেশি হবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। নতুন স্কেল অনুযায়ী, ‘বর্ধিত বেতন’ হাতে পেতে নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবী প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে ৮০ ভাগই কর্মচারী। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত জনবল ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পান। তারা সবাই নতুন পে স্কেলের সুবিধা পাবেন। এখন সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের সঙ্গে ২০ শতাংশ হারে ‘মহার্ঘভাতা’ পাচ্ছেন। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন দেওয়া শুরু হলে এ ভাতা থাকবে না।

২০০৯ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীরা সর্বনিম্ন চার হাজার ১০০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা হিসেবে বেতন পেয়ে আসছিলেন। এর সঙ্গে তারা পাচ্ছেন মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে মহার্ঘভাতা, যা ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়।

নতুন পে স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতনের পাশাপাশি বাংলা নববর্ষে বাড়তি একটি বোনাস দেওয়া হবে। প্রতিবছর বৈশাখ উপলক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই ভাতা পাবেন। এর পরিমাণ হবে তাদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশেষ ভাতা পাবেন নির্ধারিত পরিমাণ, যা এখন বিভিন্ন হারে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা সর্বজনীন একটি ভাতা পাবেন। এটি হলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও উজ্জীবিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও জানান, যেসব বিজ্ঞানী নতুন নতুন গবেষণা করে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, বর্ধিত বেতনের পাশাপাশি সরকার তাদের প্রণোদনা দেবে। নতুন পে স্কেলে অবসরভোগীদের পেনশন সুবিধা বর্তমানের চেয়ে ১০ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। ২০০৯ সালের বেতন স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধা ছিল মূল বেতনের ৮০ শতাংশ। নতুন স্কেলে তা হবে ৯০ শতাংশ।

অধ্যাপকদের মর্যাদা প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, তাদের প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সম্মানিত ব্যক্তি। দেশ ও জাতি গঠনে তাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা আরও বলেন, এমন কিছু করা হবে না, যাতে তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। দুই ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, আগের বেতন কাঠামোও একই প্রক্রিয়ায় কার্যকর করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া সরকারের আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট :নতুন পে স্কেলে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ‘ইনক্রিমেন্ট’ মূল বেতনের সঙ্গে দেওয়া হবে। এই ইনক্রিমেন্ট হবে চক্রবৃদ্ধি হারে এবং এটি দেওয়া হবে প্রতিবছর জুলাই মাসে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বর্তমান নিয়ম বৈষম্যমূলক। সরকারি চাকরিতে এটি কেউ পায়, কেউ পায় না। সে জন্য বর্তমান সরকার এই প্রথা বিলুপ্ত করেছে। তিনি বলেন, ইনক্রিমেন্টের সুবিধা টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের চেয়ে বেশি। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী, ইনক্রিমেন্ট পেলে সরকারি কর্মচারীরা বর্তমানের চেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা পাবেন। উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারীদের প্রধানতম দাবি ছিল, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নতুন পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করা।

তিন বাহিনীর প্রধানদের বেতন একই স্কেলে :বর্তমানে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের মধ্যে পদমর্যাদার দিক থেকে সেনাবাহিনীর প্রধান সবার ওপরে। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী তিন বাহিনীর প্রধানগণ একই স্কেলে বেতন-ভাতা পাবেন। তাদের মূল বেতন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতনের সমান হবে। নতুন স্কেলে মন্ত্রিপরিষদ ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন যথাক্রমে ৮৬ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। এ ছাড়া সিনিয়র সচিবের মূল বেতন ৮২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মূল বেতনও নির্ধারণ করা হয়েছে ৮২ হাজার টাকা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানের পদমর্যাদা উন্নীত করা হবে। এ জন্য বিদ্যমান বিধি সংশোধন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের নতুন বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীতে সেনাসদস্য (সিপাহি) হিসেবে যারা নতুন নিয়োগ পাবেন, তাদের ক্ষেত্রে ১৭তম গ্রেড প্রযোজ্য হবে।

শ্রেণী বিভাজন বিলুপ্ত: সরকারি চাকরিতে এখন থেকে আর কোনো শ্রেণী বিভাজন থাকছে না। এর পরিবর্তে গ্রেড অনুযায়ী পরিচিতি পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এতদিন নবম গ্রেড থেকে ওপরের ধাপের কর্মকর্তারা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচিত হতেন। বিসিএস উত্তীর্ণ ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা চাকরিজীবনে প্রবেশ করতেন নবম গ্রেডে। এ ছাড়া পিএসসি ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের নবম গ্রেড প্রদান করা হতো।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় শ্রেণী হিসেবে বিবেচিত হতেন দশম থেকে দ্বাদশ গ্রেডের কর্মকর্তারা। তৃতীয় শ্রেণী ১৩ থেকে ১৮ এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের গ্রেড ছিল ১৯ ও ২০। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী এখন থেকে নিয়োগ এবং পদোন্নতি সবকিছুই হবে গ্রেড অনুযায়ী। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি চাকরিতে বিভাজনের যে বিধি আছে, তা সংশোধন করা হবে। তার পরই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে।

সরকারের ব্যয় যতটুকু বাড়ছে: অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মূল বেতন কার্যকর করতে এ খাতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে ১৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, আগামী অর্থবছরে ভাতাসহ পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো কার্যকর করতে ব্যয় হবে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। এখন সরকারি চাকরিজীবীদের পেছনে বেতন-ভাতা বাবদ বছরে যে পরিমাণ খরচ হয়, তা মোট দেশজ উৎপাদনের আড়াই শতাংশ। নতুন স্কেল বাস্তবায়ন করার ফলে এই ব্যয় বেড়ে জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। বাড়তি সম্পদ জোগান প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ আগের চেয়ে বেড়েছে। কাজেই অর্থের কোনো সমস্যা হবে না।

নতুন স্কেলের পটভূমি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত পে কমিশনের চেয়ারম্যান টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের প্রচলিত প্রথা বাদ দিয়ে ধাপ কমিয়ে ১৬ গ্রেডে বেতন স্কেল নির্ধারণের সুপারিশ করে। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর কমিশনের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়। এর পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নেতৃত্বে গঠিত সচিব কমিটি পে কমিশনের মতো টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের সুপারিশ করলেও বর্তমানের মতো ২০টি গ্রেডে বেতন দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ করে।