বৈষম্যের শিকার সাতক্ষীরা উপকূলীয় জনপদের নারীরা


129 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
বৈষম্যের শিকার সাতক্ষীরা উপকূলীয় জনপদের নারীরা
মার্চ ৭, ২০২০ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

সামিউল মনির, শ্যামনগর :
“সব জায়গায় সব ক্ষেত্রে আমরা বঞ্চিত। সমানতালে কাজ করেও পুরুষদের অর্ধ্বেক মজুরী পাচ্ছি। আবার বেলা একটা পর্যন্ত কাজ করার নিয়ম থাকলেও প্রায়ই আধা কিংবা এক ঘন্টা পর্যন্ত বেশী কাজ করিয়ে নেয় মালিকরা”। অভিযোগের সুরে কথাগুলো বলে বাড়ির পথ ধরে মুন্সিগঞ্জ আদিবাসী পাড়ার মন্দিরা রানী মুন্ডা। দু’সন্তানের জননী আদিবাসী এ নারী জানান, নারী হওয়ায় অনেক সময় তাদেরকে কাজে নিতে চায় না মালিকরা।

নারীরা আজও অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার দাবি করে জেলেখালী গ্রামের লক্ষী রানী জানায় কৃষি জমিতে দিনমজুরের কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে রান্না করতে হয়েছে। স্কুল থেকে দুই সন্তান ও কাজ থেকে ফেরা দিনমজুর স্বামীকে দুপুরের খাবার দিয়ে গৃহস্থলীর কাজ গুছাতে বিকেল গড়িয়েছে। এরপর দুই কিঃমিঃ দুর থেকে খাবার পানি এনে গোসল করতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রাতটুকু বিশ্রামের পর সকাল হতেই আবার কাজের জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে। হাড় ভাঙা এমন পরিশ্রমের পরও পরিবারে যথাযথ মুল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ তার।

পঞ্চম শ্রেনী পাশ এ নারী বলেন, “যদি লেখাপড়া শিখতি পারতাম, তবে হয়তবা ছোটখাট চাকরী করলি স্বামী/শ^শুরগো মন রাখতি গে এত খাটতি হতো না”।

তবে শুধু মন্দিরা আর লক্ষী রানী নয়। বরং উপকুলীয় এ জনপদের নারীদের প্রায় সকলেরই দাবি তারা অনেক বেশী অবহেলা এবং বঞ্চনার শিকার। মজুরী বৈষম্যের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় না বলে অভিযোগ তাদের।

শ্যামনগর উপজেলার কদমতলা গ্রামের আছিয়া বেগম ও নমিতা রানীসহ কয়েক নারী শ্রমিক জানায় তারা পুরুষের সমান কাজ করে এক বেলার জন্য দুইশ টাকা পাচ্ছে। অথচ পুরুষরা তিনশ টাকা পাওয়ার পর তাদের জন্য কাজের ক্ষেত্র অনেক বেশী।

নকিপুর বালিকা বিদ্যালয়ের সমানের রাস্তার কাজে নিয়োজিত আছিয়া ও ফরিদা বিবি জানায় সকাল থেকে একই সময়ে পুরুষ শ্রমিকদের সাথে কাজে যোগদান করেও তারা পাচ্ছে চারশ টাকা। বিপরীতে পুরুষ শ্রমিকরা সারাদিনে সাড়ে পাঁচশ টাকা মজুরী পাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া নারী শ্রমিকদের কাজে নিতে চায় না ঠিকাদারের লোকজন।

কর্মক্ষেত্র আর মজুরীর পাশাপাশি সামজিক নিরাপত্তাসহ পারিবারিকভাবেও এ জনপদের নারীর বৈষম্যের শিকার বলে জানান অনেকে। মুন্সিগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সংযুক্তা, শ্যামলী, রাবেয়া ও সুমাইয়াসহ অন্যরা বলে, মেয়েরা এখনও নায্য অধিকার পাচ্ছে না। পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারনে পিতা মাতা মেয়েদের বেশীদুর পর্যন্ত লেখাপড়া করায় না। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিলেও ছেলে সন্তানদের বিষয়ে তারা উল্টো মনোভাব দেখায়। এছাড়া স্কুল কলেজে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়ত নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হওয়ারও দাবি করেন।

উপকুলবর্তী জনপদ শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, মীরগাং ও গাবুরাসহ বিভিন্ন এলাকা এলাকার নারীদের অভিযোগ নারী অধিকার নিয়ে অনেক বেশী সভা সমাবেশ হচ্ছে। নারী দিবস পর্যন্ত পালন হচ্ছে। কিন্তু এতকিছুর পরও অদ্যাবধি নারীদের নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

কয়েক নারী অভিযোগ করেন বাস কিংবা যানবাহনে চলাচল করতে যেয়ে এখনও পুরুষের টিপ্পনী থেকে কুদৃষ্টি মোকাবেলা করতে হয়। পারিবারিক ও সাংসারিক বিষয়গুলোতেও নারীদের মতাতত উপেক্ষিত হচ্ছে জানিয়ে নাম প্রকাশ না করে কছেশ নারী জানান, সন্তান জম্মদান আর লালন পালনের বাইরে পরিবারে তাদের কোন গুরুত্ব নেই। উপযাজক হয়ে পারিবারিক বিষয়ে কথা বলতে গেলে কোন কোন সময় সহিংস আচারণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন কয়েক নারী। এছাড়া মুধুমাত্র নারী হওয়ার কারনে দুরবর্তী গ্রামসমুহে ছুটে ছুটে শিক্ষকতা করতে না পারায় অজুহাতে স্থানীয় একটি এনজিও’র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শিক্ষকতার চাকুরী না পাওয়ার অভিযোগ করেন সুধা রানী মন্ডল নামের এক নারী।

নারীদের অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি – দাবি করে শ্যামনগর উপজেলা জাতীয় মহিলা সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শাহানা হামিদ বলেন, পুরুষদের আরও সহযোগীতা ছাড়া নারী অধিকার পুর্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পুর্বের তুলনায় নারীরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে অধিকার পেলেও সম্পুর্ন অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের আচারণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সরকার এবং রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নারীদের নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।#