ব্যাংকে দশ বছরে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি


218 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ব্যাংকে দশ বছরে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি
ডিসেম্বর ৯, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

*সিপিডির সংলাপে তথ্য উপস্থাপন

অনলাইন ডেস্ক ::

ব্যাংকিং খাত হলো অর্থনীতির হূৎপিণ্ড। পুরো অর্থনীতির প্রাণসঞ্চার হয় এখান থেকে। অথচ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ব্যাংক খাতের অবস্থা খারাপ। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার জন্য নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়া আছে, তার যথাযথ প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

শনিবার ব্যাংকিং খাত বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি আয়োজিত এক সংলাপে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ বিশিষ্টজন এ কথা বলেন। রাজধানীর গুলশানে খাজানা গার্ডেন রেস্টুরেন্টে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বড় কয়েকটি ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় গত ১০ বছরে ব্যাংক খাতে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব অনিয়মের বেশিরভাগই রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোতে হয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে শুধু জনতা ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে। এ ছাড়া সোনালী, বেসিক, ফারমার্সসহ বিভিন্ন ব্যাংকে অনিয়মের মাধ্যমে অনেক অর্থের অপচয় হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণের পরও প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে না পারা, ঋণ-আমানত অনুপাত ও স্প্রেডের অদক্ষতা, সম্পদের বিপরীতে আয়সহ সার্বিক সূচকের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। পরিস্থিতির উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করে প্রকৃত অবস্থার আলোকে ব্যবস্থা, খারাপ অবস্থায় থাকা ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নতুন করে কোনো ব্যাংক না দেওয়া, খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।

সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের উন্নতি হয়েছে। তবে ব্যাংক খাতে উন্নয়নের বদলে অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এ খাত। অথচ ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির হূৎপিণ্ড। পুরো অর্থনীতির প্রাণসঞ্চার হয় এখান থেকে। ব্যাংকিং খাত ছাড়া মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া যাবে না। ব্যাংক খাত ভালো অবস্থায় নিতে চাইলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। তিনি বলেন, ব্যাংক হলো আস্থার বিষয়। দেশে এই প্রথম সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, কোন ব্যাংকে টাকা রাখলে আমানত নিরাপদ থাকবে। আগে কখনও এ রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ব্যাংক থেকে নিয়ম ভেঙে সব লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। ঋণখেলাপি ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। কিছু ক্ষেত্রে এটা কঠিনভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। কিন্তু যারা প্রভাবশালী, তাদের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যে নতুন ঋণ নিয়ে আগের খেলাপি ঋণ পরিশোধ করছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামীতে যারাই ক্ষমতায় আসবে, ব্যাংকিং খাতকে লুটপাটের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেবেন না। দেশের কয়েকটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে গিয়েছিল। এখন কোনো নিয়মকানুন ছাড়াই বিভিন্ন ব্যাংক অধিগ্রহণ হচ্ছে। একচেটিয়া অধিগ্রহণ করে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের হাতে অনেক ব্যাংক চলে গেলে পুরো অর্থনীতিতে জিম্মিদশা নেমে পড়বে।

ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সব সরকারের সময়েই দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অনৈতিকভাবে ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়ে পার পেয়ে যান। আশির দশকে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ঠিক না করেই নতুন ব্যাংক দেওয়া হয়। পরে দেখা গেল, আমানতের ৩০ শতাংশের মতো তারা নিয়ে নিয়েছেন। এরপর অনেক চেষ্টা করে এই খাতকে একটি ভালো অবস্থার পর্যায়ে আনা হয়। এখন আবার নানা কারণে এ খাত পিছিয়ে পড়ছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন ব্যাংকের অবস্থা বেশি খারাপ। অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন নিস্কাশনমূলক অর্থনৈতিক অবস্থা চলছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে ব্যাংকিং খাতকে নিস্কৃতি দিতে হবে। এ জন্য রাজনীতিবিদদের সফল ব্যাংকিং খাত তৈরির উপলব্ধি থাকতে হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে বলব- ব্যাংক খাতে অনিয়মের মাধ্যমে যাদের সাময়িক সুবিধা দিয়ে নিজেরা উপকৃত হতে চান, এর চেয়ে বেশি উপকৃত হবেন ব্যাংকিং খাতকে নিয়মের মধ্যে আনলে। তাতে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এসব বিষয় নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করতে হবে। ইশতেহারে স্পষ্ট করে বলতে হবে আগামী দিনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করবেন না। ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেবেন।

তিনি বলেন, অনেকদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায় থেকে সরকারি উদ্যোগে অস্থায়ীভাবে একটি ব্যাংকিং কমিশন করার কথা বলা হচ্ছে। নির্বাচনের পর সিপিডির পক্ষ থেকে ব্যাংকিং বিষয়ে একটি নাগরিক কমিশন করা হবে। যেখানে দেশের বিশিষ্টজন থাকবেন। কমিটির পক্ষ থেকে তিনটি উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথমত, ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাত নিয়ে যেসব আশঙ্কা তার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা। তৃতীয়ত, সমস্যার সমাধান কী হবে তা সুপারিশ আকারে তুলে ধরা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা আছে। এটা প্রয়োগ করতে হবে। হোটেলে বসে মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে হবে না। ব্যাংক খাত ধ্বংস হয়নি। তবে খারাপ অবস্থায় পড়েছে। সংক্রমণ ব্যাধি সব ব্যাংকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত এটা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকের পর্ষদে রাজনৈতিক লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সবার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাযথ আইন প্রয়োগ না করলে অবস্থার উন্নতি হবে না। আবার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ়তা না থাকলে ব্যাংকারদের জন্য কাজ করা কঠিন। এ জন্য স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন করতে হবে। সার্বিক অবস্থার উন্নয়নে খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণখেলাপিরা কোনোভাবে যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সে ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এ যাবতকালের সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় চলছে ব্যাংক খাত। যারা ব্যাংকের মোট তহবিলের ৭ থেকে ৯ শতাংশ জোগান দেয়, তাদের হাতে এ খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। আইন প্রয়োগের সঙ্গে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবিকে যুক্ত করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম। ভারতের সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর হস্তক্ষেপের আভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির গভর্নর পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে হোটেলে গিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত বদল করেন। বিশ্বের কোনো দেশের গভর্নর ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে এভাবে বসেন বলে জানা নেই। তিনি বলেন, বেসিক ব্যাংকে যার নেতৃত্বে লুট হলো, আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। এ ছাড়া এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক, টানা তিন মেয়াদে নয় বছর থাকার সুযোগের সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, নতুন সরকার আসার পর ব্যাংক খাত নিয়ে একটি সমীক্ষা করে সংস্কারের ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দিতে হবে সংসদ থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো ধরনের নির্দেশ দিতে পারবে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ক্রমাগত নিম্নগামী। এতকিছুর মধ্যে ব্যাংক খাত যে চলছে এবং টিকে আছে এটা একটা বিষয়। ফারমার্স ব্যাংককে মূলধন জোগান দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো নিজেরাই মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এসব ব্যাংক আবার অন্য ব্যাংককে মূলধন জোগান দিচ্ছে। এটা অ্যানিমিয়ায় ভোগা রোগী আরেকজনকে রক্ত দেওয়ার সমান। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কেন স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না তা বের করতে হবে। তিনি মনে করেন, ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনের মাধ্যমে বারবার ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সুযোগ দিলে অনিচ্ছাকৃত খেলাপিরাও এক সময় ইচ্ছাকৃত খেলাপিতে পরিণত হবে। ফলে এসব ঠিক করার রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইদুজ্জামান বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, নতুন ব্যাংকের দরকার নেই। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের কথায় দিয়ে দিচ্ছে। সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সবকিছু এখন নিয়ন্ত্রিত হয় এক জায়গা থেকে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা সঠিক থাকলে এমনিতেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুচিন্তা শারমিন বলেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান দুরবস্থার অবসানে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল বলেন, ঋণখেলাপি বা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী করা যাবে না। এটা যদি বিএনপিও করে থাকে, এর বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরী বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে অর্থ মন্ত্রণালয় আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক- বিশ্বের কোথাও এ রকম নিয়ম নেই। এ ছাড়া শুধু নেতিবাচক বিষয়ের পাশাপাশি সিপিডিকে ইতিবাচক বিষয় নিয়েও আলোচনা করার দাবি জানান তিনি।

সাবেক ব্যাংকার মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, এখানে সুশাসন জরুরি। ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার বলেন, খারাপ ব্যাংকগুলোকে তিন বছর সময় দিয়ে না পারলে একীভূত করে দেওয়া উচিত।

ফারমার্স ব্যাংকের এমডি এহসান খসরু বলেন, ফারমার্স ব্যাংককে সুযোগ না দিলে আরও নয়টি ব্যাংক সমস্যায় পড়তো। চাকরি যাওয়ার ভয়ে ব্যাংকাররা কিছু করতে পারেন না।

সূত্র : দৈনিক সমকাল।