ভালো নেই বন্যপ্রাণীরা


544 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ভালো নেই বন্যপ্রাণীরা
মার্চ ৩, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
ভালো নেই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা। সুন্দরবন থেকে অবাধে বাঘ ও হরিণ শিকার করছে চোরা শিকারি এবং বনদস্যুরা। জেলেদের জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে ডলফিন, শুশুক, কুমিরের বাচ্চা ও বিরল প্রজাতির কচ্ছপ। জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মানুষের নানা অত্যাচারে কয়েক প্রজাতির প্রাণী এখন সংকটাপন্ন। এরই মধ্যে বন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে গণ্ডার ও মহিষসহ বেশ কিছু প্রাণী। এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সুন্দরবনপ্রেমীরা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নয়নাভিরাম সুন্দরবনের আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বনভূমি চার হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার এবং জলাভূমি এক হাজার ১৮৫ বর্গকিলোমিটার। এই বনভূমি ও জলাভূমিতে বাস করে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী। বন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনে বাঘ ও

হরিণ শিকারিরা কিছুদিন পরপর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। চোরা শিকারিদের পাশাপাশি বনদস্যুরাও বাঘ ও হরিণ মেরে এগুলোর হাড়, মাংস, চামড়া, পুরুষাঙ্গ ও দাঁত বিদেশে পাচার করছে। গত তিন বছরে র‌্যাব-৬ ও ৮ এর সদস্যরা বাঘের ৯টি চামড়া উদ্ধার করেছে।

র‌্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে প্রতিটি বাঘের চামড়া বিক্রি হয় কমপক্ষে ১০ লাখ টাকায়। আর হরিণের চামড়া বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। এ ছাড়া শিকার করা হচ্ছে অন্যান্য বন্যপ্রাণীও।

সর্বশেষ বাঘশুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০৬টিতে। বর্তমানে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে আবারও সুন্দরবনে বাঘশুমারি চলছে।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির সমকালকে বলেন, বেশ কয়েকটি চামড়া উদ্ধার হয়েছে, তবে বাঘ ও হরিণ শিকারের সব ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসে না। চামড়া বহনকারীরা ধরা পড়লেও শিকারি এবং বন্যপ্রাণীর চামড়া ক্রেতার বেশিরভাগই রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বন বিভাগের ১৯৯৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুন্দরবনে কুমির ছিল ১৫০ থেকে ২০০টি। তবে ২০১৬ সালের সর্বশেষ সমীক্ষায় দেখা গেছে মাত্র ১০০টি কুমির রয়েছে। সুন্দরবনের সব এলাকায় এখন আর কুমির নেই।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের নদীগুলোতে ক্রমাগত বাড়ছে লবণাক্ততার পরিমাণ ও বিস্তৃতি। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে কুমিরের প্রজননে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করে রোগাক্রান্ত হচ্ছে বাঘসহ বন্যপ্রাণী। লবণাক্ততা সামান্য বাড়লে সুন্দরবনের নদী-খালে পারশে, দাতিনা, টেংরা ও ভেটকি মাছ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম খোকন জানান, বন থেকে ইতিপূর্বে বিলুপ্ত হয়েছে গণ্ডার, বন মহিষ, মিঠাপানির কুমির, এক প্রজাতির হরিণ, চিতা বাঘ ও চার প্রজাতির পাখি। বনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে মাছ ও কাঁকড়ার ওপর। বিলুপ্ত হতে চলেছে ১৯ প্রজাতির মাছ।

বন-সংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবনের গাছে গাছে আগের মতো বানর এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায় না। কমে গেছে মৌচাকও। অবাধে বনের গাছ কাটার কারণে বিপন্ন হতে চলেছে অনেক বন্যপ্রাণী। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দীর্ঘদিন ধরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে একটি চক্র। ফলে বিভিন্ন মাছের পোনা, কাঁকড়া এবং জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।

সুন্দরবনের মধ্যে জয়মনিরগোল থেকে শরণখোলার বগি পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার নদীপথে এখনও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়নি। মংলাবন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে ১৩১ কিলোমিটার নদীপথে দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচল করছে। সুন্দরবনের মধ্যের নদী দিয়ে রায়মঙ্গল ও কয়রার আংটিহারা এলাকা দিয়ে জাহাজ যাওয়া-আসা করছে ভারতে।

এসব জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ন আতঙ্কিত করে তুলছে বন্যপ্রাণীকে। নৌযান থেকে নিঃসৃত তেল ও বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে বনের মধ্যে। এতে দূষিত হচ্ছে বনের মাটি ও পানি।

২০১২ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবনের ঢাংমারী, চাঁদপাই ও দুধমুখী এলাকাকে ডলফিনের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এই তিনটি এলাকার প্রায় ৩১ কিলোমিটার নদীতে রয়েছে ইরাবতি ও শুশুক ডলফিনের বিচরণ। তবে বনের মধ্য দিয়ে চলাচল করা ভারী নৌযানের পাখার আঘাতে মারা পড়ছে ডলফিন। এ ছাড়া এসব এলাকায় জেলেদের মাছ ধরা জালে আটকা পড়েও মারা যাচ্ছে শুশুক ও ইরাবতি।

ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির সিনিয়র গবেষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দ্রুতগতির এসব জাহাজের বড় বড় ঢেউয়ের কারণে নদীর তীর ভেঙে যাচ্ছে। সেই মাটি গিয়ে নদীর মোহনার গভীর স্থানগুলো ভরাট করে ফেলছে। ফলে এই মোহনাগুলোতে বিচরণ করা ডলফিন ও শুশুকের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া ভারী নৌযান চলাচল করা রুটগুলোতে বনের পাশে এখন আর তেমন হরিণ ও বানরসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী দেখা যায় না।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাহিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করা উচিত। তবে সেজন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের মধ্যে নদীগুলোর পানির উচ্চতা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৃদ্ধির হার বছরে তিন থেকে আট মিলিমিটার। ফলে জোয়ারের সময় বনভূমি ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। সে জন্য সংকুচিত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র।

এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান সমকালকে বলেন, বন্য ও জলজ প্রাণী রক্ষায় সুন্দরবনে এখন জিপিএসের সাহায্যে ‘স্মার্ট প্যাট্রোলিং’ চলছে। এ ছাড়া বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে কাজ চলমান রয়েছে।