ভিন্ন এক স্বাধীনতা দিবস


308 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ভিন্ন এক স্বাধীনতা দিবস
মার্চ ২৬, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতি মুক্তির মহাকাব্য রচনা করেছিল যে দিনে, আজ সেই মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ৪৯তম বার্ষিকী। অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণের কবল থেকে মাতৃভূমি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার এ দিনটি এবার উদযাপিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতো এ দেশের জনগণও এখন মরণপণ যুদ্ধ করে চলেছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। একাত্তরের এই দিনে এ দেশের মুক্তিপাগল দামাল সন্তানরা যেমন আকাশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার লাল সূর্যের আলো, তেমনি এবারের স্বাধীনতা দিবসে জনগণ শপথ নিচ্ছে ক্রান্তিকাল পেরিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার; করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করে বিশ্ব মানচিত্রে আবারও মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। করোনাভাইরাসজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবার অবশ্য স্বাধীনতা দিবসের কোনো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না।

দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু সবসময় রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, লাখ লাখ মানুষের সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এ স্বাধীনতা বাঙালি জাতির মহত্তম অর্জন। এই অর্জনকে অর্থপূর্ণ করতে হলে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। লালন করতে হবে স্বাধীনতার সত্যিকার চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে পাঠানো এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ৪৯ বছরে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় উন্নতি করে এগিয়ে চলেছে এবং কৃষি ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে।

এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে পাঠানো এক বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সবার জন্য একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের অংশগ্রহণ ও সমর্থন কামনা করেন।

আজ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সব ভবনে ও শহরের প্রধান সড়কগুলোতে উড়বে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা। সব সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবন এবং স্থাপনা আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ নিবন্ধ, ক্রোড়পত্র, সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হবে, সরকারি ও বেসরকারি বেতার ও টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

তবে করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যগত গণঝুঁকি এড়াতে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোসহ সব জাতীয় কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও স্বাধীনতা দিবসের সব কর্মসূচি বাতিল করেছে। আজ বৃহস্পতিবার থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে গণছুটি ও যোগাযোগ পরিবহনে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। সংগনিরোধ নিশ্চিত করতে ও বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে নামানো হয়েছে সেনা সদস্যদের।

এবারের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীও উদযাপিত হচ্ছে। মাত্র ৯ দিন আগে শুরু হয়েছে ‘মুজিববর্ষ’। আজকের এ দিনে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামানসহ মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী দেশমাতৃকার অগণিত বীর সন্তান এবং সহায়-সম্পদ হারানো, হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণের শিকার সবাইকে।

কভিড-১৯ এর আতঙ্ক দেশজুড়ে থাকলেও আজকের দিনে বাঙালি জাতি স্মরণ করবে ইতিহাসের সেই রক্তরাঙা সময়কে। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ছয় দফার ভিত্তিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার আড়ালে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। মার্চের প্রথম দিন থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আর ঐতিহাসিক সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাসহ সারাদেশে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। মধ্যরাতেই অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু ভবন) থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইপিআরের ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ সেই রাতেই সাইক্লোস্টাইল করে শহরবাসীর মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেন।

পরে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এ ঘোষণা-সংক্রান্ত বিবৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত হয়। বিবৃতিটি সেখানে সর্বপ্রথম পাঠ করেন আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান। এরপর ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানও ওই বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। তার এই ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘…ডিক্লেয়ার দ্য ইনডিপেনডেন্স অব বাংলাদেশ, অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ এই ঘোষণা হ্যান্ডবিল, টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টার ও তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ঘোষণা প্রচারিত হয়। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে এ দেশের মানুষ দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। আজকের দিনে সমগ্র জাতি স্বাধীনতার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হবে। হৃদয়পটে সৃষ্ট গভীর ক্ষত থেকে উচ্চারিত হবে পঙ্‌ক্তিমালা- ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি, বাংলাদেশের নাম’।