খাস জমির দাবীতে সাতক্ষীরায় ভূমিহীনদের সমাবেশ


441 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
খাস জমির দাবীতে সাতক্ষীরায় ভূমিহীনদের সমাবেশ
অক্টোবর ৪, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥
—————————-
কোনো গনআন্দোলন কখনও বৃথা যায়না। জনগনের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও কোনো না কোনো সময় সফল হয়। আজকের ভূমিহীন আন্দোলনও বৃথা যেতে পারেনা । কারণ অধিকার আদায়ের এই আন্দোলন করতে গিয়ে ভূমিহীন নেত্রী জায়েদা খাতুন প্রাণ দিয়েছেন। তার রক্তও বৃথা যাবেনা । প্রধানমন্ত্রী জনগনের এই আন্দোলনকে সম্মান দেখিয়ে ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি বিতরন করেছেন।
সরকারি খাসজমি থেকে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ চেষ্টার প্রতিবাদে ও ভূমিহীনদের মাঝে জমি বিতরন করে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিতে সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল ভূমিহীন সমাবেশে একথা বলেছেন নেতৃবৃন্দ।
প্রখর রোদের মধ্যে ভূমিহীন জনতার করতালি ও স্লোগানের মধ্যে নেতৃবৃন্দ ঘোষনা দিয়ে বলেন ‘ খাসজমি ভূমিহীনদের, এই জমি থেকে কেউ তাদের উচ্ছেদ করতে পারবে না। সরকারও ভূমিহীনদের স্বার্থে কাজ করছে’। আন্দোলনের মুখে খাসজমির দখলদারিত্ব ছেড়ে অচিরেই ভূমিদস্যুরা পলায়ন করবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এই সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘোষনা অনুযায়ী জেলার কয়েকটি ভূমিহীন জনপদের সদস্যরা খাস জমি পেয়েছেন। কিন্তু কিছু এলাকায় এই ঘোষনা বাস্তবায়ন না করে খাসজমি ভূমিদস্যুদের দখলে সহায়তা করা হচ্ছে। দেবহাটার নোড়ার চারকুনি ভূমিহীন পল্লীতে বসবাসরত ৭৫০ টি ভূমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চলছে জানিয়ে তারা আরও বলেন এর বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবেন। জেলার বিপুল আয়তনের খাসজমি এখন স্বনামে বেনামে দখল নিচ্ছে ভূমিদস্যুরা এমন অভিযোগ করে তারা বলেন তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনা হবে। নোড়ার চারকুনির খাসজমির আন্দোলন করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন প্রখ্যাত কৃষক নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর। ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সাতক্ষীরায় এ যাবত কমপক্ষে ১৭ জন শহীদ হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তারা।
দৃঢ়তার সাথে বক্তারা সাতক্ষীরার জিপি এড. গাজি লুৎফর রহমানের উদ্দেশ্যে বলেন ‘ আগুন নিয়ে খেলবেন না। আপনার দায়িত্ব সরকারের খাস জমি ভূমিদস্যুদের কবল থেকে বের করে আনা। আপনি তা না করে নিজে রিসিভার হয়ে ভূমিহীনদের খাসজমি দখলে মেতে উঠেছেন। জনগন আপনার সুখ স্বপ্ন সফল হতে দেবে না’। অচিরেই তাকে পদত্যাগের আহবান জানিয়ে বক্তারা আরও বলেন অন্যথায় এই ভূমিহীন জনপদে আপনার কবর রচিত হবে। নোড়ার চারকুনির খাসজমি দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা দিলেও জনগন তা দখল করতে দেয়নি বলে জানান বক্তারা। তারা আরও বলেন এসব বিষয়ে আদালতকে ভুল তথ্য দিয়ে কিছু স্বার্থাণে¦ষী মানুষ খাসজমি গিলে খাচ্ছে। ১৯৮৮ সালে বাঁকাল ইসলামপুর চরে ভূমিদস্যুদের থাবার কথা উল্লেখ করে বক্তারা আরও বলেন সেদিন একটি শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আন্দোালন করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হন বলেও মন্তব্য করেন তারা। কিন্তু অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেমে থাকেনি।


সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষন করে তারা বলেন ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ এর দেশ কাঁপানো ভূমিহীন আন্দোলনে সাতক্ষীরা অচল হয়ে পড়েছিল। আর জনগন তাদের অধিকার আদায় করে ঘরে ফিরেছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম হবেনা বলে মন্তব্য করেন তারা। সাতক্ষীরার জিপি এড. গাজি লুৎফর রহমানকে অবিলম্বে বহিস্কারের দাবি জানান বক্তারা।
তারা বলেন ১৯৯৮ সালের দেবহাটা কালিগঞ্জ এর নয়টি ভূমিহীন জনপদে বসবাসকারী ভূমিহীনদের উচ্ছেদ চেষ্টার সময় আন্দোলনের মুখে গুলিতে নিহত হন কৃষকবধূ জায়েদা খাতুন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেবহাটায় এক বিশাল সমাবেশে ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি বিতরনের ঘোষনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষনার পর পর্যায়ক্রমে এ এলাকার ১২ শ’ ভূমিহীন পরিবার ১২ শ’ একর খাসজমির দলিল লাভ করে। অখচ নোড়ার চারকুনির খাসজমি বিতরনে একটি মহল বাধার সৃষ্টি করছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বিঘিœত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তারা। এ প্রসঙ্গে বক্তারা আরও বলেন সরকারের এই খাসজমি উদ্ধার করে ভূমিহীনদের মাঝে বিতরনের বিপরীতে স্বার্থাণে¦ষী মহলটি ভূমিদস্যুদের নানাভাবে সহযোগিতা করছেন।
বুধবার সকালে সাতক্ষীরা নিউমার্কেট চত্বরে জেলা ভূমিহীন উচ্ছেদ প্রতিরোধ সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ভূমিহীন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরার তালা কলারোয়া আসনের সংসদ সদস্য এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, দৈনিক কালের চিত্র সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, কেন্দ্রীয় জাসদ নেতা ও দৈনিকদক্ষিনের মশাল সম্পাদক অধ্যক্ষ আশেক ই ইলাহি, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, ভূমিহীন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি ওহাব আলি সরদার, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু সাঈদ প্রমুখ। বক্তারা ভূমিহীনদের নামে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান ।
ভূমিহীন সমাবেশের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ বলেন ‘ আমরা সরকার প্রধানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি। আর ভূমি দস্যুরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। অচিরেই এ বাধা অপসারিত হবে। অধিকার আদায়ের এ আন্দোলন সফল করতে আমরা রাজপথে নামতে প্রস্তুত রয়েছি’। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মো.নজরুল ইসলাম বলেন ‘ স্বাধীনতা , ভাষার জন্য আন্দোলন , স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন বৃথা যায়নি। আর ভূমিহীনদের খাসজমির অধিকার আদায়ের ন্যায্য আন্দোলনও বৃথা যাবে না। মানবতার নেত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারে অত্যারিত রোহিঙ্গা সদস্যদের আশ্রয় ও অন্ন বস্ত্র দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম আরও বলেন তিনি দেশের ভুমিহীনদের খাসজমি দিতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু মানবতার নেত্রীর এই সদিচ্ছাকে যারা বাধাগ্রস্থ করছেন তারা রক্ষা পাবেন না। সরকারকে যারা বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে ফায়দা লুটতে চায় তাদের হুশিয়ার করে দিয়ে তিনি বলেন পোলাও বিরিয়ানি মুখে নিয়ে দরিদ্র ভূমিহীনদের এই আন্দোলন থামিয়ে দিতে পারবেন না। সমাবেশে অধ্যক্ষ আবু আহমেদ বলেন ‘ আমরা ভূমিহীনদের জন্য লড়ছি । এ লড়াই শেষ হবে সেদিন, যেদিন ভূমিহীনরা তাদের ন্যায্য অধিকার লাভ করবেন। তিনি বলেন ভূমিদস্যুরা ভূমিহীনদের পথ আগলে রাখতে পারবে না। তাদেরকে অপসারন করে ভূমিহীনরা সরকারি জমিতে বসতি গড়বেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ও দৈনিক দক্ষিনের মশাল সম্পাদক অধ্যক্ষ আশেক ই ইলাহী বলেন ‘ আমার দল ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের সাথে রয়েছে। ্ আপনাদের সকল আন্দোলনে আমরা ছিলাম আছি এবং থাকবো মন্তব্য করে তিনি বলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার পরিবারের সদস্যদের হারিয়েও দৃঢ়তার সাথে দেশ পরিচালনা করছেন। তিনি ভূমিহীনদের সাথী হয়ে রয়েছেন। আগামী দিনেও তিনি ভূমিহীনদের জমি ও বসতি দিয়ে তাদের সেবা করবেন বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি এড. আবুল কালাম আজাদ বলেন ‘ ভুমিহীনরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য মাঠে থেকেছে , প্রাণ দিয়েছে। এখনও মাঠে রয়েছে . প্রয়োজনে আবারও প্রাণ দেবে কিন্তু ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্ব মেনে নেবে না। তিনি বলেন ভূমিহীন জনতার এই আন্দোলনের সাথে সাতক্ষীরার সংবাদকর্মীরা রয়েছেন। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলিও তাদের সাথে রয়েছে। তীব্রতর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন এ আন্দোলন বৃথা যেতে পারে না। ভূমিহীনরা তাদের জায়গায থাকবেনই। সাতক্ষীরা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সাঈদ বলেন ‘ আমি এবং আমার দল আপনাদের সাথে রয়েছে। আপনাদের ডাকে আমরা আন্দোলনে শরিক হতে প্রস্তুত রয়েছি।
সমাবেশের সভাপতি দেবহাটা কালিগঞ্জ ভূমিহীন উচ্ছেদ প্রতিরোধ সংগ্রামসমন্বয় কমিটির সভাপতি ওহাব আলি সরদার বলেন ‘ আমরা পথে নেমেছি। যতক্ষন না আমাদের অধিকার শতভাগ আদায় হবে ততক্ষন পথে থাকবো। তিনি বলেন আন্দোলনে ভয় পাবেন না। সাহসের সাখে এগিয়ে চলুন ্ জয় আমাদের হবেই। তিনি ভূমিহীন আন্দোলনের পথিকৃৎ এড. আবদুর রহিম, সাইফুল্লাহ লস্কর, এড.ফিরোজ আহমেদ, আশরাফুল আলম টুটু সহ সকল প্রয়াত নেতা এবং জায়েদা খাতুনসহ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন আমরা তাদের পথ ধরে এগিয়ে যাব । জয় আমাদের সুনিশ্চিত।


পরে ১০ দফা দাবিতে ভূমিহীনরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে নোড়ার চারকুনির রিসিভার বাতিল, ৭৫০ ভূমিহীন পরিবার উচ্ছেদ বন্ধ, নোড়াকে খাস খতিয়ানভূক্ত করে ভূমিহীনদের মাঝে বিতরন, আদালত থেকে জিপি লুৎফর রহমান প্রভাবিত আদেশ বাতিল, জিপি লুৎফর রহমানকে অপসারন, জেলার সব খাসজমি ভূমিহীনদের স্থায়ী ইজারা প্রদান, চরভরাটি জমি থেকে ভূমিহীন উচ্ছেদ বন্ধ, জালিয়াতির মাধ্যমে খাসজমির দখল থেকে ভূমিদস্যুদের উৎখাত, ভূমিহীনদের নামে করা মামলা প্রত্যাহার এবং ১৯৯৮ এর ১৮ আগস্ট দেবহাটার দেবীশহর মাঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমির বিতরনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন।