ভোলার সাইক্লোনের খবর শুনে সাতক্ষীরা থেকে ছুটে গেলেন বঙ্গবন্ধু


213 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ভোলার সাইক্লোনের খবর শুনে সাতক্ষীরা থেকে ছুটে গেলেন বঙ্গবন্ধু
আগস্ট ১৪, ২০২০ ইতিহাস ঐতিহ্য ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সুভাষ চৌধুরী

সত্তুরের নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু তখন চষে বেড়াচ্ছেন সারা বাংলাদেশ। দেশের দক্ষিন উপকূল জুড়ে দুর্যোগের ভয়াল ছোবল। তার প্রভাব পড়েছে দেশের সব এলাকাতেই। ১৯৭০ এর নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু এক দিনে ১২ টি মিটিং করে সাতক্ষীরায় এসেছেন রাত তখন সাড়ে ১০ টা। টিপিটিপ করে বৃষ্টি ঝরছে। সাথে ঝড়ো হাওয়া।

সাতক্ষীরা শহরের পিএন স্কুল মাঠে বিশাল জনসমুদ্রের মধ্যখানে তৈরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্গবন্ধু বললেন ‘ওরা আমাদের দাবিয়ে রাখতে চায়। ওরা আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন করছে। বাঙ্গালিদের ওরা কোনঠাসা করে রাখতে চায়। ওদের জুলুম নির্যাতন নিপীড়ন চরমে উঠেছে। ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ওদের হঠাতে হবে’। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এমন বিষোদগারে গগন বিদারী স্লোগান আর তুমুল হর্ষধ্বনিতে জনতা হাত উঁঁঁচিয়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি বললেন ‘তোমরা প্রস্তুত হও। আমরা সরকার গঠন করে এর জবাব দেবো’।

১৯৭০ এর নির্বাচনে মনোনয়নপ্রাপ্ত সাতক্ষীরা মহকুমা আওয়ামী আওয়ামী লীগ সভাপতি সৈয়দ কামাল বখত সাকিকে তিনি কাছে টেনে নিয়ে আরও বলেন ‘কামালকে তোমরা ভোট দিও’। নৌকা দেখিয়ে বললেন ‘এই নৌকা বাঙ্গালির জয়ের সূচনা করবে’। এসময় দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন ইউসুফ, সম আলাউদ্দিন, একে ফজলুল হক, মমতাজ আহমেদ, এএফএম এন্তাজ আলি প্রমূখ নেতাকে তিনি জনতার সামনে এনে পরিচয় করিয়ে দেন।

এখানেই শেষ নয়। একই দিনে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের সামাদ স্মৃতি ময়দানে তখন অপেক্ষমান লক্ষ জনতা। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিত হবার কথা বিকাল চারটায়। কিন্তু পথেপথে জনসভা পথসভা অনির্ধারিত সভা শেষ করে বঙ্গবন্ধু কালিগঞ্জ যখন পৌঁছান তখন রাত ১ টা। এখানেও বঙ্গবন্ধু বজ্রকন্ঠে ঘোষনা দিয়ে বললেন ‘পশ্চিমারা আমাদের শোষন করছে , শাসন করছে। তারা আমাদের মাথা উঁচু করতে দিচ্ছে না। আমরা বৈষম্যের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলবো। বাঙ্গালিরা যাতে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পরে বাঁচতে পারে তার পথ তৈরি করবো। আপনারা নৌকায় ভোট দিন’ । লক্ষ জনতা এখানেও বঙ্গবন্ধুকে করতালি ও স্লোগানে মুখরিত করে তার আহবানে সাড়া দিলেন। তিনি বলেন ‘সাতক্ষীরা দুর্যোগ প্রবণ এলাকা। এই মহকুমার প্রতি আমার বিশেষ নজর থাকবে। আমরা সরকার গঠন করতে পারলে এখানে মানুষের জন্য সব সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসবো’।

সময়টা তখন নভেম্বর। ১২ নভেম্বর দেশের দক্ষিন উপকূল ভোলায় ভয়াল গোর্কির/ সুপার সাইক্লোন এর দানবীয় ছোবল। লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণহাণি ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী তোফায়েল আহমেদ ভোলা থেকে তাকে জানান ‘ভোলায় ঝড়ে অগনিত মানুষের মৃত্যু হয়েছে । এদিকে সরকারের কোনো নজর নেই । পথে ঘাটে নদীতে সাগরে মানুষ আর গবাদি পশুর পচাগলা দেহ ভাসছে’। বঙ্গবন্ধু বললেন ‘তোমরা মানুষের সেবায় পাশে থাকো । আমি আসছি’। চোখেমুখে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার পূর্বনির্ধারিত সব জনসভা বাতিল করে দ্রুত যশোরের মনিরামপুর হয়ে চলে যান ভোলায়। এর আগে তিনি আরও একটি সংক্ষিপ্ত জনসভা করেন যশোরের ঝিকরগাছায়। ভোলার দৃশ্য দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। গোর্কির এতো বড়ো আঘাতের পরও ইয়াহিয়া সরকার তাদের সহায়তায় পাঁচদিনেও এগিয়ে আসেনি। তাদের বসতের ঘর নেই, খাবার নেই , ওষুধ নেই , চিকিৎসা নেই, পরনের কাপড় নেই। । তিনি দুর্যোগ কবলিত জনতার পাশে গিয়ে সান্ত¡না দেন। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু বলেন সবার আগে এখানে ত্রাণ চাই , মানুষের বসত চাই। তাদের উদ্ধার চাই। ঢাকায় ফিরেই বঙ্গবন্ধু তোলপাড় করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ভোলার দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার চড়ে আকাশ থেকে দেখে দায় শেষ করেন।

১৯৭৩ এ সরকার গঠনের পর বঙ্গবন্ধু আরও একবার এসেছিলেন সাতক্ষীরায় । তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সাতক্ষীরা শহরের রথখোলা মাঠে ফের লক্ষ জনতার স্লোগান। জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বিশাল আকৃতির নৌকা প্রতীকের পাশে নির্মিত মঞ্চে উঠে বঙ্গবন্ধু হাত নেড়ে সকলের কুশল কামনা করে বলেন কেমন আছেন আপনারা। জনসমুদ্রে এসে তিনি বলেন ‘ওরা আমাদের সব চুষে নিয়ে গেছে। আমাদের সব সম্পদ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। নয় মাসের যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়তে আমাকে সময় দিতে হবে। এখন চাইলেই সব কিছু পাওয়া যাবে না। আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই’। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সকলকে আত্মনিয়োগের আহবান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন ‘আমি আপনাদের সাথেই থাকবো’।

জনসভায় মাইকের গড়গড় ঘড়ঘড় শব্দ শুনে বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনসভার সভাপতি সৈয়দ কামাল বখত এমপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘কামাল বাগেরহাটে মিটিং করবার পারি নাই, খুলনায় মিটিং করবার পারি নাই, সাতক্ষীরায় তোর মাইকেও এত ঘড়ঘড় কেন? ’।

রথখোলার এই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর ১৯৫৪ সালে নির্বাচিত এমএলএ বন্ধু মমতাজ আহমেদকে কাছে ডেকে নেন। এসময় মমতাজ আহমেদ বঙ্গবন্ধুকে দু’টি ময়না পাখি উপহার দেন। ১৯৪৬ সালে কলারোয়ার মমতাজ আহমেদ যশোর এমএম কলেজের ছাত্র হিসাবে বিএ পরীক্ষা দেন। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ছিল তার কেন্দ্র। মমতাজ আহমেদ তখন দৈনিক আজাদ সম্পাদক মওলানা আকরাম খাঁর পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুরের বাড়িতে লজিং থাকতেন। ওই বাড়ির কমিউনিস্ট পার্টি নেতা পরবর্তীতে মন্ত্রী রাজ্জাক খাঁ মমতাজ আহমেদকে বলেন, ‘তোদের এলাকার একজন দামাল ছেলে কলকাতায় এসেছে। দেখা করবি? ’ ।

মমতাজ আহমেদ বলেন, ‘অবশ্যই, পরীক্ষা শেষে আমি আপনার সাথে তার সাথে দেখা করতে যাবো’। বঙ্গবন্ধু ও মমতাজ আহমেদ ১৯৪৬ সালে একসাথে একই কলেজ ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষা দেন। বঙ্গবন্ধু তখন থাকতেন ইসলামিয়া কলেজ হোস্টেলে। রাজ্জাক খাঁর সহায়তায় মমতাজ আহমেদ হোস্টেলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করেন। এসময় দুইজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশা পর্যন্ত দুইজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। ৭৩ এর জনসভায় পুরনো বন্ধু মমতাজ আহমেদের কাছ থেকে দুটি ময়না উপহার পেয়ে খুশী হন বঙ্গবন্ধু। । পাইপ টানতে টানতে মমতাজ সাহেবকে বলেন ‘ কেমন আছিস তুই’? ।

৭৩ এর এই জনসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন খুলনা-১০ এর এমপি মোঃ নওয়াব আলী(প্রয়াত), খুলনা-১১ এর এমপি মোঃ মহসীন(প্রয়াত), খুলনা-১২ এর এমপি এএফএম এন্তাজ আলী(প্রয়াত), খুলনা-১৩ এর এমপি সৈয়দ কামাল বখত সাকি(প্রয়াত) ও খুলনা-১৪ এর এমপি এ্যাড. সালাউদ্দিন ইউসুফ(প্রয়াত), সাবেক এমপি মমতাজ আহমেদ(প্রয়াত), সাবেক এমপি একে ফজলুল হক, সাবেক এমএনএ বীর মুক্তিযোদ্ধা স.ম.আলাউদ্দিন( প্রয়াত) , বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু নাসিম ময়না(প্রয়াত), পারুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান তরুন ছাত্রনেতা বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য মুনসুর আহমেদ, মহকুমা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ ভিপি বর্তমানে সাতক্ষীরা ২ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি , মহকুমা ছাত্রলীগ নেতা কাজী কামাল ছট্টু(প্রয়াত) প্রমূখ ।

#

————— সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর, ১৩.০৮.২০
(সাতক্ষীরার আওয়ামী লীগ নেতা সদরে আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, সাবেক সংসদ সদস্য মুনসুর আহমেদ, সাবেক সংসদ সদস্য একে ফজলুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা সাংবাদিক অধ্যক্ষ আবু আহমেদ,কলারোয়ার অধ্যাপক এমএ ফারুক, সাতক্ষীরার ফিরোজ কামাল শুভ্র সহ কয়েকজনের স্মৃতিচারন থেকে লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে)।