ভ্রমন শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ


1060 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ভ্রমন শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ
অক্টোবর ৯, ২০১৬ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

গাজী মোমিন উদ্দীন :
বাড়ির বাইরে ভ্রমন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য, নতুন কিছু শেখার জন্য বের হওয়া ও সেগুলো দেখাই ভ্রমন। ভ্রমন কার না ভাল লাগে। কিন্তু ভ্রমনের জন্য চাই সুযোগ,অনুকুল আবহাওয়া, নির্বিঘ্ন পরিবেশ, রাস্তাঘাটসহ সর্বত্র নিরাপদ অবস্থা। আমার মনে হয় এবারের ভ্রমনে এর প্রায় সবগুলি আছে। তাই যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে বের হয়ে আনন্দ আর জানার দোলায় চড়ে কয়েকদিন নিজের পৃথিবীটাকে বদলে নেওয়ার সাধ মন্দ নয়,ছুটির ঘন্টার সেই আবেগ ঝাপ্টানো গান মনে পড়ে যায়, একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব, নীল আকাশে সবুজ বনে খুশিতে হারাবো। আসলে ভ্রমনের জন্য প্রথমত একটা ভ্রমন পিপাসু মন দরকার। সাধারনত চার দেওয়ালের মধ্যে আটকা থাকা নয়,মানসিকতার বেড়াজালের শিকলমুক্ত হওয়া দরকার। সকল লোভ লালসার উর্দ্ধে উঠে সকল মানুষকে ভালবাসার, নিজেকে উদার মনে অন্যের কল্যাণে নিয়জিত করার মত মনের মানুষেরাই ভ্রমনবিলাসী হয়। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধির চর্চা আর সংস্কৃতিমনা সাহিত্যপ্রেমীরাই কেবল ভ্রমনবিলাসে ভেসে বেড়ায়। আমরা তিনজন স্ত্রী লিপি,একমাত্র সন্তান সাবিরকে নিয়ে ধারাবাহিক ভ্রমন আর দেশের নানা জায়গা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের মনোষ্কামনা পুরনের জন্য ছুটে বেড়াই দেশব্যাপী,সামনে বিদেশও যোগ হবে। উদ্দেশ্য বইতে,টেলিভিশনে যা দেখি, তা আসলে কেমন বাস্তবে দেখা,ভ্রমনের ভাল দিকই বেশি, খারাপ যা কিছু আছে তা থেকে নিজেদের সামলে রাখা সহজ।ভাল দিক নিয়ে কিছু বলা যায়। যেমন: নতুন জায়গা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ: অনুসন্ধিৎসু মনের দরজা জানালা খোলা রাখলে সহজে তা দিয়ে মনের অন্দরমহলে চলে যায় জায়গাটির ইতিহাস,সংশ্লিষ্ট এলাকার সংস্কৃতির হাড়িনাড়ির খবর,বিখ্যাত ব্যক্তিদের নাম, জায়গাটি বিখ্যাত হয়ে উঠার গল্প, অচেনা অজানা মানুষের সাথে পরিচিতি সর্বপরি বিশুদ্ধ বিনোদন। আমাদের এবারের ভ্রমনের প্রথম দিন গিয়েছিলাম দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ও নয়নাভিরাম জায়গা রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য গাজীপুরের সফিপুরের আনসার একাডেমী। সুন্দর আর পরিচ্ছন্নতার এক অপুর্ব এই জায়গাটি আমাদের তথ্যজ্ঞানে যেমন জানার স্পৃহা পুরন করেছে তেমনি নির্মল বিনোদন দিয়েছে। যথাযথ নিয়ম মেনে এখানে ভ্রমন করে অনেক মজা পেয়েছি,দায়িত্বশীলরাও খুব আন্তরিক।  পরদিন গেলাম বাংলা সাহিত্যের আধুনিক উপন্যাসের রাজকুমার হুমায়ুন আহমের স্মৃতিবিজড়িত ও সমাধিস্থল নুহাশ পল্লীতে। গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তা হতে যেকোন বাহনে মনিপুর,সড়কঘাট হয়ে স্ব্ররুপপুর মোড় গিয়ে স্থানীয় আকর্ষনীয় এক বাহন রিক্সা সদৃশ লালুভুলুতে চড়ে নুহাশপল্লী যাওয়া যায়। গাজীপুর সদরের এই সুন্দর জায়গাটিতে শুয়ে আছেন কালজয়ী লেখক হুমায়ুন আহমেদ। ভিতরে প্রবেশ করতেই তার ম্যুরাল চোখে পড়ার মত। এরপর তার সৌন্দর্যপিপাসু অন্তরের সবকিছুর ছাপ রয়েছে এই নুহাশপল্লীতে। হুমায়ুন-গুলতেকিনের ছেলে নুহাশের নামের এই বিনোদন ভান্ডারে জলকন্যার ম্যুরালটি দেখতে খুব আকর্ষনীয়,লীলাবতী দিঘীতে সারাদিন গোসল করলেও মন ভরবেনা, নয়ন তোমায় দেখিতে পায়না,রয়েছো নয়নে নয়নে, ঠিক তাই এখানকার সবুজ বনানী,লিচু আর রসাল বন,  ঔষধি গাছের ছায়ায় ঘোরার সময় হুমায়ুন স্যারকে চোখে না দেখলেও মনে হবে তিনি রয়েছে নয়নে নয়নে। বিশ্রামের ফাকে দাবা খেলতে কাঠের তৈরি রাজা মন্ত্রী আপনার আমার ভাল লাগার অন্যতম অনুসঙ্গ। কবরের পাশে গিয়ে দাড়ালাম,শ্রদ্ধা আর ভালবাসা জানালাম অসম্ভব মেধাবী এই সাহিত্যিককে। শান্ত, কোলাহলহীন দুদন্ড সময় কাটানোর ব্যতিক্রম এক জায়গা এটি। ফিরলাম আনন্দচিত্তে, এবার যেতে হবে কিন্তু যাচ্ছিনা, যাচ্ছি গাজীপুরের আরেক সৌন্দর্যের আধার গাজীপুর বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে। ইজিবাইক নিলাম, ৩০/৪০ মিনিটের পথ,জয়দেবপুর থেকে আবার আরও কম সময়ে যাওয়া যায় এখানে। অসংখ্যা মানুষের ভ্রমনবিলাসের সাথে আমরা তিনজন যোগ হলাম, বিশাল আয়তনের পার্কটি উপভোগের সুবিধার্তে প্রধান ফটকের ডানপাশে একটি সুন্দর ম্যাপ আছে। দেখে বের হলে সহজে সবকিছু দেখা যাবে,তাও সময় লাগবে ৬/৭ ঘন্টা। বাঘ দেখলাম সরাসরি, রাজকীয়ভাবে শুয়ে থাকা বাঘের ছবি নিলাম। মনে হল, সুন্দরবনের এই রাজার রাজ্যশাসনের ভার এখন গাজীপুরের এই সাফারি পার্কে পড়েছে। ভ্রমন সার্থক হল নাদুশনুদুস বড় এই বাঘ দেখে। এরপর সিংহ দেখার পালা কিন্তু বিধিবাম, অনেক্ষন অপেক্ষার পরও রায়বাহাদুরের দেখা মিলল না,ভগ্নমনোরথ হয়ে আসতেই দেখি গেটবিশিষ্ট বিশাল পাহাড়। বান্দরবান আদলে বানানো এই পাহাড়ের মধ্যেই আসল মজা। ঢুকলাম, প্রথমে পাখির আড্ডাখানা,নানান দেশের পাখি রেখে,মাছের রাজ্যে মাছের খেলায় আমরা মাতোয়ারা
এরপর প্রজাপতির আড্ডায় আসলাম, গান বাজছিল হারজিত চিরদিন থাকবে, তবুও এগিয়ে যেতে হবে, বাধাবিঘ্ন না পেরিয়ে বড় হয়েছে কে কবে… গানটি। গেলাম জন্তু দেখতে, এরপর মাছে ভরপুর লেকে,কুমিরের প্রজননপুকুর হয়ে ইটের রাস্তা পেরিয়ে ঝুলন্ত সেতু হয়ে ময়ুরের আড্ডায়, না দেখলে চরম ভুল হতো। এরপর ধনেশ পাখির উন্মুক্ত মঞ্চে এসে চোখে পড়ল বোট যাত্রা। সাবিরের ব্যস্ততায় সেদিকে গিয়ে অত্যন্ত আনন্দপুর্ন এই বোটযাত্রা খুব উপভোগ্য হল,বোটে আমরা আর পানিতে নানা প্রজাতির হাজার হাজার হাস, সাপের সাতার কাটা এত ভাল লাগল তা বলে বোঝাবার মত নয়। তারপর গেলাম নেচার হিস্ট্রিয়ায়, এরমধ্যে সুর্যমামার বিদায়ঘন্টার সাথে আমাদেরও বিদায়ঘন্টা বেজে উঠল। বাশির শব্দ বলে দিল আমাদের থাকার সময় শেষ,এখন বের হতে হবে। বের হলাম তবে প্রবেশদ্বারে থাকা বঙ্গবন্ধুর ছবির পাশে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালাম, কিছু ছবি নিলাম। ফিরে আসলাম,তবে আসছি না,কাল আবার কিছু জায়গায় ঘোরা, বেড়ানো আর বাস্তব অভিজ্ঞতালাভের চেষ্টায় আমরা তিনজন আমি, লিপি আর সাবির।