ভয়ংকর ঠগী, বিচরণ সারা বাংলায়.. (৩য় পর্ব)


187 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
ভয়ংকর ঠগী, বিচরণ সারা বাংলায়.. (৩য় পর্ব)
মে ২২, ২০২১ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

॥ হাসান হাফিজুর রহমান ॥

শত শত বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে হারিয়ে যেত অগণিত পথিক। কোথায়, কীভাবে হারাতো, জানতো না কেউই। কোনো এক জাদুবলে যেন তারা মুছে যেত পৃথিবীর বুক থেকে। কত মানুষ হারিয়েছিল এভাবে?

১৮২৬ সাল, জুলাই মাস।
ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খবর পেলেন, ঢাকা থেকে ফরিদপুরে আসার পথে নিখোঁজ হয়েছেন দু’জন পথিক। তাদের এক জন হিন্দু, অন্যজন মুসলিম। তারা নদীপথে ঢাকা ছেড়েছিলেন, সঙ্গে ছিলো পনের টাকা।
যথারীতি ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট চিঠি লিখলেন ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। দু’জেলাতেই ব্যাপক খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। কিন্তু কোন হদিস নেই দু’জনেরই। পুরো জুলাই মাস গেল, আগষ্ট গেল কিন্তু কোনই সন্ধান মিলছে না ওদের……

তখনও রেলের প্রচলন হয় নি, নৌকাই তখন ভরসা। এমনই এক বিকেলে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়লো একটা ভাড়া নৌকা, যাত্রী ফরিদপুরের দুজন ব্যবসায়ী আর দু’জন গরীব বামণ। ঘাট ছেড়ে আসার ঘন্টা দুয়েক পর নৌকা চরে আটকালো। আর চরের বালুর গভীরে আটকালো ব্যবসায়ী দু’জন,,,,, চিরতরে….!!!

সে নৌকার একটু পিছনেই ছিলো একটা পানসি,, তার যাত্রী ছিলো পাঁচজন। এবার সে নৌকা আর পানসি একসাথে ফিরে গেল ঢাকায়। সেখান থেকে নারায়নগজ্ঞ। যাবার পথে গরীব বামুণরা গলায় পৈতা খুলে সযতনে লুকিয়ে রাখলো গলুই এর নিচে…!!

তার কিছুদিন পর, জৈষ্ঠ্য মাস, এবার সেই নৌকাটি ময়মনসিংহ ঘাটে যাত্রীর অপেক্ষায়, সাথে আরও দূটি নৌকা। দু’জন তাঁতী কাপড় বেচতে এলো নৌকায়, সাথে দুই গাঁট কাপড়,, মাঝিদেরই একজন ডেকে এনেছিলো ওদের,, দরদাম চলছে,, এসময় মাঝিদের একজন ঘুরতে গেলো ডাঙ্গায়। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে দেখলো নৌকায় কাপড়ের গাঁট দু’টো আছে ঠিকই, কিন্তু নেই শুধু সেই তাঁতী দু’জন…

তারপর, সে নৌকা রংপুরে,, সেখান থেকে ফেরার পথে পরিচয় হলো একদল তামাক ব্যবসায়ীর সাথে। নৌকা বোঝাই তামাক নিয়ে সিরাজগঞ্জ যাচ্ছে। ওরা পাঁচজন, দু’দিন নৌকা গুলো পাশাপাশি চললো, এরমাঝে বন্ধুত্বও হলো । তৃতীয় দিনে নৌকা থামিয়ে নেমতন্ন করা হলো ওদের, একসঙ্গে গানের আসর বসানো হবে। ওরা এলো সন্ধ্যায়। নৌকায় হরি কির্তনের আসর হলো, গান হলো তারপর একসাথে খাওয়া দাওয়া, গোল হয়ে ওদের ঘিরে বসে গল্পগুজব। এক সময় সরদার হাঁকলেন, “তামাকু লাও” মনে হলো সরদার তামাক চাইছেন। তার কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে পানিতে তলিয়ে গেলো ওরা পাঁচজন….. আরও কিছুদূর যাওয়ার পর তামাকের বস্তাগুলো চলে এলো এ নৌকায়। আর তামাক কারবারীদের নৌকাটাও পানির নিচে ওদের সাথী হলো….

কদিন পর তামাক বোঝাই নৌকা নারায়নগজ্ঞ ঘাটে ভিড়লো, সেখানে তামাকের বস্তাগুলো বিক্রি করে নৌকার যাত্রীরা যার যার বাড়ির পথ ধরলো……

রুমে তখন নিরাবতা গ্রাস করলো,, এসব শুনে শ্বাস ছাড়তেও ভুলে গেছে সকলে,, কিছুক্ষণ চুপ থেকে লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে ম্যাজিষ্ট্রেট শুধু বললেন, বাহঃ চমৎকার……..
(চলবে)

লেখক : হাসান হাফিজুর রহমান, আইন প্রশিক্ষক- বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি।