মধ্যরাতে ‘স্বাধীনতা’ : ছিটমহলে ৬৮টি মোম জ্বালানো হলো একসঙ্গে


397 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মধ্যরাতে ‘স্বাধীনতা’ : ছিটমহলে ৬৮টি মোম জ্বালানো হলো একসঙ্গে
আগস্ট ১, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
৬৮টি মোম জ্বালানো হলো একসঙ্গে। ঠিক রাত ১২টা ১ মিনিটে জ্বলল মোমগুলো। উঠল মুক্তির লাল-সবুজ পতাকা। বাংলাদেশ ও ভারত দুই অংশেই বিলীন হয়ে গেল ছিটমহল নামের বন্দিশালাগুলো। মুক্তি মিলল এসব বন্দিশালায় দুঃসহ জীবন কাটানো প্রায় অর্ধলাখ মানুষের। সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর বাসিন্দারা এই ৬৮টি মোমবাতিকে তাদের ৬৮টি বছরের শোষণ-বঞ্চনার প্রতীক হিসেবে নিয়েছেন। তারা মনে করছেন, এই মোমগুলো জ্বলে-পুড়ে শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে নাগরিকত্বহীন পরাধীন দিনযাপনের ৬৮ বছরের গ্গ্নানি। সেই গ্গ্নানি মুছে যাওয়ার আনন্দে আত্মহারা মানুষ মশাল মিছিল নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন পুরো ছিটমহল এলাকা। ঝিরঝির বৃষ্টি, চাপা স্বরে মেঘের মৃদু গর্জন, ভেজা হাওয়া_ সব কিছু ছাপিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শতপ্রাণের আলোর মিছিল। ছিটমহলবাসী জাতিসত্তার স্বীকৃতি পাওয়ায় পৃথক অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বার্তায় বলেন, ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির সুফল হিসেবেই ছিটমহলের মানুষ তাদের নাগরিকত্বের অধিকার অর্জন করল। এই অধিকার অর্জনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের অন্য নাগরিকদের সঙ্গে এখন আর ছিটমহলের মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়নের

জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সরকার সে ধরনের ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে।

মোম জ্বলল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে বাংলাদেশে যুক্ত হওয়া ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায়। এখানে উপস্থিত ছিলেন ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের শীর্ষ নেতারা। সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বললেন, বাংলাদেশে যুক্ত হওয়া ভারতীয় ১১১টি ছিটমহলের সর্বত্রই মোম প্রজ্বালনের এই অনুষ্ঠান আয়োজনে অংশ নিয়েছেন বাসিন্দারা।
সরেজমিন দাসিয়ারছড়ায় দেখা গেল স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছিটের নারী, শিশু সবাই অংশ নিলেন মোম জ্বালানোয়। দাসিয়ারছড়ার কালিরহাটে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় মোম জ্বালানোর মূল অনুষ্ঠান হলেও একই সময়ে ছিটের পাড়া-মহল্লা, এমনকি অনেক বাড়িতেও ৬৮টি করে মোম জ্বালানো হয়।

দাসিয়ারছড়ায় অবশ্য গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই ‘স্বাধীনতা দিবস’ উদযাপনের নানা আয়োজন ছিল। বেলা ১১টায় ছিটমহলের মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের নর-নারীদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয়েছিল বিশেষ প্রার্থনার। পরে আবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদে মসজিদে করা হয় বিশেষ মোনাজাত।

এরপর থেকে শুরু হয় নানা কর্মসূচি। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কালিরহাট বাজার ঘেঁষে প্রবাহিত নীলকুমর নদীর দু’ধারে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় নৌকাবাইচ। ছোট এই নদীতে পাশাপাশি দুটি নৌকা চালানোর উপায় নেই। তাই তো একটি নৌকায় শতাধিক মানুষ চড়ে হৈ-হৈ করে দাঁড় টেনে নদীর এক মাথা থেকে আরেক মাথা দাপিয়ে বেড়িয়ে বাইচের আনন্দ উপভোগ করেছেন।
বিকেল ৪টা থেকে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা দলে দলে মিছিল করে জড়ো হতে থাকেন কালিরহাট বাজারে। ‘জয় বাংলা’, ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি_ ছিটবাসীর মুক্তি’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। কালিরহাট বাজারে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। যদিও রাতে মোম প্রজ্বালনের মূল অনুষ্ঠান শুরু হতে তখনও অনেকটা সময় বাকি।

ছোট এই বাজারে হাতেগোনা কয়েকটি দোকান। খাবারের দোকান মাত্র ৩টি। খাবার বলতে বিস্কুট, কলা আর চা। বিকেল ৪টা বাজতে না বাজতে সব শেষ। এরকম হবে তারা ভাবতে পারেননি। তবে মোফাজ্জল নামের চায়ের দোকানি বুদ্ধি করে ৫ কেজি চালের ভাত, দুটি ব্রয়লার মুরগি, খাসির মাংস, মসুর ডাল, পুঁইশাক আর ডিম সিদ্ধ করে দোকানে এনে রেখেছিলেন। তা-ও এক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ। ছিটমহলের এই বাজারে ভাত-মাংস-ডাল বিক্রি হবে কোনোদিন কেউ ভাবেননি।
কত আয়োজন চারদিকে। কালিরহাট মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠের পাশে তৈরি করা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বেদি। ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন মাহমুদ সকাল থেকে নিজে দাঁড়িয়ে ইট-সিমেন্টের গাঁথুনিতে গড়ে তোলা সেই বেদি নির্মাণের কাজ তদারক করেছেন। এর মাত্র ৫০ মিটার দূরে হাফেজিয়া মাদ্রাসার মাঠে আয়োজন করা হয় সমাবেশের। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে মইনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। এর থেকে আরও ৫০ মিটার দূরে সদ্য প্রতিষ্ঠিত দাখিল মাদ্রাসা মাঠে নির্মাণ করা হয় আরেকটি মঞ্চ। মঞ্চের সামনে বিশাল প্যান্ডেল। এই মঞ্চে আজ শনিবার সকাল ৯টা থেকে নানা অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এখানে লাঠিখেলা, ভাওয়াইয়াসহ জারিগান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। দুপুর ১২টার দিকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির ভারত ইউনিটের সহসম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত।

পঞ্চগড়ের গারাতি ছিটমহল থেকে আমিনুল হক ও সফিকুল আলম জানান, সেখানে গতকাল দিনভর কেউ মাঠসজ্জা, কেউ মঞ্চ তৈরি, কেউ আবার খেলাধুলাসহ নানা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পঞ্চগড় সদর উপজেলার ভেতরে ভারতীয় গারাতি ছিটমহলের ফোরকানিয়া মাদ্রাসা মাঠে সূর্য মাথার ওপর আসার ঠিক আগ দিয়ে যেন হাজার হাজার হাতের ছোঁয়ায় মুহূর্তে সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেল। গারাতি ছিটমহলের সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী, লোকসংখ্যা হচ্ছে দুই হাজার ১২৫ জন এবং জমির পরিমাণ এক হাজার ৩০০ একর।

ছিটমহলের চেয়ারম্যান মো. মফিজার রহমান জানালেন, জুমার নামাজের পর থেকে মাদ্রাসা মাঠে শুরু হয় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুনাট্যসহ নানা কর্মসূচি। ছিটের শিশুরা মঞ্চস্থ করে নাটক ‘মানবতার মহাকবি’।
অনুষ্ঠানস্থলে কথা হয় উল্লসিত দুই নারীর সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যেতেই তারাই আগ বাড়িয়ে বলতে থাকলেন, ‘কাইল থাকি হামার আর ভয় নাই। এলা কায় কুনঠে আগুন লাগায় দেখিমো। পাঁচ বছর আগে হামার বাড়িঘর জ্বলায় দিছে। এইটার বিচার কাহো করে নাই।’ তারা দু’জন হচ্ছেন ছিটমহলের বেঞ্চুপাড়ার সাহেরা বেগম ও লায়লা বানু। তারা দু’জনই মধ্যবয়সী। তাদের ধারণা, আগে তাদের ওপর যে অন্যায়-অত্যাচার হয়েছে তা আর কখনও হবে না। কারণ এখন তারা খাঁটি বাংলাদেশি।

লালমনিরহাট থেকে সংবাদদাতা ফরহাদ হোসেন সুমন জানান, ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা অতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গেই লালমনিরহাটের ছিটমহলগুলোর বাড়িতে বাড়িতে জ্বালানো হলো মোমের আলো। ফলে বাড়িগুলো যেন হয়ে ওঠে তারকাখচিত। গতকাল দুপুরে সরেজমিন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার অভ্যন্তরে সদ্যবিলুপ্ত ভারতীয় ছিটমহল বাঁশকাটায় গিয়ে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ছিটবাসীকে আনন্দ করতে দেখা যায়। ছিটের আবালবৃদ্ধ বাংলাদেশের পতাকা হাতে আনন্দে বিজয় চিহ্ন প্রদর্শন করছেন। রোদ কমলেই শুরু হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও হাডুডু। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় ছিল লোকসঙ্গীত। এসব আয়োজন হয় জুমার নামাজের পরপরই। আরও ছিল শিশু-কিশোরদের নিয়ে নানা আয়োজন। পরে বিকেলে হাতীবান্ধা উপজেলার উত্তর গোঁতামারী ছিটমহলে দেখা যায় চারটি কোমল পানির বোতল সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে ছিটমহলের মতোই। একটি করে চারটি কাঠি রয়েছে। কাঠির মাথায় রশি বাঁধা। রশির শেষ প্রান্তে একটি রিং ঝুলানো। চারজন খেলোয়াড় চারটি কাঠি হাতে সম্মুখে দাঁড়িয়ে। পানির বোতলে রিংটি যিনি আগে ভরাতে পারবেন তিনি পাবেন বিজয়ীর পুরস্কার। তারা অভিনব এ খেলার নাম দিয়েছেন ছিটখেলা।
এ ছাড়াও স্থানীয়দের উদ্যোগে এ ছিটমহলে আয়োজন করা হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি। যাতে প্রতিযোগিতা করছে ছিটমহল বনাম বাংলাদেশ দল। ছিল লাঠিখেলার প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যায় বসে জারি-সারি আর ভাওয়াইয়া গানের আসর। এখানে দীর্ঘদিনের বন্দি জীবনের মুক্তির আনন্দে বিজয়ের উল্লাসে এ ছিটমহলের মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহাবুবুর রহমানসহ এলাকার সুধীজন।
নীলফামারী প্রতিনিধি অভিজিৎ রায় জানান, দুপুরে জেলার খানকিকারিজা ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায়, উৎসবে মেতেছে ছিটমহলবাসী। দিনভর চলে নানা আয়োজন। রাত ১২টার পর ৬৮টি মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়। আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ছিটমহলে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক জাকির হোসেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন।

সূত্র- সমকাল অনলাইন