মন্দকাজের সমালোচনা আর ভালো কাজের সমর্থন চাইলেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক


139 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মন্দকাজের সমালোচনা আর ভালো কাজের সমর্থন চাইলেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক
অক্টোবর ৯, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

স্টাফ রিপোর্টার :
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক হিসেবে কার্যকালের এক বছর পূর্ণ হওয়ায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন এস এম মোস্তফা কামাল। বুধবার বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসক তার সম্মেলন কক্ষে এ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল তার স্বহস্তে লিখিত বক্তব্যে বলেন, ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর আমি জেলা প্রশাসক হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেছিলাম। দায়িত্বভার গ্রহণের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, সুধজিনসহ জেলা উপজেলায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে মতবিনিময় ও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলাম। মতবিনিময় করে সাতক্ষীরা জেলার সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেছিলেন সাতক্ষীরার সুধীজন। মতবিনিময়কালে আমি বলেছিলাম সকল ভালো কাজে সমর্থন ও সহযোগিতা যেমন চাই, তেমনি যে সকল কাজে সমালোচনার যোগ্য সরকারি নীতিমালা পরিপন্থী জনস্বার্থ পরিপন্থী এবং অন্যায় ও অনৈতিক সে বিষয়ে আপনাদের কলমের কালি আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করলে আমি তা মাথা পেতে নেব। এক বছর পূর্তিতে আমি সে কথা পুনর্ব্যক্ত করছি।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় রয়েছে প্র্কৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট বেশ কিছু সমস্যা। এর মধ্যে অন্যতম জলাবদ্ধতা, নদী ও খাল ভরাট, খাল দূষণ, সরকারি খাস জমি আত্মসাৎ, মাদক, জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ, সুপেয় পানির অভাব, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ময়লা আবর্জনা ডাম্পিং স্টেশনের অপ্রতুলতা, বাসটার্মিনালের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, ট্রাক স্ট্যান্ডের অভার, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের ক্ষতিকর বর্জ্য দ্রুত ডাম্পিংয়ের অপর্যাপ্ততা, শহরের বাড়িঘর এবং ব্যবসা কেন্দ্রের ময়লা আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে রাখার মানসিকতার অভাব, ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে তদারকির অভাব, ভোমরা স্থল বন্দরে অযাচিত কার্যক্রম, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার সংকটসহ উল্লেখ করার মতো নানাবিধ সমস্যা।

এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, সমস্যার বিপরীতে সাতক্ষীরা জেলায় রয়েছে অপার সম্ভাবনা। পৃথিবীর অন্যতম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট রয়েল বেঙ্গর টাইগারের বাসস্থান সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক সমীক্ষা শেষ করেছে। জমির ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তেমনি প্রকৃতি প্রেমিক ভ্রমণ পিপাসু মানুষেরা সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। সাতক্ষীরার বাগদা দেশে ও বিদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সুস্বাদু হিমসাগর, ল্যাংড়া আম আজ বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। রাজধানী ঢাকায় দেখেছি মানুষ সাতক্ষীরার আম খোঁজে। আমকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার অনেক সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন উদ্যোক্তা এবং মানসিকতা। সাতক্ষীরার কুল ও পেয়ারা এখন বাংলাদেশের একটি ব্রান্ড। সকলে এর প্রচার ও প্রসারে এগিয়ে আসতে হবে। সাদা মাছের জন্য ইতোমধ্যে সাতক্ষীরা জেলাবাসী তথা মৎস্যচাষীরা মাছ প্রিয় বাঙালির কাছে সমাদৃত।

জেলা প্রশাসক বলেন, নদ-নদী খননের জন্য এরই মধ্যে সরকার ৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে জলবায়ু ট্রাস্টের বরাদ্দ পাইপ লাইনে আছে। খাল খনন এবং জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রয়োজন সমন্বিত এবং সমীক্ষা নির্ভর কার্যক্রম। সে পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। অচিরেই তা দেখতে পাবেন। ঢাকার সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগ দ্রুত ও পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ভোমরা থেকে খুলনা পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সেটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহিত হয়েছে। প্রাণ সায়ের খালের স্লুইস গেট অপসারণের প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহিত হয়েছে। এবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সাতক্ষীরা থেকে উত্থাপিত সকল প্রস্তাব গৃহিত হয়েছে। অচিরেই প্রেস রিলিজের মাধ্যমে তা জানানো হবে।

তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এবং এসডিজি কর্নার স্থাপন করেছি। জেলাবাসির সমস্যা ও সম্ভাবনা জানার জন্য গণশুণানীকে গণমুখী ও কার্যকর করার পদক্ষেপ নিয়েছি। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ করতে আবৃত্তি উৎসব, বইমেলা, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং পাবলিক লাইব্রেরিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করেছি। ক্রীড়াঙ্গনকে সমথৃন দিয়েছি। উদ্যোগ নিয়ে চালু করেছি ডিসি কাপ টিটুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সমন্বিত উপায়ে দুর্যোগকালীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সকলকে নিয়ে কাজ করেছি।

সাতক্ষীরার ৪জন সংসদ সদস্যসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী ২০২০ সালে। এই বছরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশ ২০২০ সালে মুজিব বর্ষ এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালন করবে। এখনই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা সমন্বিতভাবে ক্লিন সাতক্ষীরা গ্রিন সাতক্ষীরা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলার পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য সাতক্ষীরা গড়ে তুলতে পারলে তা হবে ‘মুজিব বর্ষ’ পালনের সত্যিকারের সার্থকতা এবং যা আমাদের ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করেছি। মাদক, জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ, ধর্মীয় সন্ত্রাসকে রুখতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রাণ সায়ের খালের প্রাণ ফিরিয়ে এনে এর সৌন্দর্য্য বর্ধনে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যারা ব্যবসায়ী রয়েছেন তাদের ক্ষতি না করে স্থায়ী পুনর্বাসনের মাধ্যমে উভয় পাড়কে উন্মুক্ত করে শহরকে সম্প্রসারিত করার যে উদ্যোগ আমরা নিয়েছি তা আলোচনার ভিত্তিতে এগিয়ে নিয়ে যাবো। আমি ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত না হতে অনুরোধ করছি। একই সাথে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের সতর্ক করে বলতে চাই ব্যবসায়ীদের ভুল পথে নিজের স্বার্থে পরিচালনা করবেন না। আমি এ শহরে বাস করবো না, আপনারাই করবেন। একে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আপনাদেরই, আমি আপনাদের সেবকমাত্র।

পরে জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল সাতক্ষীরার বাল্যবিবাহ, যানজট নিরসন, শিশুপার্ক স্থাপন, শিল্পকলা একাডেমির সমস্যার সমাধান, সরকারি স্কুলের শিক্ষার মানোন্নয়ন, ভিক্ষুকমুক্ত সাতক্ষীরা, পাবলিক লাইব্রেরির সমস্যার সমাধান, ডাক্তার সংকটসহ আগামী এক বছরের পরিকল্পনা সংক্রান্ত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক হুসেইন শওকত, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বদিউজ্জামান, সাতক্ষীরা জেলা তথ্য অফিসার মোজাম্মেল হোসেন প্রমুখ।
সাংবাদিকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু আহমেদ, সাবেক সভাপতি সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ আহমেদ বাপী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, সাংবাদিক আবুল কাশেম ও সাংবাদিক ফারুক মাহবুবুর রহমান।