মর্মন্তুদ স্মৃতি মুছবেন কীভাবে নবদম্পতি


118 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মর্মন্তুদ স্মৃতি মুছবেন কীভাবে নবদম্পতি
আগস্ট ১৭, ২০২২ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনা

অনলাইন ডেস্ক ::

মধ্যদুপুরে তেজি রোদ। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গের দেয়াল ঘেঁষে ‘পাথর’ হয়ে বসে আছেন নবদম্পতি রিয়া মনি ও রেজাউল করিম হৃদয়। সামনের রেইনট্রির তলায় শোকাতুর আরও অনেক মুখ। কারোর রোদন গগনবিদারী। কারোর চোখের আঙিনায় শব্দহীন জলধারা। ঢাকার উত্তরায় সোমবারের মর্মস্পর্শী গার্ডার দুর্ঘটনায় পাঁচ স্বজনকে হারানোর পর লাশের জন্য লম্বা সময়ের অপেক্ষা সবার।

মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় রিয়া হারিয়েছেন তাঁর মা, খালা, খালাতো ভাইবোনসহ চারজনকে, আর হৃদয় বিদায় জানিয়েছেন বাবাকে। এই দম্পতি কে কাকে সান্ত্বনা দেবেন। একই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দরজা দেখে অলৌকিকভাবে ফেরেন তাঁরা! তবে আহত হয়েছেন খানিকটা। হাসপাতালের বিছানা থেকে স্বজনদের শেষবার দেখতে গতকাল সরাসরি চলে আসেন মর্গে। স্বজনদের হারিয়ে রিয়ার কষ্টের অভিব্যক্তি- ‘মায়ের সঙ্গে শেষ কথাটাও বলা হলো না। গার্ডার পড়ে প্রাইভেটকার যখন পিষ্ট, তখন আমার হাতের ওপর ঢলে পড়েন মা। তাঁর নাক-মুখ দিয়ে ঝরছিল রক্ত। কথাও বের হচ্ছিল না।

চোখ দুটিই জানান দিচ্ছিল তীব্র যন্ত্রণায় কাতর তিনি। এর পরই নিস্তেজ। আর কিছু মনে নেই।’ রিয়া বললেন, ‘মাকে বাঁচাতে পারলাম না এই আক্ষেপ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। কে সামলাবে আমাদের পরিবার। কত কষ্ট করে মা আমাদের বড় করেছেন। অল্প সময়ে শ্বশুরও আমাকে আপন করে নিয়েছেন। নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেলেন। শ্বশুরকেও হারালাম।’

রিয়ার স্বামী হৃদয় বলেন, ‘সবাই প্রাইভেটকারের মধ্যে অনেক মজা করছিল। শিশুরাও আনন্দ পাচ্ছিল। উত্তরার জসীম উদ্‌দীন রোড পার হওয়ার পর পরই হঠাৎ গার্ডার প্রাইভেটকারের ওপর আছড়ে পড়ে। পরে স্থানীয় লোকজন রিয়া ও আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। মানুষের জীবন নিয়ে কেন এই হেলাফেলা। কে নেবে এর দায়। আমাদের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল না। দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’

সোমবার বিকেলে ক্রেন দিয়ে বিআরটি প্রকল্পের একটি গার্ডার তোলার সময় সেটি প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। গাড়িটিতে ছিলেন সাতজন। এর মধ্যে পাঁচজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁরা হলেন- হৃদয়ের বাবা নুরুল ইসলাম রুবেল (মামলায় আইয়ুব আলী), তাঁর শাশুড়ি ফাহিমা খাতুন, ফাহিমার বোন ঝরনা আক্তার এবং ঝরনার দুই সন্তান জান্নাত ও জাকারিয়া। শনিবার রিয়াদের আশুলিয়ার বাসায় বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে নববধূকে বরের বাড়িতে তুলে আনা হয়। বউভাত উপলক্ষে কনেপক্ষের লোকজন সোমবার খিলক্ষেতের কাওলায় হৃদয়ের বাসায় যান। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে আবার নতুন বউকে গাড়িতে করে আশুলিয়ায় তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছিলেন তাঁর শ্বশুরপক্ষ।

গতকাল মর্গে গেলে স্বজনহারাদের কান্নার পাশাপাশি রুবেলের লাশ নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু হয়। পাঁচজন নারী সেখানে উপস্থিত হয়ে রুবেলকে তাঁদের স্বামী বলে দাবি করেন। মারা যাওয়ার পর বেরিয়ে আসে রুবেল মোট সাতটি বিয়ে করেছেন। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। পঞ্চম স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মামলা চলছে। তাঁদের কারও কারও সঙ্গে সন্তানরাও এসেছেন। ওই নারীদের একজন আরেকজনের বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে দাবি করন। রুবেল স্ত্রীদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন।

রুবেলের স্ত্রী দাবি করে হাসপাতালে আসা নারীরা হলেন- নার্গিস বেগম, রেহেনা বেগম, শাহিদা বেগম, সালমা আক্তার পুতুল ও তাসলিমা আক্তার লতা। এই পাঁচজন মর্গের সামনে এসে লাশ দাবি করেন।
মর্গের সামনেই শাহিদা জানান, তাঁর বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে। ১৯৯৯ সালে পারিবারিকভাবে রুবেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর ঘরে কলেজপড়ূয়া এক মেয়ে রয়েছে।

শাহিদা আরও বলেন, রুবেলের অন্য কোনো সংসার আছে তা আমার জানা ছিল না। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন রুবেল। শনিবার রুবেল তাঁকে জানান, ঢাকায় এক বন্ধুর ছেলের বিয়েতে নিজের গাড়ি নিয়ে যাবেন। বর-কনে তাঁর গাড়ি ব্যবহার করবেন। ওই গাড়ি এক দিন ব্যবহারের জন্য রুবেলকে ৪ হাজার টাকা দেবেন বন্ধু। নিজের কয়েক দিনের পকেট খরচের টাকা হয়ে যাবে। দুর্ঘটনার পর জানতে পারলাম রুবেল তাঁর নিজের ছেলের বিয়েতে গিয়েছিলেন। এই বিয়ের কথা কখনও তিনি জানাননি।
শাহিদার মেয়ে রত্না বলেন, বাবার সম্পদের জন্য অনেকে স্ত্রী হিসেবে দাবি করছেন। তাঁর এতগুলো স্ত্রীর কথা আমরা আগে জানতাম না, আজকে এসে জেনেছি।

তাসলিমা আক্তার লতা বলেন, ২০১৭ সালে রুবেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। তাঁর ঘরে কোনো সন্তান নেই। গাজীপুরে তাঁর বাসায় রুবেল থাকতেন। মাঝেমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে বাইরে যেতেন। আবার বাড়ি ফিরতেন।

সালমা আক্তার পুতুলের দাবি, তাঁর বাসা মিরপুর ১০ নম্বরে। রুবেলকে বিয়ে করার কিছুদিন পরই তিনি টের পান আরও একাধিক স্ত্রী রয়েছে তাঁর। এরপর স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। ওই মামলায় হাজিরার সর্বশেষ দিন ছিল ১১ আগস্ট। পুরান ঢাকায় নিম্ন আদালতে ওই দিন সর্বশেষ রুবেলের সঙ্গে তাঁর দেখা যায়। মামলা তুলে নিতে তিনি পুতুলকে অনুরোধ করেন।

রুবেলের আরেক সন্তান দাবিদার নিপা আক্তার বলেন, সন্তান জন্মের সময় প্রথম স্ত্রী টিপুকে হারানোর পর রুবেল তাঁর মা নার্গিসকে বিয়ে করেন। নিপা তাঁর বাবার প্রথম সন্তান। পরে তাঁর বাবা আরও ৬-৭টি বিয়ে করেছেন এটা তিনি জানতেন না। নার্গিসের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর বাবার সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ তাঁর হতো না। সর্বশেষ মাস দুয়েক আগে বাবা ফোন করে তাঁর খোঁজ নেন।

মর্গে অপেক্ষা করছিলেন রুবেলের ভাই ইয়াহিয়া। তিনি জানান, তাঁরা ৯ ভাই, দুই বোন। মেহেরপুরের গ্রামের বাড়িতে রুবেল খুব একটা যেতেন না। তবে জানতেন ভাই ঢাকায় দুটি বিয়ে করেছেন। মর্গে এসে এতগুলো বিয়ের কথা শুনে তিনি রীতিমতো বিস্মিত।
ইয়াহিয়া জানান, তাঁর ভাই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যবসা করতেন। কখনও জুটের কারবার, জমি বেচাকেনা, আবার কখনও বিদেশে লোক পাঠানো।

ময়নাতদন্ত শেষে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো জটিলতা ছাড়াই বিকেল ৫টার দিকে রুবেলের লাশ তাঁর ভাইয়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। স্ত্রী দাবিদার সবার সঙ্গে সমঝোতা করে গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরে লাশ নেওয়া হয়। অন্য চারজনের লাশ নেওয়া হয় তাঁদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরে।

মামলা :পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনায় মামলা হয়েছে। সোমবার রাতে নিহত ফাহিমা আক্তার ও ঝরনা আক্তারের ভাই আফরান মণ্ডল বাবু উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন। অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটায় ক্রেনের চালক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অচেনা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এই মামলার প্রতিবেদন ২২ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়ার দিন ধার্য করেছেন আদালত।

#