মহাত্মা গান্ধী,মাদার তেরেসা,অতীশ দীপঙ্কর,শেরে বাংলা,নেলসন ম্যান্ডেলা,ভাসানীর নামে চলছে জমজমাট পদক বানিজ্য !


2678 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মহাত্মা গান্ধী,মাদার তেরেসা,অতীশ দীপঙ্কর,শেরে বাংলা,নেলসন ম্যান্ডেলা,ভাসানীর নামে চলছে জমজমাট পদক বানিজ্য !
আগস্ট ২১, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক :
সাতক্ষীরায় টাকার বিনিময়ে সম্মানের পদক কেনার হিড়িক পড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বর,এনজিও পরিচালক, কতিপয় আইনজীবী, রাজনীতিবীদসহ জেলার খ্যাতি প্রিয় মানুষ ঢাকা থেকে টাকা দিয়ে কিনে আনছেন কথিত সম্মানসূচক নানা পদক,ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট। মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা, অতীশ দীপঙ্কর, ইন্দিরা গান্ধী, শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তির নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে জমজমাট এ পদক বানিজ্য।

ঢাকার ভূইফোঁড় কিছু সংগঠন চিঠি দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য কতিপয় ব্যক্তির নিকট থেকে এসব পদক বাণিজ্যের প্রস্তাবনা করছে। আর সম্মানের কাঙ্গাল সাতক্ষীরার কতিপয় ব্যক্তি রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার জন্য দেদারসে টাকা দিয়ে কিনছেন শান্তি, দেশরত্ম, মানবাধিকারসহ বাহারি নামের পদক ও ক্রেস্ট। এলাকায় এসব ব্যক্তিদের প্রচারণা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় পদককেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে কেনা পদক পাওয়ার পর তা বহুল প্রচারের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় নিউজ করে নিজেদেরকে জাহির করছে নানা নামে, খ্যাতিতে। আর এসব পদক যেসব অতিথিরা খ্যাতি প্রিয় ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিচ্ছে তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, লোকজনকে সম্মানে ভূষিত করার নামে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে পদক বাণিজ্য চালিয়ে আসছে ঢাকার একাধিক চক্র। চক্রের সদস্যরা পদক দিয়ে সম্মানে ভূষিত করার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। রাজধানী কেন্দ্রীক এদের তৎপরতা থাকলেও নেটওয়ার্ক রয়েছে দেশজুড়ে। দেশের গ্রামগঞ্জ থেকেও লোকজনকে ‘বিখ্যাত ব্যক্তি করে দেয়ার নামে’ ঢাকায় এনে পদক দেয়া হচ্ছে হরহামেশাই। জেলা, উপজেলা, ইউয়িনয় ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সমাজ সেবক, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার, সংস্কৃতি, শিক্ষানুরাগী, সাহিত্য, ঔপন্যাসিক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে ‘শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত’ এমন দাবি করে কথিত ও ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে আয়োজকরা পদক দিয়ে আসছে।

টাকা দিয়ে কথিত পদক কিনে ‘ধন্য হচ্ছেন অযোগ্য ব্যক্তিরা’। তবে এ ক্ষেত্রে সাতক্ষীরা জেলা দেশের সব জেলা থেকে বেশ  এগিয়ে । চেয়ারম্যান, মেম্বর, এনজিও পরিচালক ও কতিপয় আইনজীবী, রাজনীতিকরা টাকার দিয়ে এই পদক কিনছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, কথিত ও ভুঁইফোড় একাধিক সংগঠনের ব্যানারে প্রতি মাসে কয়েক দফায় বিভিন্ন প্রকার ‘পদক’ দিচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন নামে ও ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে আয়োজন করছে প্রয়ত বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি, যুদ্ধিজীবীসহ জাতীয় নেতাদের নামে। পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে কোন মন্ত্রী, এমপি, বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা ভাষা সৈনিককে অতিথি হিসেবে রাখা হয়। ‘ভিআইপিদের’ হাত  থেকে পদক দেয়া হবে এবং এই খবর গণমাধ্যমে প্রচার পাবে এমন বলে যাদের এসব পদক দেয়া হয় তাদের কাছ থেকে ওই সংগঠনের নেতারা মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, স্বর্ণপদক দিতে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, রৌপ্যপদক দিতে ২০ থেকে ৩০ হাজার আর ক্রেস্ট দেয়া হলে তার জন্য আরও ১০ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। তবে কথিত স্বর্ণপদকে এক রতি, রৌপ্য পদকে ৪ আনা রুপা দেয়া হয়। আর ক্রেস্ট তৈরিতে লাগে ৫ থেকে ৮’শ টাকা। বাকি পুরোটাই যায় আয়োজকদের পকেটে। অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকার পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে  সোনা বা রোপার পানি দিয়ে এসব পদক ধুয়ে পালিশ করে খ্যাতি প্রিয় ব্যক্তিদের হাতে তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। সাথে একটি সার্টিফিকেট দিতে তারা ভূল করছে না।

অনুসন্ধানে ভুঁইফোড় পদক কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, অনেক ব্যক্তি আছে যাদের সম্পদ থাকলেও সুখ্যাতি কম। তারা সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও বিশিষ্ট জনদের হাত থেকে পদক নিয়ে ‘গর্বিত’ হন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে অতিথি নির্বাচন করে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভেন্যু হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরি হলরুম, মনি সিংহ ট্রাস্ট মিলনায়তন, জাতীয় প্রেসক্লাব অথবা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির হলরুম, জাতীয় জাদুঘরের হলরুমসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অডিটরিয়াম ভাড়া করা হয়। ছাপানো হয় আমন্ত্রণপত্র। পদক বিতরণের আগের দিন সব গণমাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান এসাইনমেন্ট চাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ‘অতিথির’ নাম জেনে গণমাধ্যম থেকে ওই খবর সংগ্রহ করতে এসাইনমেন্টও দেয়া হয়। তবে কিছু সময়ে ক্যামেরা ভাড়া করেও পদক বিতরণের কাজ সেরে নেয় তারা।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ঢাকার মানবাধিকার সংস্থা, হিউম্যান রাইটস মুভমেন্ট, আলোকিত বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠন প্রথমে কোন এলাকার ১০/১২ জন উঠতি পয়সাওয়ালা টার্গেট করে চিঠি আহবান করে। সেখানে সমাজসেবায় অবদান, মানবতার সেবায় কাজ করার কথা বলে জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক দেওয়ার কথা বলে। চিঠিতে খরচ বাবদ আর্থিক সহায়তাও চাওয়া হয়। বলা হয় কোথায়, কোন ব্যক্তির হাত দিয়ে পদক প্রদান করা হবে। সম্মানের কাঙ্গাল কোন ব্যক্তি তাদের প্রস্তবনায় রাজি হলেই দেওয়া হয় পদক।

সাতক্ষীরায়ও পদক নিয়ে চলছে প্রচার বাণিজ্য। কথিত এসব পদক পাওয়া একাধিক ব্যক্তি নিজেকে স্বগর্ভে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। জেলা পর্যায়ের একজন রাজনীতিবীদ দেশরত্ম পদক পাওয়ার পরে যশোর বিমান বন্দর থেকে মটরসাইকেল শোভাযাত্রা করে পাটকেলঘাটায় নিজ এলাকায় যায়। কয়েকজন চেয়ারম্যান ও মেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পদক পাওয়ার বিষয়ে জনগণকে অবহিতও করেন।

পদক গ্রহণ করার পরে একজন সনামধন্য এনজিও নির্বাহী পরিচালক তার নিজের এনজিও’র কর্মীদের নিকট থেকে বিভিন্ন সংবর্ধনাও নেন। তিনি সাতক্ষীরা ও তালা প্রেসক্লাবে নিজের তৈরী করা ব্যানার নিয়ে এসে সংবর্ধনা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকদের আপত্তি , তোপেরমুখে তা পন্ড হয়ে যায়।

তালার সাস এর (এনজিও) পরিচালক ইমান আলী সম্প্রতি নেলসন ম্যান্ডেলা ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক পদকে ভূষিত হয়েছেন। খ্যাতি প্রিয় ইমান আলী তার ওই পদকের প্রচার পেতে সাতক্ষীরার প্রেসক্লাবে হাজির হলে তিনি সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন।

পদক পাওয়া দেবহাটার সখিপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ফারুখ হোসেন রতন বলেন, আমাকে গত রমজানে নবাব সিরাজ দ্দৌলা পদক দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমি যেতে না পারায় এবার মানবাধিকার পদক দিয়েছে। দেবহাটার ইউপি চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, আমাকে প্রথমে পদকের জন্য চিঠি দিয়েছিলো। তারপর সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে সমাজসেবায় অবদানের জন্য পদক গ্রহণ করি।

পাটকেলঘাটার এক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, পদক দুটো পেয়েছি। কোন অর্থিক বিষয় ছিলো না——তবে বোঝেন তো। তারা আমন্ত্রণ জানালো। আমি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে সম্মাননা পদক গ্রহণ করলাম। তবে কোন প্রক্রিয়ায় পদক প্রাপ্তদের নির্বাচন করা হয় তা  জানাতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি চেয়ারম্যান ও এক এনজিও পরিচালক ভয়েস অব সাতক্ষীরাকে জানান, ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করলেই এসব পদক পাওয়া যায়। আপনি কোন বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তির নামে এবং কার হাত থেকে পদক নেবেন তার উপর নির্ভর করে কত টাকা লাগবে। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ করলেও এসব পদক পাওয়া সম্ভব।