মহামারিতে ৪ গুণ বেড়েছে সাইবার হামলা


122 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মহামারিতে ৪ গুণ বেড়েছে সাইবার হামলা
জুলাই ২৪, ২০২১ প্রবাস ভাবনা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

আর্থিক ক্ষতি পৌঁছেছে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে

এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ব্যাংকে হামলা বৃদ্ধি

অনলাইন ডেস্ক ::

করোনাভাইরাসের মহামারির এক বছরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে র‌্যানসমওয়্যারের (জিম্মিকারী সফটওয়্যার) হামলা আগের তুলনায় প্রায় ৪০০ শতাংশ বা চার গুণ বেড়েছে। এ সময়ে হামলার শিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণও দ্বিগুণ বেড়ে ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘এক্সপার্ট ইনসাইট’ এ খবর দিয়েছে।

সংস্থাটি ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে র‌্যানসমওয়্যার হামলা সংক্রান্ত সরকারি ও বেসরকারি তথ্য বিশ্নেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। র‌্যানসমওয়্যারকে প্রায় এক দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ম্যালওয়্যার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ম্যালওয়্যার একবার কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট ডিভাইসে প্রবেশ করলে তার পুরো অপারেটিং সিস্টেম জিম্মি করে ফেলে। এরপর হামলাকারীরা ডিভাইসটি ফের চালুর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে। এ কারণে এ ধরনের হামলাকে ‘সাইবার হাইজ্যাকিং (সাইবার ছিনতাই)’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এটিই বর্তমানে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক ‘সাইবার হামলা’ হিসেবে বিবেচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে ওয়াশিংটন ডিসি পুলিশের সার্ভারসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২০টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান র‌্যানসমওয়্যার হামলার কবলে পড়ে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্সেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দফায় দফায় র‌্যানসমওয়্যার হামলার কবলে পড়ে। ‘এক্সপার্ট ইনসাইট’-এর চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্ভার লক্ষ্য করে হামলা বেড়েছে।

অন্যদিকে, হ্যাকিং সংক্রান্ত তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘হ্যাকারওয়ান’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারির এক বছরে সাইবার হামলার ঝুঁকি সম্পর্কিত হ্যাকারদের তথ্য প্রদানের হার আগের বছরের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। এর অর্থ, মহামারির সময়ে হ্যাকাররা আগের বছরের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি সময় ব্যয় করেছে বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের জন্য।

এ প্রতিবেদনটিও ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্নেষণ করে চলতি জুলাই মাসে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার হামলার যতগুলো ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বেড়েছে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ‘মিসকনফিগারেশন’ বা ভুল বিন্যাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তৈরির জন্য। বিশেষত, মহামারির সময়ে দ্রুততার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হ্যাকিং টুল সম্পর্কিত সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা হয়নি।

র‌্যানসমওয়্যার হামলা বৃদ্ধি: এক্সপার্ট ইনসাইট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের শুরুতে কভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকেই র‌্যানসমওয়্যারের হামলা আগের বছরের দুই প্রান্তিকের তুলনায় ৪৮৫ গুণ বেড়ে যায়। তবে ২০২১ সালের শুরুতে হামলার পরিমাণ কিছুটা কমে আসে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ের বিবেচনায় ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত র‌্যানসমওয়্যার হামলা সার্বিকভাবে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্নিষ্ট সরকারি সংস্থা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে সাইবার কাউন্টার টেররিজম এক্সপার্ট জোহার পিনাশির উদ্ৃব্দতি দিয়ে বলা হয়, এই বিশেষজ্ঞের মতে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এসে র‌্যানসমওয়্যার হামলা প্রায় ৮০০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, র‌্যানসমওয়্যার হামলাকারীদের লক্ষ্য এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠান। কারণ, এসব দেশের প্রতিষ্ঠানে সফল হামলা চালিয়ে সার্ভার কিংবা ডিজিটাল সিস্টেমের দখল নেওয়া সম্ভব হলে তা মুক্ত করার জন্য বেশি পরিমাণে অর্থ দাবি করা সম্ভব হয়। তবে মহামারির সময়ে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের সার্ভার লক্ষ্য করে হামলা বেড়েছে।

অন্য একটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাকফগ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের তুলনায় হামলা বিপুল হারে বাড়লেও সফলতার পরিমাণ সামান্যই বেড়েছে। আগে যেখানে সফল হামলার হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ, গত এক বছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। তবে গত এক বছরে হামলার ক্ষেত্রে হামলাকারীরা ডিভাইসের মুক্তিপণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে সাধারণভাবে পাঁচ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মুক্তিপণ চাওয়া হতো। কিন্তু এখন এর পরিমাণ লাখ ডলারের ওপরে, এমনকি মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে সফল র‌্যানসমওয়্যার হামলার পর ৫ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের আগের পাঁচ বছরে র‌্যানসমওয়্যার হামলা থেকে ক্ষতির মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত হিসাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রতিবেদনে র‌্যানসমওয়্যার হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য অপারেটিং সিস্টেমসহ ব্যবহূত সব সফটওয়্যার, প্লাগ ইন ও অ্যাড অনস জেনুইন বা লাইসেন্স করে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডিভাইসের ফাইল পৃথক আরেকটি স্টোরেজ সিস্টেম বা ক্লাউডে জমা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

হ্যাকারওয়ানের প্রতিবেদন :হ্যাকারওয়ান প্রকাশিত ‘দ্য হ্যাকার রিপোর্ট ২০২১’-এ বলা হয়েছে, মহামারিকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা বলয় বা ব্যবস্থা তৈরির পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় ৩১০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে হালনাগাদ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি বা ‘মিস কনফিগারেশন’ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে ব্যবস্থার হালনাগাদও করা হয়নি। বিশেষ করে এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতার চিত্র বেশি উঠে এসেছে। এর ফলে বিভিন্ন ম্যালওয়্যার আক্রমণের অনেক নতুন লক্ষ্যবস্তু তৈরি হয়েছে গত এক বছরে।