মাধ্যমিক স্তরের ব্যকরণ বই নিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির বাণিজ্য !


2941 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মাধ্যমিক স্তরের ব্যকরণ বই নিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির বাণিজ্য !
এপ্রিল ৩, ২০১৬ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক :
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতি মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার বই নিয়ে বাণিজ্য শুরু করেছে। কোম্পানীর নিকট থেকে চুক্তিবদ্ধ হয়ে উপজেলার স্কুলগুলোতে বই চালু করতে ডেনেশনের নামে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের বই বাধ্যতামূলক কিনতে তারা প্রত্যেক শ্রেণির জন্য সিলেবাসও ছাপিয়েছে। কোম্পানীর নিকট থেকে আদায়কৃত অর্থের সামান্য সমিতির ফান্ডে জমা হলেও বাকী অর্থ গিয়েছে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষক সমিতির নেতাদের পকেটে।
তবে সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অর্থ গ্রহণের কথা স্বীকার করে বলেন, উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কোম্পানীর বই পাঠ্য করিয়েছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আব্দুল সাদী বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সমিতি কোন ক্রমেই কোম্পানীর বই পাঠ্য করতে পারে না। তবে ভূক্তভোগীরা জানান, সরকারের বিনামূল্যে বই বিতরণ প্রশ্নবিদ্ধ করতেই সমিতি অর্থের বিনিময়ে এমন কাজ করেছে।
সূত্র জানায়, জানুয়ারি মাসের শুরুতেই সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতি একটি সভা করে। সভায় কোম্পানীর নিকট থেকে বই পাঠ্য করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য সমিতির পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। এ সময় বিভিন্ন লাইব্রেরীর মাধ্যমে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণির জন্য বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার বই চাওয়া হয়। কিন্তু কমিটির সুপারিশ তোয়াক্কা না করে সমিতির সভাপতি ও ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম ও সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মাছখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহাকারী প্রধান শিক্ষক শামসুল হক শহরের পপুলার লাইব্রেরীর মালিক শফিউল্লাহ ভূইয়া সাগরের সাথে গোপনে চুক্তিবদ্ধ হয়। সমিতির নির্ধারিত বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করতে সিলেবাসও প্রবর্তন করে। যা সৃজনশীল পদ্ধতিতে আইন বহির্ভূত। সমিতি সিলেবাসে ৬ষ্ঠ শ্রেণির জন্য বাংলা ব্যকরণ সহায়ক বই হিসেবে রাশেদা আক্তারের ‘মাতৃভাষা বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিত’ ও ইংরেজি ব্যাকরণ হিসেবে জয়নাল আবেদীনের ‘এ ব্রিলিয়ান্ট কমিউনিকেটিভ ইংলিশ গ্রামার এন্ড কম্পজিশন’ অন্তর্ভূক্ত করেছে।
৭ম শ্রেণির জন্য বাংলা ব্যকরণ সহায়ক বই হিসেবে নাজনীন আকতারের ‘আদিল বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিত’ এবং ইংরেজি গ্রামার কে এম মামুন হোসাইনের ‘মর্ডান কমিউনিকেটিভ ইংলিশ গ্রামার এন্ড কম্পজিশন’ অন্তর্র্ভক্ত করেছে। সেখানেও অর্থ বার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষায় সহায়ক বই থেকে সারাংশ, সারমর্ম, ভাবসম্প্রসারণ, ব্যক্তিগত পত্র থেকে পড়বে বলে দাগ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে।
৮ম শ্রেণির জন্য বাংলা ব্যকরণ সহায়ক বই হিসেবে রাশেদা আকতারের ‘মাতৃভাষা বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা সম্ভার’ এবং ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্রের জন্য গ্রামার হিসেবে চৌধুরী এন্ড হোসেনের ‘এডভ্যান্স গ্রামার’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯ম শ্রেণির জন্য বাংলা ব্যকরণ সহায়ক বই হিসেবে ‘ ভাষা সৌরভ মাধ্যমিক বাংলা ব্যাকরণ’ এবং ইংরেজি গ্রামার হিসেবে চৌধুরী এন্ড হোসেনের ‘এডভ্যান্স গ্রামার’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, সমিতির পাঠ্য বইয়ের চুক্তিভুক্ত বইগুলো শহরের পপুলার লাইব্রেরী ডিলার। ঐ লাইব্রেরীর মালিক সমিতিকে অর্থ দিয়ে বই পাঠ্য করিয়েছে।
প্রত্যেক ক্লাসে অর্থ বার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষায় সহায়ক বই থেকে সারাংশ, সারমর্ম, ভাবসম্প্রসারণ, ব্যক্তিগত পত্র থেকে পড়বে বলে সিলেবাসে দাগ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলো সমিতি থেকে প্রশ্ন নেওয়ায় বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা বই কিনতে।

সূত্র আরো জানায়, সমিতি বই জোর পূর্বক সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এসব ছাত্র ছাত্রীদের বাধ্যতামূলক ভাবে কোটি কোটি টাকার বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। ওই কোম্পানীর বই মানসম্মত নয়। মূলত ওই বই কোম্পানীর কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে এ বই হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে ছাত্র ছাত্রীদের মেধার বিকাশ ঘটবে না বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, ১০০ টাকার বইয়ের মূল্য ধরা হয়েছে ৪০০ থকে ৬০০ টাকা। প্রতিটি বই তাদের এত দাম দিয়ে বাধ্যতা মূলক কিনতে হচ্ছে। কোম্পানীর কাছ থেকে টাকা খেয়ে শিক্ষকরা এসব বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তি করাচ্ছেন। বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, শিক্ষক সমিতির নেতারা আলোচনা করে সিলেবাসে একাডেমিক বুক হাউজের ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেনীর পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার বই কিনতে বাধ্য করাচ্ছেন। এছাড়া সরকার ছাত্রছাত্রী সব বই দিয়েছে। যদি কোন শিক্ষার্থী সহায়ক হিসেবে কোন বই কিনতে চায় তাহলে সে তার ইচ্ছামত যেটি ভাল সেটি কিনতে পারবে। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্র আরো জানায়, সরকার বিনামূল্যে জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়েছে। কিন্তু সরকারের এই অর্জন ম্লান করতে সমিতি কোম্পানীর বই চালু করেছে।
জেলা পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলামের বিষয়টি জানানেই বলে জানান। এ বিষয়ে সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। সব করেছে সাধারণ সম্পাদক। আপনি তার সাথে কথা বলেন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মাছখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহাকারী প্রধান শিক্ষক শামসুল হক জানান, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলার কতিপয় কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে পাঠ্য করিয়েছি। এ বিষয়ে প্রশাসন কিছুই করতে পারবে না। তারা আমাদের কাছে ধরা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকতা জয়নাল আবেদীন আর্থিক সুবিধে নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন এ বিষয়ে সমিতির কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবো।
আর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিশোরী মোহন জানান, তারা যা করেছে তা অন্যায়। এ বিষয়ে তাদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হবে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আব্দুল সাদী বলেন, সরকার বিনামূল্যে বই দিচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত বইয়ের প্রয়োজন নাই। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।