মানবতার গানের সাধক লালন, ছেউড়িতে বসেছে লালন মেলা


904 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মানবতার গানের সাধক লালন, ছেউড়িতে বসেছে  লালন মেলা
অক্টোবর ১৭, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

গাজী মোমিন উদ্দীন :
লালন শাহ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আপাদমস্তক একজন মানবতাবাদী মানকসকতার মানুষই ছিল তার আসল পরিচয়।  ফকির লালন, লালন সাইঁ, লালন শাহ ইত্যাদি নামে তিনি আছেন মানুষের অন্তরে। তিনি একাধারে আধ্মাতিক সাধক, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক ও মানবতাবাদী পুরুষ ছিলেন আজীবন তার সকল কাজে।  অনেক গানের গীীতকার,সুরকার ও গায়ক হিসেবে সঙ্গীতাঙ্গনেও তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় মানুষ।  বাউল গানের অগ্রদূৎ লালন শাহের মাধ্যমেই উনিশ শতকে এদেশে এই ধারার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। তিনি জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতার জয়গান গেয়েছেন তার সৃষ্টিতে। তার মানবতার জয়গানের উজ্জ্বল উদাহরণ –সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে….গানটি এখনও মানবতার বিকাশে সৃষ্টিশীল মানুষেরা ব্যবহার করেন। বর্তমান ৮ম শ্রেণির বাংলা বইতে মানবধর্ম নামে তার কবিতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানবতাবোধ জাগ্রত ও বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তার জীবনী সম্পর্কে বিশদভাবে জানা যায়নি। তিনি জীবদ্দশায় কিছু বলেননি, আবার সাথে থাকা সঙ্গীরাও তার বিনানুমতিতে কিছু বলেননি। তার গান ছাড়া জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ কম। শুধু নিজেকে লালন ফকির বলেছেন অনেক লেখার মধ্যে। ১৭৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন েএমন তথ্য পাওয়া গেছে, তাছাড়া কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ার ছেউড়িতে স্ত্রী বিশখা ও তার শিষ্যদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন।  জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা……….গানের মাধ্যমে  লালন বলতে চেয়েছিলেন জাত বলে কিছু নেই, সবাই মানুষ।  একটি গানে লালনের প্রশ্ন ছিল, এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।

লালনের আখড়া, যেখানে বর্তমানে তার মাজার অবস্থিত
লালন কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন ও শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজনে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সংগীত ও আলোচনা হত। চট্টগ্রাম, রঙপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকিরের শিষ্য ছিলেন; শোনা যায় তার শিষ্যের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের বেশি ছিল। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর লালনের  ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেউড়িয়াতে মৃত্যু হয়। । তারই উপদেশ অনুসারে ছেউড়িয়ায় তার আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর তার সমাধি করা হয়। আজও সারা বাংলাদেশ থেকে বাউলেরা অক্টোবর মাসে ছেউড়িয়ায় মিলিত হয়ে লালনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা, মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।, তার উপরে সদর কোঠা, আয়না মহল তায়। লালনের গানে মানুষ ও তার সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানবতাবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। তার বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষের কোন ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কূল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালনের এই দর্শনকে কোন ধর্মীয় আদর্শের অন্তর্গত করা যায় না। লালন, মানব আত্মাকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্তা রূপে। খাঁচার ভিতর অচিন পাখি গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচা রূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না। লালনের সময়কালে যাবতীয় নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কার, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা সেদিনের সমাজ ও সমাজ বিকাশের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমাজের নানান কুসংস্কারকে তিনি তার গানের মাধ্যমে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ।  আর সে কারণেই লালনের সেই সংগ্রামে বহু শিষ্ট ভূস্বামী, ঐতিহাসিক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, লেখক এমনকি গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষও আকৃষ্ট হয়েছিলেন । আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেছিলেন। তার সহজ-সরল শব্দময় এই গানে মানবজীবনের রহস্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। লালনের বেশ কিছু রচনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে অতীব সংবেদনশীল ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু ও মুসলিম মধ্যে জাতিগত বিভেদ-সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। তিনি মানুষে-মানুষে কোনও ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। মানবতাবাদী লালন দর্শনের মূল কথা হচ্ছে মানুষ। আর এই দর্শন প্রচারের জন্য তিনি শিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। লালনকে অনেকে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন সাম্প্রদায়িক পরিচয় দিয়ে। কেউ তাকে হিন্দু, কেউ মুসলমান হিসেবে পরিচয় করাবার চেষ্টা করেছেন। লালনের প্রতিটি গানে তিনি নিজেকে ফকির হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। লালন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেনঃ “লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন – আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।  যদিও তিনি একবার লালন ‘ফকির’ বলেছেন, এরপরই তাকে আবার ‘বাউল’ বলেছেন। মনের মানুষ চলচ্চিত্রে লালন চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় লালনকে নিয়ে কয়েকটি চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন লালন ফকির চলচ্চিত্রটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ম. হামিদ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র দ্যাখে কয়জনা যা বাংলাদেশে টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়। তানভীর মোকাম্মেল ১৯৯৬ সালে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র অচিন পাখি।  ২০০৪ সালে তানভির মোকাম্মেলের পরিচালনায় লালন নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় । এ চলচ্চিত্রটিতে ললনের ভূমিকায় অভিনয় করেন রাইসুল ইসলাম আসাদ এবং এটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে । এছাড়া ২০১০ এ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ মনের মানুষ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যা ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ৪১তম ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে। ২০১১ সালে মুক্তি পায় হাসিবুর রেজা কল্লোল পরিচালিত ‘অন্ধ নিরাঙ্গম’ নামের চলচ্চিত্র । এ চলচ্চিত্রটিতে লালনের দর্শন ও বাউলদের জীবনযাপন তুলে ধরা হয়েছে । এটিতে অভিনয় অভিনয় করেছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী,আনুশেহ্ আনাদিল প্রমুখ ।
বিশ্ব সাহিত্যে প্রভাব

লালনের শিষ্য ভোলাই শাহের হাতে লেখা লালনের নাম। ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে অপ্রচলিত বাংলা অক্ষরে লেখা। লালনের গান ও দর্শনের দ্বারা অনেক বিশ্বখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক প্রভাবিত হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লালনের মৃত্যুর ২ বছর পর তার আখড়া বাড়িতে যান এবং লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে ১৫০টি গান রচনা করেন। তার বিভিন্ন বক্তৃতা ও রচনায় তিনি লালনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।  লালনের মানবতাবাদী দর্শনে প্রভাবিত হয়েছেন সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ লালনের দর্শনে প্রভাবিত হন এবং তার রচনাবলীতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরণ দেখা যায়। তিনি After Lalon নামে একটি কবিতাও রচনা করেন। লালনের সংগীত ও ধর্ম-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। ১৯৬৩ ছেউড়িয়ায় আখড়া বাড়ি ঘিরে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় লালন একাডেমী। তার মৃত্যু দিবসে ছেউড়িয়ার আখড়ায় স্মরণ উৎসব হয়। দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ লালন স্মরণোৎসব ও দোল পূর্ণিমায় এই আধ্যাত্মিক সাধকের দর্শন অনুস্মরণ করতে প্রতি বছর এখানে এসে থাকেন। ২০১০ সাল থেকে এখানে পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব হচ্ছে। এই অনুষ্ঠানটি “লালন উৎসব” হিসেবে পরিচিত এবং এ বছর ১২৬তম উৎসব হচ্ছে।

লেখক: গাজী মোমিন উদ্দীন
সহকারী শিক্ষক, সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
তথ্যসূত্র: লালন সাহিত্য ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন ওয়েনসাইট