মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন বাঘবিধবা নারীরা


181 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন বাঘবিধবা নারীরা
নভেম্বর ১৬, ২০২২ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

॥ গোলাম সরোয়ার ॥

অভাব অনাটন আর সামাজিক বঞ্চনা নিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ বাঘ বিধবা নারী। এসব বাঘ বিধবা নারীরা সাংসারিক কষ্টের পাশাপাশি মানুষিক ভাবে নিঘৃত হচ্ছেন সমাজ থেকে। প্রতিনিয়ত শুনতে হচ্ছে তাদের অপায়া, অলক্ষী, ডাইনি ইত্যাদী নামে।

সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন চকবারা গ্রামের বাঘ বিধবা নারী রাশিদা বেগম (৫০) জানান, ৮/১০ বছর আগে সুন্দরবনে মধু আহরন করতে যেয়ে বাঘের আক্রমনে নিহত হয় স্বামী আলম গাজী। স্বামীর রেখে যাওয়া শুধু কয়েক শতক জমির ভিটাবাড়িতে কোনো রকম মাথা গোজার মত করে ৪টি সন্তান নিয়ে খুবই কষ্টে বসবাস করেন। রাশিদা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে এদিকে যেমন আর্থিক অনাটন আর অন্যদিকে সমাজের নানা ধরনের বঞ্চনা এবং কুসংস্কার নিয়ে অত্যন্ত মাবনেতর জীবনযাপন করছি। শুধু তাই নয় স্বামীকে বাঘে ধরার খবর পাওয়ার পর থেকে তার পরিবারের লোকজনের মুখ থেকে আমাকে এখনো অপায়া অলক্ষি শুনতে হয়। তবে তিনি অদ্যবধি সরকারী ভাবে কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি বলে জানান।

একই গ্রামের বাঘ বিধবা নারী মুর্শিদা বেগম (৩৭) জানান, গত দুই বছর আগে সুন্দরবনে বাঘের হাতে নিহত হয় স্বামী রেজাউল ইসলাম। ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে নিয়ে ক্ষেত মজুরীর কাজ করে জীবনযাপন করছেন তিনি। মুর্শিদা জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর যে মানুষিক কষ্ট পেয়েছেন তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন সমাজের বঞ্চনা থেকে। স্বামীর আত্বীয়স্বজনের বাড়ি গেলে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কথাও বলতে চায় না। কারন আমারই কারনে বাঘে ধরেছে স্বামী রেজাউলকে। এরকম নানা ধরনের কুসংস্কার ও সামাজিক বঞ্চনা মাথায় নিয়ে দিন কাটছে আমার। তবে শুনেছি বৈধ পাশধারী কোনো বনজীবি বাঘের আক্রমনে নিহত হলে সরকার ক্ষতিপুরন দিচ্ছেন। কিন্ত আমি এখনো পর্যন্ত কোনো আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপুরন পাইনি।

রাশিদা বেগম আর মুর্শিদা বেগমের মত একই মানুষিক কষ্টের বর্ননা দিলেন, সুন্দরবন লাগোয়া খলশিবুনিয়া গ্রাামের বাঘ বিধবা নারী রহিমা বেগম, পার্শ্বেমারী গ্রামের সুখজান বিবি, গাবুরা গ্রামের খাদিজা খাতুন ও ৯ নং সোরা গ্রামের আনোয়ারা বেগম। এসব বঞ্চনার শিকার বাঘ বিধবা নারীরা পুনর্বাসনের সরকারের সাহায্য প্রার্থনা করেন। তাদের মত সাতক্ষীরার উপকুলীয় অঞ্চলের শ্যামনগর উপজেলাতেই ৫ শতাধিক বাঘ বিধবা নারী মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা লিডার্সের এ্যাভোকেসি অফিসার পরিতোষ কুমার জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন উপজেলা শ্যামনগর ও কয়রা এলাকার বাঘ বিধবাদের নিয়ে কাজ করছেন তার সংস্থাটি। পরিতোষ কুমার জানান, লিডার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও পার্শ্ববর্তী কয়রা উপজেলাইে ১ হাজার ১০০ জন বাঘ বিধবা নারী রয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ জন বাঘ বিধবা নারীদের সহায়তার জন্য কাজ করছে লিডার্স। এরমধ্যে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ও গাবুরা ১২০ জন এবং কয়রার বেতকাশি ইউনিয়নের ১৮০ জন। তিনি আরো বলেন, জলাবায়ু পরিবর্তনে ঝকিপুর্ন জনগনের জীবন জীবিকা শক্তিশালীকরন প্রকল্প ২০১২ এর অধিনে বাঘ বিধবাদের বিভিন্ন প্রকার সহায়তা করা হয়। জার্মানির একটি দাতা সংস্থার সাথে স্থানীয় এনজিও লিডার্স প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ করছেন। আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি চলবে বলে জানান।

সাতক্ষীরার সুন্দরবন পশ্চিম-জোন বুড়িগোয়ালিনী ফরেষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা এম.কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী জানান, বৈধ পাশ নিয়ে সুন্দরবনে যদি কোনো মৌয়াল, জেলে বা বাউয়ালী বাঘের আক্রামনে নিহত হন তাহলে সরকার তাকে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপুরন দিচ্ছেন। একই সাথে কেউ আহত হলে তাকেও ১ লাখ টাকা ক্ষতিপুরন দেয়া হয়। বন্যপ্রানীদ্বারা আক্রান্ত বিধিমালা ২০২১ এর অধিনে এই ক্ষতিপুরন দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন সরকার। তবে এর আগে সরকারী সাহায্যের পরিমান ছিলো কম। তবে মুশকিল হচ্ছে অবৈধ উপায়ে যারা সুন্দরবনে মধু আহরন বা মাছ ধরতে যেয়ে বাঘের আক্রমনে নিহত হয় তারা সরকারের এই সহায়তা পাবে না। আর যারা অবৈধ ভাবে বনে প্রবেশ করে বন্যপ্রানীদের হাতে নিহত হয় সরকারী ভাবে সে সব মানুষের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তিনি আরো বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি যে সমস্ত বাঘ বিধবা নারী রয়েছে তাদের বিনা মুল্যে পাশ দেয়া হচ্ছে। তারা যেন নদীতে মৎস্য আহরনের মাধ্যমে অন্তত কিছু উপার্জন করে সংসার নির্বাহ করতে পারে। তবে বুড়িগোয়ালী রেঞ্জের অধিনে সরকারী ভাবে বাঘের আক্রমনে নিহতের পরিসংখ্যান দিতে পারেননি তিনি।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক মো. আনিসুর রহিম জানান, এসব বাঘ বিধবা নারীদের সরকারী সহায়তার মাধ্যমে পুনর্বাসন করতে হবে। তাছাড়া তাদের সাথে ভালো আচরন করা সমাজের সকল স্থরের মানুষের উচিৎ। তিনি বলেন, একে তারা স্বামী হারা তার পর যদি তারা সামাজিক ভাবে বঞ্চনার শিকার হন তাহলে আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ হুমায়ুন কবির জানান, সাতক্ষীরা সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার যে সমস্ত অসহায় বাঘ বিধবা নারী রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহন করবে। তাছাড়া কিছু এনজিও সংস্থাও বাঘ বিধবাদের নিয়ে কাজ করছেন।

#