মালয়েশিয়া থেকে এক মাসে ১৫৮ কোটি টাকা রেমিটেন্স পাঠিয়েছে বাংলাদেশিরা


121 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মালয়েশিয়া থেকে এক মাসে ১৫৮ কোটি টাকা রেমিটেন্স পাঠিয়েছে বাংলাদেশিরা
জুন ২, ২০১৯ প্রবাস ভাবনা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

শেখ সেকেন্দার আলী,মালয়েশিয়া ::

ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানের মাঝেও মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্স প্রেরণে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত একমাসে ১৫৮ কোটি টাকা দেশে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এ ছাড়া চলতি বছরের গেল ৫ মাসে মালয়েশিয়া অগ্রণী রেমিটেন্স হাউজের থেকে বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ২৩০ কোটি ৯০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে ৪২০ কোটি ৬০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
চলতি বছরের শুরু থেকে ২ জুন পর্যন্ত বৈধ পথে এ পরিমাণ টাকা মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়াস্থ এনবিএল ও অগ্রণী রেমিটেন্স এর সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রবাসীরা বলছেন, অবৈধ পথে এর দ্বিগুণ টাকা পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাঙালিরা হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত, যা বাংলাদেশ সরকারের রেমিটেন্স খাতে গুরুত্বপূর্ণ কু-প্রভাব পড়ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি ১টি সরকারি ও দুটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা থাকার পরেও হুন্ডিকে সঠিক হিসেবে মনে করছে অনেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ব্যবসার সঙ্গে শতাধিক বাংলাদেশি জড়িত রয়েছে। এদের মধ্যে হুন্ডি ব্যবসার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। এ সিন্ডিকেট প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি প্রদেশে রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এ নেটওয়ার্ক প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি টাকা লেনদেন করে হুন্ডির মাধ্যমে।
বাংলাদেশ দূতাবাস ও রেমিটেন্স হাউসগুলো বৈধ পথে রেমিটেন্স প্রেরণে সচেতনতামূলক সভা সেমিনার করলেও কে শুনে কার কথা। মালয়েশিয়া থেকে ৭০ শতাংশ প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণ করেন। ৭০ শতাংশ এর মধ্যে ৪০ শতাংশ অবৈধ এবং ৩০ শতাংশ বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। যারা বৈধ পথে টাকা না পাঠিয়ে হুন্ডির পথ বেছে নিয়েছে।
কারণ হিসেবে জানা গেছে, এ অবৈধরা বৈধ কাগজপত্র না থাকাতে পুলিশের ভয়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে দেশে অর্থ প্রেরণ করছেন।
মালয়েশিয়াস্থ এনবিএল রেমিটেন্স হাউসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ আক্তার উদ্দিন আহমেদ রবিবার এ প্রতিবেদককে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২ জুন পর্যন্ত এনবিএলের ৯টি শাখার মাধ্যমে ৪২০ কোটি ৬০ লাখ ৪৫ হাজার টাকার রেমিটেন্স প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন।
আক্তার উদ্দিন বলেন, রেমিটেন্স বৃদ্ধির লক্ষ্যে এনবিএলের পক্ষ থেকে আমরা সচেতনতামূলক সভা- সেমিনার করে যাচ্ছি। আর এ সচেতনতা বাড়াতে আমাদের হাই কমিশনার মুহা. শহীদুল ইসলাম দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। হাই কমিশনারের দিক নির্দেশনাই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আক্তার উদ্দিন আরোও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্ছ পদস্থ কর্মকর্তাদের অনুরুধ করেছিলাম ইদের বন্ধের সময় ভিবাগ,জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি করে শাখা খোলা রাখতে । যাতে করে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এর টাকা পরিবারের সদস্যরা বন্ধের দিনেও উওোলন করতে পারে। কিন্তু সে অনুরুধ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষরা রাখেননি। যার কারণে বৈধ পথে প্রবাসীরা রেমিটেন্স না পাঠিয়ে অবৈধ পন্থা হুন্ডির আশ্রয় নিচ্ছে। যদি বন্ধের দিনে ব্যাংক শাখা খোলা রাখাহত তাহলে যে পরিমান রেমিটেন্স বৈধ পথে দেশে পাঠানো হয়েছে এর তিনগুণ বৃদ্ধি পেত বলে এ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।
প্রবাসীদেরকে বলা হচ্ছে বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠানো নিরাপদ এবং এনবিএলের ৯টি শাখার পাশাপাশি এজেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে যাতে করে এনবিএলের সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি মনে করেন।
অগ্রণী রেমিটেন্স হাউসের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও ডাইরেক্টর খালেদ মোর্শেদ রিজভী বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২ জুন পর্যন্ত অগ্রণী রেমিটেন্সের ৬টি শাখার মাধ্যমে ২৩০ কোটি ৯০ লাখ ৮৮ হাজার টাকার রেমিটেন্স প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন।
খালেদ মোর্শেদ এ প্রতিবেদককে জানান, বৈধ পথে রেমিটেন্স প্রেরণে সচেতনতামূলক বিভিন্ন আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে হাই কমিশনার মুহা. শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা হয়েছে। কিভাবে বৈধ পথে দেশে রেমিটেন্স বাড়ানো যায় হাই কমিশনার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
তার আলোকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং অগ্রণী রেমিটেন্সের ৬টি শাখার পাশাপাশি এজেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। রিজভী বলেন, হাই কমিশনার ও অগ্রণী রেমিটেন্স হাউসের ডাইরেক্টর দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর মো. জহিরু ইসলাম সব সময় রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধির খোঁজ-খবর রাখছেন। মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্স আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অগ্রণী রেমিটেন্স হাউসের এ কর্মকর্তা।
এ দিকে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের ২৪ দিনে (১ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত) ১৩৫ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। এরমধ্যে ১ থেকে ৩ মে এসেছে ১১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। আর ৪ থেকে ১০ মে ৪৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ১১ থেকে ১৭ মে ৩৮ কোটি ৯১ লাখ ডলার এবং ১৮ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত ৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, মে মাসের প্রথম ২৪ দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিটেন্স এসেছে ৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের মাধ্যমে ১০১ কোটি ৮১ লাখ ডলার এবং বিদেশি ৯ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৮০ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, আশা করা হচ্ছে একক মাস হিসেবে মে মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স দেশে আসবে। এর আগে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছিল জানুয়ারি মাসে, ১৫৯ কোটি ৭২ লাখ ডলার।
এর আগে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এক হাজার ৩৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার (১৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার) রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা- যা ছিল গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। মে মাসের ২৪ দিনে ১৩৫ কোটি ডলার যোগ করলে চলতি অর্থবছরে মোট রেমিটেন্সের পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬৫ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। অর্থবছরের বাকি ১ মাস ৬ দিনে দেড় বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসবে। সে হিসাবেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এবার রেমিটেন্স ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে।
এ দিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ (১৪.৯৮ বিলিয়ন) ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা- যা ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও রেমিটেন্স বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং হুন্ডি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। দেশের জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।