মিনা ট্র্যাজেডি : দায় কার


382 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মিনা ট্র্যাজেডি : দায় কার
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৫ প্রবাস ভাবনা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :

পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে সৌদি আরবের মিনায় সাত শতাধিক হাজি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও হাজারখানেক। গত রাত পর্যন্ত সৌদি সরকারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭৬৯ এবং আহত ৯৩৪ জন। সৌদি কর্তৃপক্ষ রোববার বিভিন্ন দেশের নিহত ৬৫০ জনের ছবি প্রকাশ করেছে। তবে এ পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করে ইরান দাবি করেছে, মিনার দুর্ঘটনায় অন্তত দুই হাজার হাজি মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৩১ জন ইরানের নাগরিক।

নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে এ সংখ্যা গত রাত পর্যন্ত ১৩ বলে জানা গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৯৮ জন। গত বৃহস্পতিবার মক্কার মিনা শহরে প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর মক্কার মসজিদ আল হারামে ক্রেন ভেঙে ১০৭ হাজি নিহত হন। খুবই কাছাকাছি সময়ে এমন বড় দুটি দুর্ঘটনার পর সৌদি আরবের হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। কে নেবে এই দুর্ঘটনার দায়_ এ নিয়েও চলছে তুমুল বিতর্ক। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, হাজিরা নির্দেশনা অনুসরণ না করায় ঘটেছে এ ঘটনা। ইরানসহ সৌদিবিরোধী দেশগুলোর অভিযোগ, সৌদি প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই শত শত হাজির প্রাণ গেছে। বিশেষ করে সৌদি আরব সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও গ্র্যান্ড মুফতির বক্তব্য এবং যথাযথভাবে হাজিদের মরদেহ সরিয়ে না নেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। খবর এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা, আরব নিউজ, বাসস ও ইউএনবির। বৃহস্পতিবার মক্কার মিনা শহরে ‘শয়তানকে পাথর’ মারার রীতি পালন করতে যাওয়া হাজিদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এতে পদদলিত হয়ে শত শত হাজি প্রাণ হারান।

এদিকে, মিনায় হাজিদের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের কাছে পাঠানো শোকবার্তায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মিনায় পদদলিত হওয়ার ঘটনায় বিপুলসংখ্যক হাজির প্রাণহানিতে এবং আরও অনেক হাজি আহত হওয়ায় আমি গভীরভাবে শোকার্ত ও বেদনাহত।’ নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্ঘটনার পর পরই সৌদি বাদশাহকে পাঠানো শোকবার্তায় বলেন, ‘মিনায় আজ সকালে (বৃহস্পতিবার) বিপুলসংখ্যক হজ পালনকারীর মর্মান্তিক প্রাণহানি এবং আরও কয়েকশ’ আহত হওয়ার খবর শুনে আমি মর্মাহত ও অশ্রুসজল।’

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে ইরান। তাৎক্ষণিকভাবে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি হজ কমিটির প্রধান প্রিন্স খালেদ আল-ফয়সাল বলেছেন, ‘আফ্রিকান হাজিদের একটি দল নির্দেশনা অনুসরণ না করায় হুড়োহুড়ি ও প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটেছে।’ পরে সৌদি সরকারের মুখপাত্র সুলতান আল-দোসারি দাবি করেন, আফ্রিকান হাজিদের দোষারোপ করে প্রিন্স খালেদ আল-ফয়সাল কোনো বক্তব্য দেননি। তবে সৌদির স্বাস্থ্যমন্ত্রী খালেদ আল-ফালিহ এএফপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘হাজিরা দিকনির্দেশনা অনুসরণ না করায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’

কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রীয় বেতার মিনার বিশৃঙ্খলার জন্য ভিন্ন কারণ বর্ণনা করেছে। বেতারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি বাদশাহর ছেলে শাহজাদা মুহাম্মাদ বিন সালমানের গাড়িবহর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার চাপে ঘটেছে এ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার আগে যুবরাজের গাড়িবহর মিনা শহরের কেন্দ্রস্থলে আসায় তার নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এর ফলে লোকের চাপ বেড়ে হুড়াহুড়ি শুরু হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যেসব সড়ক দিয়ে এসে হাজিরা শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মেরে ওই এলাকা ত্যাগ করেন, তার মধ্যে দুটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় এবং একমুখী চলাচলের রাস্তা হঠাৎ দ্বিমুখী করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।’

সৌদি সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। দুর্ঘটনার সময় মিনায় সৌদির যুবরাজের উপস্থিত থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেছে তারা। তবে ইরানের প্রচারমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের জের ধরে সৌদি আরবের কয়েকটি গণমাধ্যম লিপ্ত হয়েছে পাল্টা দোষারোপে। আরব নিউজ, সৌদি গ্যাজেটসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি প্রচারমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ’তিনেক ইরানি হাজির একটি দল নির্দেশনা না মেনে ভুল সড়কে প্রবেশ করায় মিনায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইরানি হাজিদের ওই দলটি নিয়ম অনুযায়ী মুজদালিফা থেকে নিজেদের ক্যাম্পে না ফিরে সরাসরি জামারাতের দিকে অগ্রসর হয়। যদিও হজযাত্রীদের প্রতিটি দলের আলাদা আলাদা সময়ে জামারাতে পাথর ছুড়তে যাওয়ার নিয়ম রয়েছে। ইরানি হাজিরা নিয়ম ভেঙে উল্টো পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় অন্য আরেকটি দলের সামনে পড়ে যায়। এতে হুড়োহুড়ি শুরু হয়।

দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন বিবিসির সাংবাদিক সিমা ইলা ইসুফু। পদদলিত হয়ে সেদিন তার এক আত্মীয় নিহত হন। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সিমা ইলা ইসুফু বলেন, ‘যেখানে গিয়ে পাথর ছুড়তে হয়_ অনেক লোকজন সেদিকে যাচ্ছিলেন। আবার অনেকে যাচ্ছিলেন বিপরীত দিকে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং হঠাৎ করেই মানুষ মাটিতে পড়ে যেতে শুরু করে। ভিড়ের মধ্যে ছিলেন নাইজেরিয়া, সাদ, সেনেগালসহ বিভিন্ন দেশের হাজি। লোকজন নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার জন্য একে অন্যের ওপরে উঠে যেতে শুরু করেন। এতে বহুজনের মৃত্যু হয়। এ সময় কেউ সাহায্যের জন্য আল্লাহকে ডাকছিলেন। ভয়ে কাঁদছিল শিশুরা। মাটিতে পড়ে থাকা মানুষ সাহায্য চাইছিলেন; কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কেউ ছিল না তখন।’

অথচ মিনায় হুড়োহুড়ি বা হতাহতের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত ২৫ বছরে হজ মৌসুমে মিনায় ‘শয়তানকে পাথর’ মারতে গিয়ে কমপক্ষে আটবার বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়েছেন হাজিরা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত দুই হাজার হাজি। এর মধ্যে ১৯৯০ সালেই মিনায় মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৪১৬ হাজির। তার পরও কেন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য মিনায় রাখা হয়নি বিশেষ ব্যবস্থা? বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে তোলা এমন জোরালো প্রশ্নের কোনো যুক্তিযুক্ত উত্তর এখনও দিতে পারেনি সৌদি আরব।

সিরিয়ার আল বা’থ পত্রিকা এ প্রসঙ্গে সৌদির সমালোচনা করে বলেছে, ‘বহু বছরের পরিস্থিতি বিবেচনায় এমনটাই প্রতীয়মান হয়, জামারাতে পাথর ছোড়ার রীতি ম্যানেজ করতে সৌদি আরব সক্ষম নয়।’
এ ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন সৌদি আরবের হজ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও। তারা বলেছেন, বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশ থেকে হজ পালনের জন্য সৌদি আসেন লাখো মুসলি্ল। তারা কথা বলেন কয়েকশ’ ভিন্ন ভাষায়। ফলে হাজিরা নিরাপত্তার নিয়মকানুন মেনে চলছেন কি-না তা নিশ্চিত করা নিরাপত্তা কর্মীদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ছোটখাটো কিছু ঘটলেও আতঙ্কিত মানুষের হুড়োহুড়ির কারণে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সৌদি আরবকে তাই এ বিষয়ে আরও দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তবে বাহরাইনের আল-ওয়াসাত, কাতারের আল-রায়াহর মতো সৌদি সমর্থক পত্রিকাগুলোর দাবি, এ ঘটনায় আয়োজকদের দোষ নেই; বরং সৌদি আরব হজ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা প্রমাণ করেছে।
এসব পত্রিকার বিশ্লেষকদের অভিযোগ, ‘এই দুর্ঘটনা পুঁজি করে ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যেই সৌদি আরবের সমালোচনা করা হচ্ছে।’

অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘পবিত্র হজের সময়ও সম্পদ ও শ্রেণীগত পার্থক্য পুরোপুরি ঘুচে যায় না।’ এ ছাড়া সৌদি কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোগের সমালোচনা করে ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, তারা (সৌদি প্রশাসন) এলাকাগুলো উন্নয়নের নামে আশপাশের পাহাড়গুলোতে বিলাসবহুল হোটেল তৈরি করেছেন। এসব হোটেল-মোটেলের কক্ষ অনেক অর্থে ভাড়া নিয়ে সম্পদশালী মুসলমানরা সরাসরি কাবা শরিফ দর্শনের সুযোগ পান। অন্যদিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক গরিব হাজির রাত কাটে পবিত্র স্থান থেকে দূরে এবং তপ্ত আবহাওয়ার মধ্যেই। কারণ এ থেকে নিজেদের রক্ষা করার মতো সহায় তাদের অনেকেরই থাকে না।’
এর আগেও সংস্কারের নামে পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহরের বিভিন্ন স্থাপনা নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে সৌদি আরব সরকারের বিরুদ্ধে। মিনা ট্র্যাজেডির পর এসব ঘটনা আবারও নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে।
তবে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ বিন-আবদুল্লাহ আল-শেখ হতাহতের এ ঘটনাটিকে ‘নিহতদের নিয়তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, পদদলিত হয়ে সাত শতাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তার এ বক্তব্যে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ।

শুক্রবার সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে গ্র্যান্ড মুফতি বলেছেন, ‘তাদের (নিহতদের) ভাগ্য এবং নিয়তিতে যা লেখা ছিল, তা ছিল অবশ্যম্ভাবী। এজন্য কেউ দোষী হতে পারে না।’
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি অবশ্য সৌদি আরবের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন এ ঘটনার জন্য। সৌদি আরবকে এ দায় স্বীকার করতে হবে মন্তব্য করে খামেনি বলেছেন, ‘অব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়াই এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মিনার ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছেন।
অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সরাসরি স্বীকার না করলেও সৌদির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল-আজিজ আল সৌদ হজ ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া মিনার দুর্ঘটনা দ্রুত তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এসব নির্দেশনা দেওয়ার আগে গ্র্যান্ড মুফতি, রাজপুত্র, মন্ত্রী ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাদশাহ বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে বাদশাহ সালমান হাজিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও হজের ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন।
তবে এটুকুতেই থামছে না সমালোচনার ঝড়। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ হজ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এককভাবে সৌদি আরবের হাতে না রেখে বহুজাতিক ব্যবস্থাপনায় এ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা আয়োজনের পক্ষে আওয়াজ তুলেছে। হজ ও ওমরা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সৌদি আরব বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে বলে জানা গেছে।

সূত্র  : সমকাল অনলাইন