মিয়ানমারের ‘ফাঁদে’ বাংলাদেশ


98 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মিয়ানমারের ‘ফাঁদে’ বাংলাদেশ
আগস্ট ২৫, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

প্রত্যাবাসন হতেই হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক ::

দুটো বছর গেল। এখনও সেই একই বৃত্তে বন্দি রোহিঙ্গা সংকট। সমাধান দূরে থাক, সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একাধিকবার প্রত্যাবাসনে আগ্রহ দেখালেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার। ফলে দু’দফা তারিখ নির্ধারণ করেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। এদিকে, চলতি বছরে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক একাধিক রিপোর্ট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা থাকলেও মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের বিষয়টি কখনই গুরুত্ব দেয়নি; বরং তারা আন্তর্জাতিক চাপ ও সময় বুঝে কিছু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে ‘কূটনৈতিক ফাঁদ’ তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ স্পষ্ট ভাষায় সমকালকে বলেন, গত দুই বছরে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের দিক থেকে উদ্যোগ শূন্য। আন্তর্জাতিক চাপের ফলে সম্প্রতি মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করে যেটা করেছে, সেটা একটা ‘নাটক’ ছাড়া কিছুই নয়। এ কারণে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হয়ে এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে। তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নতুন আইন প্রণয়ন কিংবা বিদ্যমান আইনের গ্রহণযোগ্য সংশোধন করা উচিত বলেও মত দেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এ প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ হলে সেটা শুধু বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা নয়; বরং এ অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। রোহিঙ্গারা নিজের দেশে না ফিরলে তাদের ভবিষ্যৎ এবং অধিকারও নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, এখনই রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এ সহায়তার পরিমাণ আরও কমতে থাকবে। এ কারণে দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতেই হবে। এ লক্ষ্য সামনে নিয়েই বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করবে।

রাখাইন পরিস্থিতি : গত ২১ আগস্ট জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর গত দুই বছরে রোহিঙ্গা সংকটের ওপর একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনেও বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অবস্থার অবনতি হয়েছে। সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি সংকট সমাধানে রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় এবং এ সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

রাখাইনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের (এএসপিআই) গত ২৪ জুলাই প্রকাশিত রিপোর্টে পরিস্থিতির অবনতির চিত্র তুলে ধরতে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে রাখাইনের বিভিন্ন অঞ্চলের তোলা ছবি বিশ্নেষণ করে দেখানো হয়। সেখানে ২০১৯ সালে এসেও রাখাইন অঞ্চলে সেই পোড়া-ভাঙা ঘরবাড়ির দৃশ্য পাওয়া যায়। ছবিতে দেখা যায়, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনা উপস্থিতি আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে কমপক্ষে ছয়টি সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ছবি বিশ্নেষণ করে ওই অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুনর্গঠনের দৃশ্য কোনো চিত্রে পাওয়া যায়নি। এটা প্রমাণ করে, ২০১৭ সালে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরানোর ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রস্তুতি নেই মিয়ানমারের।

এর আগে ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্নেষণ করে বলা হয়েছিল, রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ‘বৌদ্ধ মডেলে’র ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। এ চিত্র ধারণা দেয়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামে বৌদ্ধদের পুনর্বাসনের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্নেষণের ফল হিসেবে বলা যায়, রোহিঙ্গাদের নিজ গ্রামে নয়, বরং আলাদা কোনো স্থানে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা থাকতে পারে মিয়ানমার সরকারের।

জাতিসংঘ-সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, রাখাইনে সত্যিকার অর্থে কী ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট চিত্র জানার সুযোগ দেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে বারবার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু মিয়ানমার সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। মানবাধিকারকর্মী, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকদের রাখাইনে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগের মতো বাধানিষেধ রয়েছে। ফলে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের অস্বচ্ছ ধারণা ও গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হবে না।

কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা : ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে এসে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সাহায্যের পরিমাণ খুব সীমিত বা অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। বছরের শুরুতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় ২০১৯ সালের জন্য ৯২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের হিসাব করা হয়েছিল। বছরের প্রথম সাত মাসে এই চাহিদার মাত্র ৩৪ শতাংশ পাওয়া গেছে।

চলতি বছরের মার্চে রেডিও ফ্রি এশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করছে। এই ব্যয়ের কিছু অংশ আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আসছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। এটা নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সহায়তার পরিমাণ কমতে থাকলে বাংলাদেশ সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়বে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সহায়তা ছাড়াও এর আগে ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য পুরো এলাকা উপযোগী করতে বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় হয় দুই হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন : রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর মূল্যায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, গত দুই বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার গুরুত্ব দেয়নি। কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি, এটা স্পষ্ট। ফলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও সফল হয়নি। মিয়ানমার যে আইন সামনে রেখে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করেছে, সে আইন বহাল থাকলে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যেতে আস্থা পাবে না। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের অবস্থান মিয়ানমারে কী হবে, তার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে নতুন আইন করতে হবে। বিদ্যমান আইনের গ্রহণযোগ্য সংশোধন করতে হবে। রোহিঙ্গারা যখন নিশ্চিত হবে যে মিয়ানমারে ফিরে গেলে আগের সংকট এবং বিপদ হবে না, তখন তারা অবশ্যই ফিরে যাবে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আরও বলেন, গত দুই বছরে নানাভাবে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ এসেছে। সংকট সমাধানের জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আহ্বান এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। রাখাইনে ২০১৭ সালে সংঘটিত গণহত্যার বিচারের বিষয়টিতে আন্তর্জাতিক আদালতে উঠেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে স্পষ্ট করেই বলা হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন মধ্যস্থতা করবে এবং এ সংকট মোকাবেলায় চীন বাংলাদেশের পাশে আছে। নানামুখী চাপের বিষয় থেকে মিয়ানমার এখন অনুভব করছে যে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে যেতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তারা আবারও কৌশল করেছে। তারা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরি না করেই প্রত্যাবাসনের তারিখ দিয়ে একটা নাটক করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশন সামনে রেখে এটা একটা কূটনৈতিক ফাঁদ বলা যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ওই তারিখ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ পরামর্শ দেন, সর্বশেষ এ ঘটনার পর বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। কারণ, সরকারের বক্তব্যের বড় গুরুত্ব আছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে। মিয়ানমার যেন সরকারের বক্তব্য থেকে কোনো সুযোগ নিতে না পারে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ‘বাংলাদেশের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে’ পরিবর্তন আনতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি করেছে মিয়ানমার। মিয়ানমার বাহিনীই রাখাইনে গণহত্যা করেছে, তাদের বর্বরতার জন্যই রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এ কারণে মিয়ানমারের বর্বর কর্মকাণ্ডগুলোই কূটনৈতিক ভাষায় তুলে ধরতে হবে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েস আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের দিক থেকে গত দুই বছরে যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি দেখছি না। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করেছে, জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ হয়েছে, গ্রুপের একাধিক বৈঠক হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশ নানাভাবে তৎপরতা চালিয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের সামনে মিয়ানমারের আস্থার জায়গাটা তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গারা বারবার মার খেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, ফিরে গেছে; ফিরে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি মার খেয়ে আবার পালাতে বাধ্য হয়েছে। এ কারণে এবার রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তারা যেন জীবনধারণ এবং বসবাসের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়, সেটা মিয়ানমার সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে হবে।