মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাগানিয়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী


174 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাগানিয়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী
মার্চ ২৬, ২০২১ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

উত্তাল মার্চ। উত্তাল ফেব্রুয়ারি। উত্তাল ডিসেম্বর। বছরের বারো মাসকে এভাবে ব্যাখ্যা করলে সব মাসকেই এক একটি উত্তাল উজ্জীবিত উপমা হিসেবে তুলে ধরা যায়। কারণ এর মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম,গনতান্ত্রিক আন্দোলন। শীর্ষ ভাষায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। রয়েছে মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার বিরল ইতিহাস।
তবু উত্তাল মার্চেই ফিরে আসি। যে মার্চ জন্ম দিয়েছে ম্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। যে মার্চ ডাক দিয়ে অলস নিদ্রা ভঙ্গ করেছে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির। যে মার্চ অস্ত্র হাতে নিয়ে শত্রু নিধনে উৎসাহ উদ্দীপনা যুগিয়েছে বাঙ্গালিকে। যে মার্চে শত্রুর গুলিতে প্রাণ ঝরেছে অগনিত মুক্তিকামী মানুষের। আর যে মার্চ ডাক দিয়েছে স্বাধীনতার। সে মার্চ তো উত্তালই বটে। উদ্ধত জনতার পদধ্বনি, ষ্পর্ধিত জনতার দৃপ্ত শপথ, সংগ্রামী জনতার বাংলাদেশের পতাকা উড্ডয়নের সূচনা হয়েছিল এই মার্চেই। বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো এই স্লোগানে কম্পিত হয়ে উঠেছিল এই মার্চ। সে তো উত্তাল তরঙ্গ। সেতো মহা সাগরের গর্জন। প্রলয়ংকরী ঢেউ। সেতো কামানের গোলা, যার হুংকার দলিত করেছিল দখলদার শত্রু সেনাদের।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সেই মার্চের আগমন আরও একবার। ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ থেকে ২০২১ এর ২৬ মার্চ। পঞ্চাশ বছরের এই পথ পরিক্রমায় জাতি এখন পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। জাতি পেয়েছে একটি স্বাধীন ভূখন্ড। একটি লাল সবুজ পতাকা। অর্জন করেছে মুক্তি ও স্বাধীনতা। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের কবিতা উদ্ধৃত করে বলতে ইচ্ছে করে ‘স্বাধীনতা তুমি রবী ঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান, স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুলের ঝাঁকরা চুলের বাবরী দোলানো মহান পুরুষ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা । স্বাধীনতা তুমি রোদেলা দুপুরে মধ্য পুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার’। কবি শামসুর রাহমানের এই কবিতার মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ। এই স্বাদ আমরা ভোগ করছি। শীতল জলের মতো পান করছি আকন্ঠ।
পঞ্চাশ বছর পার করার সময় জাতির স্মরণে আসছে সেই মার্চের কথা। যে মার্চে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন ‘ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ’। বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষন জাতির জীবনে ঘটিয়েছিল উজ্জীবন। আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সাগর পরিমান রক্ত আর মা ও বোনেদের সম্ভ্রম বিসর্জনের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিলাম স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি আজ সুবর্ণজয়ন্তী।
‘বিশ^কবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের তো তার নাইকো শেষ’। সেই বাংলাকে আমরা আবারও ফিরে পেয়েছিলাম ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর। সেই বাংলা বিশে^র মানচিত্রে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। যার নাম বাংলাদেশ, যার ভাষা বাংলা। প্রকৃতপক্ষে এই বাংলাদেশ এক দিনে অর্জিত হয়নি। এর জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। রক্ত দিতে হয়েছে। ১৯৪৭ এ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির পর জন্ম নিয়েছিল দুটি রাষ্ট্র। পাকিস্তান ও ভারত। পাকিস্তানের পূর্ব অংশকে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম অংশকে বলা হতো পশ্চিম পাকিস্তান। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান অংশে। সেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে আমরা কিভাবে বাংলাদেশে স্বাধীন ভূখন্ডে এলাম সেই ইতিহাসই আমাদের সামনে এনে দিয়েছে সুবর্ণজয়ন্তী। সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায় একদিন বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘ আপনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে কবে থেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন’। জবাবে বঙ্গবন্ধ বলেছিলেন ১৯৪৭ সাল থেকে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে হিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন পাকিস্তানের জন্ম বাংলাদেশের মানুষকে স্বাথীনতা দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর এই সংজ্ঞায়নকে সামনে রেখে ১৯৪৮ থেকে শুরু হয় ভাষার জন্য আন্দোলন। ১৯৫২ তে বাঙ্গালি ছাত্র জনতার রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এরপর ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে পূর্ব বাংলা ভূখন্ডের মানুষ হিসেবে আমরা শির উন্নত করে দাঁড়াই। ১৯৫৮ তে আইয়ূব খান যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দিয়ে মার্শাল ল’ জারি করে বাঙ্গালির ওপর নতুন করে নিপীড়ন নির্যাতন শুরু করে। জাতি তার গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ ও লালিত স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে আইয়ূবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এর পর ৬২ এর ছাত্র আন্দোলন পাকিস্তানি সরকারকে বেসামাল অবস্থায় ফেলে দেয়। ৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সরকার আরও এক বড় ঝাঁকুনির মুখে পড়ে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে তার বিচার শুরু করলেও বাঙ্গালি জনতার ‘ জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ স্লোগানে পাক জান্তাদের ভিত কাঁপিয়ে দেয় । ছাড়া পান বঙ্গবন্ধু। ১৯৬৯ এর দেশ কাঁপানো গনঅভ্যূত্থান দেখে ভয় পেয়ে যায় পাকিস্তানিরা। সেবছর ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদসহ অনেকেই পাকিস্তানিদের গুলিতে শহীদ হন। বঙ্গবন্ধু সারাদেশে বিচরন করে বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করে সাধারন নির্বাচনে আগ্রহী করে তোলেন। জাতির এই চাপের মুখে উত্তাল ৬৯ তখন আরও বেশী আন্দোলনমুখর হয়ে উঠে পাকস্তানিদের বাধ্য করে ১৯৭০ এর সাধারন নির্বাচন দিতে। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার পার্লামেন্ট গঠন করে নির্বাচিত বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি করে। এরই মধ্যে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। মূলতঃ ৭ই মার্চ থেকেই স্বাধীনতার সূচনা ঘটে। গনবিস্ফোরন ও টালমাটাল উত্তেজনার মধ্যে ২৫ মার্চ নিরীহ শ্রমিক জনতার ওপর সামরিকজান্তা ইয়াহিয়ার বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিতে অগনিত বাঙালির রক্ত ঝরে যায়। ওই রাতেই পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের মূহুর্তে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে বলেন, এটাই হয়তো আমার শেষ ঘোষনা। তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধুর এই দৃপ্ত ঘোষনা সেদিন বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এরপর টানা নয় মাসের রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হয়েছিল ভারতীয় মিত্রবাহিনী। অস্ত্র দিয়ে, প্রশিক্ষন দিয়ে এবং বাংলাদেশের নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বিতাড়িত কোটি জনতাকে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছিল ভারত। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড জেনারেল এএকে নিয়াজি মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পন করে। তারা পরাজয় স্বীকার করে মাথা নিচু করে। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ঘোষিত হয় বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ২৬ মার্চ যে স্বাধীনতার জন্ম দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, নয় মাস শেষে রক্তের সাগর পেরিয়ে ১৬ ডিসেম্বর তা পরিপূর্নতা লাভ করে।
২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর পথ পরিক্রমন ঘটেছে আমাদের। আমরা জাতি হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। বিশ^ দরবারে আমরা প্রমান করেছি স্বাধীনতা কারো দয়ার ভিক্ষা নয়। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে বাঙালি জাতির জানমাল ও সহায় সম্পদের অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছিল। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সাল থেকে দেশ পুনর্গঠনে মাঠে নামেন। সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে একদল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। দেরিতে হলেও বাঙালি জাতি এই ঘাতকদের বিচার করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। ৭১’এ মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শত্রু হয়ে সামনে এসেছিল সেইসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছে।
ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ এভাবেই এগিয়ে চলেছে। এই অগ্রসরতার ৫০ বছর পূর্তি মার্চ ২০২১। স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী জাতির ইতিহাসের জন্য একটি মাইলফলক। আমরা আবারও অগ্রসর হবো স্বাধীনতার শতবর্ষ পূৃির্তর দিকে। এভাবেই চলবে বাংলাদেশ অনাদিকাল। চলবে বাংলাদেশ, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সুবর্নজয়ন্তীকে বাংলার মাটিতে মাথা নুইয়ে আমরা আরও একবার প্রতিজ্ঞা করতে চাই, এ দেশ এ মাটি আমার আপনার। এদেশের মাটি কারো অঙ্গুলি হেলনে কম্পিত হয় না। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা অক্ষয় অব্যয়। স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক লাল সবুজের পতাকার প্রতি জাতির বিন¤্র শ্রদ্ধা। আমরা গেয়েই যাবো ‘আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালবাসি’। স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা এখনও আমাদের পথপ্রদর্শক। সম্ভ্রম হারানো মা ও বোনেরা আমাদের পরম শ্রদ্ধার। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরদিন হয়ে থাকবেন আমাদের আদর্শ, আমাদের প্রেরণা, আমাদের নেতা, আমাদের মুক্তি সনদ,আমাদের মিছিল সংগ্রামে বজ্রকন্ঠী পথপ্রদর্শক। স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক সুখী সমৃদ্ধ এবং সন্ত্রাস, দূর্নীতি ও জঙ্গিমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়ার।

— সুভাষ চৌধুরী , সাবেক সভাপতি , সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব।