মুক্তিযোদ্ধা শাহামত আলী মোড়লের আকুতি, যুদ্ধ করেও তালিকায় ঠাঁই হলোনা আমার


283 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মুক্তিযোদ্ধা শাহামত আলী মোড়লের আকুতি,    যুদ্ধ করেও তালিকায় ঠাঁই হলোনা আমার
নভেম্বর ৩, ২০১৬ তালা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

মুজিবর রহমান :
তালা উপজেলার শুভংকরকাটী গ্রামের মৃত আলম মোড়লের পুত্র মোঃ শাহামত আলী মোড়ল ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে শক্রমুক্ত করার জন্য ৯নং সেক্টরে স্থানীয় কমান্ডার এম এম ফজলুল হকের নেতৃত্বে জীবন বাজী রেখে খুলনা বিভাগের কপিলমুনি ও মাগুরা সহ বিভিন্ন স্থানে খন্ড খন্ড যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছেন।

তিনি বলেন ১৯৭১ সালে আমার বয়স ২৩/২৪ বৎসর হবে, আমার যখন ৭বছর বয়স তখন আমার পিতা মারা গেছেন । আমি সংসারের ছোট সন্তান, বড় ভাই অসুস্থ্য, মায়ের সাথে মিলে অতিকষ্টে সংসার চালিয়েছি । সংসারে তখন অনেক অভাব। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিলো আমাদের । এমন সময় শুরুহলো মুক্তিযুদ্ধ । চারিদিকে চলছে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোষর রাজাকার আলবদরদের অত্যাচার নির্যাতন, পাখির মত গুলি করে মারছে মানুষ, লুটপাট, নারী ধর্ষনসহ জালিয়ে দিচ্ছিল বাড়ীঘর ।

একদিকে সংসারে অভাব অন্যদিকে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোষরদের অত্যাচার নির্যাতন। ভাবলাম আগে দেশকে বাঁচাতে হবে, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে, তাই ঐ নরখাদকের অত্যাচার নির্যাতন হতে দেশের মানুষকে বাঁচাতে, দেশের মাটিকে শক্রমুক্ত করতে, আমার মায়ের ভাষাকে ফিরিয়ে আনতে, নিজের জীবনের মায়া না করে, স্বাধীন দেশ গড়ার প্রত্যয়ে, জীবন বাজীরেখে সন্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহন করি ।

পাকিস্তানী বাহিনী ও তার দোষর রাজাকার আলবদরদের অত্যাচার নির্যাতনকে হটিয়ে দিয়ে একটি স্বাধীনদেশ ফিরিয়ে আনতে বাতুয়াডাঙ্গায় ট্রেনিং নেই । ট্রেনিং প্রশিক্ষক ছিলেন বাচ্চু, কাইয়ুম ও এম এম ফজলুল হক ।

আমার সহযোদ্ধা মৃত সুলতান শেখের পুত্র মোঃ বিলাত হোসেন জাতীয় গেজেট নং ১৬৬২, মৃত মাদার শেখের পুত্র মোঃ আবু হানিফ শেখ গেজেট নং ১৬৬৩ এবং মৃত এরফান আলী মোড়লের পুত্র এম এম ফজলুল হক মিলে মাতৃযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করি।

৯নং সেক্টর কমান্ডার এম এম ফজলুল হক ছিলেন আমার মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার । ট্রেনিং শেষে আমাকে গ্রেনেড দিয়ে তালার জেঠুয়া বাজারে প্রহরীর দায়িত্ব পালনের জন্য দেয়া হয় ।  আমরা খুলনা, কপিলমুনি ও মাগুরা সহ বিভিন্ন স্থানে খন্ড খন্ড যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি।

সেদিন চোখের সামনে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর গুলিতে আমার সহযোদ্ধার মৃত্যু দেখেছি। অনাহারে, অবহেলায়, না ঘুমানোর ফেরারী জীবনের ৯ মাসের ফসল আমাদের এই কাংঙ্খিত অর্জিত লাল সবুজের পতাকার মহান স্বাধীনতা।

জীবনযুদ্ধের কষাঘাতে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। যাদের সাথে যুদ্ধকরেছি তাদের নাম মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকায় আছে কিন্তু আজও আমার নামটি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তরভূক্ত হয়নি। আমি কৃষক মানুষ, ক্ষেত খামারে কাজ করে যা পাই তা দিয়ে কোন রকম জীবন কেটে যায়।

কিন্ত এতটুকু আফসোস জীবনবাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করে দেশকে স্বাধীন করেছি কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হতে পারলাম না। অনেক বয়স হয়েছে হয়ত কবে মারা যাব জানিনা, তবে মরার আগে আফসোস থেকে যাবে, আমি কি আসলেই মুক্তিযোদ্ধা ? আর যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকি তাহলে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাই কেন ? এই প্রশ্ন মুক্তিযোদ্ধা তথা আ’লীগ সরকারের প্রধান মন্ত্রী দেশরতœ বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার কাছে। কেননা তার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন তোমরা আ’লীগের নেতৃত্বে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শক্রর মোকাবেলা করতে হবে ।

আমিতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধ করেছি । তাহলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকার আমার নাম থাকবেনা কেন? আমি কি মরনের আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরতে পারবো না ? আমি খেটে খাওয়া মানুষ, অনেক কষ্টে জীবন অহিবাহিত করছি, বুকটা কেন জানি কেঁদে ওঠে যখন শুনি যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেনি, তাদের নাম গেজেটে আছে কিন্ত আমার মত যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাদের নাম গেজেটে নাই।

আমার তখন মনে হয়, আমিতো জীবন যুদ্ধে হারলেও দেশ রক্ষায় কারো কাছে মাথানত করেনি। এমনই কথা বলছিলেন সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার শুভংকরকাটি গ্রামের মৃত আলম মোড়লের পুত্র মোঃ শাহামত আলী মোড়ল ।

এলাকার সুশিল সমাজের ব্যক্তিরা বলেন,আমরাও চাই আসলে যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা,যাদের নাম এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি, দ্রুত গতিতে তাদের নাম গেজেট ভুক্ত করা হোক  ।

এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা কালীন স্থানীয় কমান্ডার এম এম ফজলুল হক বলেন শাহামত আলী একজন প্রকৃত  মুক্তিযোদ্ধা তার নামটি তালিকা ভুক্ত করার জন্য অনুরোধ করছি ।

পরিশেষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নিকট আরজ, সঠিক যাচাই বাছাই করে আমি যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকি তাহলে আমার নামটি যেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, এবং মরণের আগে যেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরতে পারি।
##