মুক্তির উদ্যোক্তা হয়ে বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার গল্প


368 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মুক্তির উদ্যোক্তা হয়ে বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার গল্প
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

আমি মুক্তি…..

গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। প্রতিটি মানুষেরই স্বপ্ন থাকে। ঠিক তেমনি আমারও ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। ডাক্তারদের ওই সাদা এপ্রোনটা গায়ে জড়ানোর। ছোট থেকেই দেখতাম আমার বাবা মা শত কষ্টের মাঝেও আমার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেন। খুব কাছ থেকে বাবা মায়ের কষ্ট দেখলেও সেই কষ্টটা আমরা কোনদিন অনুভব করতে পারিনি। গত বছর আমি বায়না করি গুড় পুকুরের মেলায় যাওয়ার জন্য। আব্বু আমাকে ৫০০ টাকা ম্যানেজ করে দেন। আমি খুবই খুশি হই। সকালে আমার মেলায় যাওয়ার সময় হঠাৎ শুনলাম আম্মু আব্বুকে বলছে আপনি এবার একটা জামা কিনেন আপনার তো ভালো কোনো জামা নেই।

হয়ত এখন আমি কিছুটা বড় হয়ে গেছি! তাই জীবনে প্রথম অনুভব করলাম আমার আব্বু ভালো নেই। সেদিন সকালে আমি মেলায় গিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু নিজের জন্য কিছু না কিনে আব্বুর জন্য সস্তায় একটা শার্ট কিনে এনেছিলাম যার দাম নিয়েছিল মাত্র ২৫০ টাকা। সেদিনই প্রথম অনুভব করি আমাকে আমার বাবা মায়ের সুখের জন্য কিছু করতে হবে।

তাই প্রথমে গ্রামে টিউশনি শুরু করলাম। কিন্তু গ্রামের ছেলে মেয়ে পড়িয়ে যা আয় হতো তাতে বাবা মাকে ভালোভাবে সহযোগিতা করা যাচ্ছিল না। পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। পরীক্ষা দিতে গেলাম ম্যাটসে। আল্লাহর রহমতে আমি চান্স পেলাম। আর এই পরীক্ষাটা দিতে হয়েছে আমাকে অনেক যুদ্ধ করে। সে এক মহা যুদ্ধ! যে যুদ্ধে আমার এম.বি.বি এস ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বিফলে গেলেও আমার প্যারামেডিকেল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পুনরুজ্জীবিত হয়। আমি চান্স পেয়ে প্রথম আমার আব্বুকে জানালাম। অনেক গল্পের মধ্যে আব্বু বলে উঠেন এত বিপদের মধ্যেও তুমি সরকারি’তে চান্স পাইবা আমি ভাবিনাই। তারপরও সব টাকা খরচ করেছিলাম তোমার মনের শান্তির জন্য। যাতে তোমার কখনো মনে না হয় যে আমি তোমার চাওয়া আমি পূরণ করতে পারিনাই!

এভাবে আমার যাত্রা শুরু মেডিকেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। এর মধ্যেই করোনার হানায় বাসায় চলে এলাম।

খুব বেশি দামি ফোন কিনে দেওয়ার ক্ষমতা আমার আব্বুর নেই। কিন্তু পুরাতন স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিলেন তিনি। আমি সেটাই ব্যবহার করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বসত আমার ফোনটি হোস্টেলের পিছনে পানির মধ্যে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। তারপর ভাইয়ার দেওয়া ছোট একটা স্মার্টফোনে আমি ফেসবুকে একাউন্ট করি। এরই মধ্যে আমার আব্বু নিজেই অসুস্থ হয়ে যান। তার আয় সব বন্ধ হয়ে যায়।

ভাইয়া ছোট একটা কোম্পানিতে চাকুরিজীবি। তার উপরে ৭ জনের সংসার। ভাইয়া ও ভাবী দুজনেই মাস্টাস পড়েন। সংগত কারণেই তাদের পড়ার খরচও বেশ ব্যয়বহুল। আম্মু অনেক হতাশ হয়ে পড়ি। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাত ফেইসবুকে একটি পোষ্ট দেখলাম যেখানে লেখা ছিল রিসেলার লাগবে। আমি সেই পোষ্টে দেওয়া নাম্বারে ফোন করি। আমি আমার আগ্রহের কথা জানানোর পর সেই ব্যবসায়ী আমাকে কাজ করার সুযোগ দেয়। কাজ শুরুর ১০/১২ দিনের মধ্যে আমি সেই সেলারের পন্য রিসেল করে সামান্য কিছু টাকা আয় করি। ততদিনে অনলাইন সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারনা পাই। আমি লক্ষ্য করি সব জেলাতেই অনলাইন শপ আছে।

তখন আমি সাতক্ষীরার অনলাইন শপ বলে সার্চ দিয়ে ইমরান স্যারের Satkhira Online Shop নামক গ্রুপটা পাই। আমি প্রথমে আমার মায়ের আয়ের উৎস হিসেবে রেডি সবজি ডুমুর বিক্রয়ের জন্য সেল পোস্ট করি। আলহামদুলিল্লাহ আমার প্রথম সেল হয় এবং প্রথম পরিচয় হয় ইমরান স্যারের সাথে।

স্যার প্রথম দিন আমার থেকে আড়াই কেজি ডুমুর কিনেন এবং আমাকে বিজনেস টা ভালো ভাবে বুঝিয়ে দেন। আমি স্যারের পরামর্শে এবং সৎউপদেশে আমার রিসেলিং করে অর্জনকৃত টাকা দিয়ে (যার পরিমান ছিল ১৫০০) শাড়ির বিজনেস শুরু করি। আল্লাহর রহমতে ৩ মাসের ব্যবধানে আমি আমার মা বাবাকে সামান্য গিফট দিতে পারি এবং তারপর থেকে আর আমাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমি এখন নিজেই সাবলম্বী! আমি কাজ করছি বিভিন্ন ধরনের সবজি, সকল প্রকার শাড়ি ও থ্রীপিস নিয়ে।

এখন আমার স্বপ্ন বিজনেসটা বড় করা। আমি একটি সুপার শপ দিতে চাই। আর চাই মেয়েদের জন্য এমন একটি কর্মসংস্থান করতে যাতে করে তারা নিজেরাই সাবলম্বী হতে পারে। আর নতুনদের উদ্দেশ্য বলতে চাই চেষ্টা করুন চেষ্টার অসাধ্য কিছু নাই। আল্লাহ বলেছেন -বান্দার কর্মই তার ভাগ্য নির্ধরন করে। তাই বেশি বেশি চেষ্টা করুন। আর আমি কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি Satkhira Online Shop এর এডমিন ইমরান স্যারের প্রতি। যিনি আমাদের জন্য এত সুন্দর একটা প্লাটফর্ম উপহার দিয়েছেন।

#