মুস্তাফিজেই বাজিমাত


380 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মুস্তাফিজেই বাজিমাত
জুলাই ২২, ২০১৫ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডেস্ক :
লাল-সবুজের জার্সিতে তিনি যে বাঘ, তা এতদিনে জেনে গেছে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব। চ্যালেঞ্জটা ছিল তার সাদা পোশাক গায়ে জড়ানোর মধ্যেই। লাল বল হাতে কাটারটা কেমন করেন মুস্তাফিজ কিংবা স্লোয়ারগুলো ঠিকঠাক দিতে পারেন কি-না- রুবেলের হাত থেকে টেস্টের ক্যাপ মাথায় দেওয়ার পর থেকেই আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে ওয়ানডের মতো টেস্ট অভিষেকেও বিস্ময়বালক হিসেবেই অবতীর্ণ হলেন মুস্তাফিজ। তার ওই একটি ওভারে তিন উইকেট শিকারে বদলে যায় ম্যাচের রঙ। টেস্ট ম্যাচ শুরুর কত রকম ধরনই না থাকে।

প্রতিটিই আশ্চর্য রকমভাবে আলাদা। কোনো ম্যাচ দুরন্তবেগে এগিয়ে যায়, তো কোনো ম্যাচ যেতে যেতে পথ হারিয়ে ফেলে। হয়তো অনবদ্য একটা সেঞ্চুরি ম্যাচের গতিমুখ পাল্টে দেয় কিংবা দুর্ধর্ষ একটা স্পেল চিত্রনাট্যের ভূমিকা রচনা করে। গতকাল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ৬০তম ওভারটিই প্রথম দিনের চিত্রনাট্যের গতিপথ রচনা করেছে। মুস্তাফিজুর রহমানের স্বপ্নের একটা স্পেলেই স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে দক্ষিণ আফ্রিকা।

১৩৬ রানে এক উইকেট থেকে ২৪৮ রানে অলআউট হয় তারা। সেই মুস্তাফিজেই আবার বাজিমাত করে বাংলাদেশ। দিনশেষে দুই ওভার ব্যাটও করতে হয় স্বাগতিকদের। যাতে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৭ রান তোলেন তামিম ও ইমরুল কায়েস। অথচ প্রথম টেস্টের শুরুটা মোটেই বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক ছিল না। ডেন এলগার ও ড্যান জিলের ওপেনিং জুটি স্বাচ্ছন্দ্যে স্বাগতিক আক্রমণ প্রতিহত করছিল। দলীয় ৫৮ রানের মাথায় প্রথম আঘাত হানেন মাহমুদুল্লাহ। ড্যান জিলকে তিনি লিটন দাসের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত করেন। পতন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা তখনও ৭৮ রান দূরে দাঁড়িয়ে।

স্পিনের বিপক্ষে ভালো খেলতে থাকেন ডেন এলগার। অন্য প্রান্তে বড় ইনিংস খেলার ইঙ্গিত দিতে থাকেন ফ্যাফ ডু প্লেসিস। দিনের ক্রিকেট এগিয়ে যেতে থাকে স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু এর নাম টেস্ট ক্রিকেট। স্বাভাবিক নিয়মে চলতে চলতে কখন রঙ বদলাবে তা যেমন বলা যায় না, তেমনি কে রঙবদলের নায়ক হবেন তা বলাও অসম্ভব। ১৩৬ রানের মাথায় তাইজুল ইসলামের স্পিন খেলতে ভুল করে আউট হন এলগার। পরের ওভারেই টেস্টে বাংলাদেশের সফলতম বোলার সাকিব তুলে নেন ডু প্লেসিসের উইকেট। এখান থেকেই ইতিহাস বদলের ইঙ্গিত পেতে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই ইঙ্গিত প্রত্যক্ষ হতে একটু সময় লাগছিল। কারণ মুশফিক তার দলের নতুন বিস্ময়ের হাতে বল তুলে দিতে সময় নিচ্ছিলেন। অবশেষে ম্যাচের ৬০তম ওভারে মুস্তাফিজের হাতে বল তুলে দিলেন অধিনায়ক। মুহূর্তের মধ্যে ক্রিকেটেরও পটপরিবর্তন হয়ে গেল।

ওভারের প্রথম বলে প্রতিপক্ষের সেরা ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা আউট। অফস্টাম্পের বাইরে দিয়ে মুস্তাফিজের কৌণিক গতির বল আমলার ব্যাট ছুঁয়ে লিটনের হাতে জমা পড়ে। অভিষেক টেস্টে প্রথম উইকেট পেলেন মুস্তাফিজ। ঠিক পরের বলে আউট করেন জেপি ডুমিনিকে। লেগ বিফোরের আবেদনে প্রথমে সাড়া দেননি আম্পায়ার উইলসন। রিভিউ চাইলেন অধিনায়ক মুশফিক। হাঁটুর নিচে সামনের পায়ে লাগা বলে আউট দিলেন তৃতীয় আম্পায়ার। টানা দুই উইকেট নিয়ে অভিষেক টেস্টে হ্য্াটট্রিকের সামনে তখন মুস্তাফিজ। চট্টগ্রামের গ্যালারি তাই দেখে টগবগ করে ফুটছিল। পরের বল কোনো রকমে ঠেকালেন কুইন্টন ডি কক।

কিন্তু মুস্তাফিজের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না। ওভারের চতুর্থ বলে তার স্টাম্প উড়ে গেল। এক ওভারে তিন উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মেরুদণ্ড ভেঙে দিলেন মুস্তাফিজ। ১৭৩ রানে তিন উইকেট থেকে ছয় উইকেটে হারিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বড় রানের স্বপ্ন ততক্ষণে শেষ। পরে কোনো রকমে ধুঁকতে ধুঁকতে ৮৩.৪ ওভারে ২৪৮ রানে অলআউট হয়েছে প্রোটিয়ারা। দিনশেষে মুস্তাফিজের বোলিং বিশ্লেষণ ১৭.৪-৬-৩৭-৪। এমন একটা দলের বিপক্ষে অভিষেকে দুর্বার বোলিং করলেন মুস্তাফিজ, যাদের ঘরের চেয়ে বাইরের রেকর্ড দুর্দান্ত। দক্ষিণ আফ্রিকা দেশের বাইরে সর্বশেষ সিরিজ হেরেছে নয় বছর আগে, ২০০৬ সালে শ্রীলংকার মাটিতে।

এই সময়ের মধ্যে দেশের বাইরে ১৪টি সিরিজ খেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, এর সাতটি উপমহাদেশে। জিতেছে ১০টি সিরিজ। ড্র করেছে চারটিতে। ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানের কাছে ছাড়া অস্ট্রেলিয়া থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সবখানে জিতেছে তারা। এমন একটা দলের বিপক্ষে মুস্তাফিজের পারফরম্যান্স সত্যি গর্ব করার মতো। কিন্তু শুধু মুস্তাফিজের প্রশংসা করলে বাংলাদেশের টিম গেমকে খাটো করে দেখা হবে। এক প্রান্তে মোহাম্মদ শহীদও দারুণ বল করেছেন। ফিল্ডিং ব্যর্থতায় উইকেট পাননি।

সংবাদ সম্মেলনে মুস্তাফিজও স্বীকার করেছেন- ‘প্রথম স্পেলে ভালো হচ্ছিল না বোলিং। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। চেষ্টা করছিলাম যেন অন্য প্রান্তের বোলারের সঙ্গে জুটি গড়ে তুলতে পারি। ভালো বোলিং না হলেও অন্তত যেন ডট বল করতে পারি। জানতাম দু’দিক থেকে চাপ দিলে উইকেট আসতে পারে। শহীদ ভাই অসাধারণ বোলিং করেছেন। পুরো দলই আসলে দারুণ বোলিং করেছে।’ লাঞ্চের পরে টানা পাঁচ ওভার মেডেন নিয়েছেন শহীদ। তার কারণেই প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। অন্য প্রান্তে সেই চাপের ফসল তুলেছেন মুস্তাফিজ। প্রথম দিনে পুরো ৯০ ওভার না খেলে এই প্রথম বাংলাদেশের কাছে গুটিয়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। গত ছয় মাস তারা টেস্ট খেলেনি, এটা কারণ হতে পারে। তাতে কিন্তু বাংলাদেশের ইতিবাচক বোলিংয়ের অবদান খাটো হয়ে যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সর্বোচ্চ রান করা বাভুমা বলেছেন, ‘উইকেট মন্থর ছিল।

মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। রান করাও কঠিন ছিল। বলও নিচু হচ্ছিল। বাংলাদেশ ভালো বোলিং করেছে। আমাদের কাজটা কঠিন করে তুলেছে।’ এতটাই কঠিন যে, আড়াইশ’ রানও করতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। বড় কথা, একদিন টিকতে পারেনি বাংলাদেশের বোলিংয়ের বিপক্ষে। প্রথম দিনে স্বপ্নের মতো শুরুর পর তাই টেস্ট জেতার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন সফল হলে ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গত আট টেস্টের সবক’টিতেই হেরেছে বাংলাদেশ। একটা হার শুধু ছিল পাঁচ উইকেটের ব্যবধানে। বাকিগুলোতে ইনিংস পরাজয়। লজ্জার এ ইতিহাস বদলের জন্য বদ্ধপরিকর মুস্তাফিজরা। নতুন বাংলাদেশ কি পারবে মাস্টারদার শহরে ক্রিকেট বিপ্লব ঘটাতে? দেখা যাক, এই টেস্টের চিত্রনাট্যের সমাপ্তিতে কী লেখা আছে।