মুস্তাফিজের দিনেও স্বপ্ন অধরা


85 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
মুস্তাফিজের দিনেও স্বপ্ন অধরা
জুলাই ৩, ২০১৯ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভারতের কাছে হেরে সেমির পথ রুদ্ধ টাইগারদের

অনলাইন ডেস্ক ::

কাল রাতে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যে এসে চাঁদ গিলে নিয়েছিল সব আলো। বাংলাদেশের আকাশ থেকে সাদা চোখে তা ধরা পড়েনি। তবে সাদা চোখে যা দেখা গেছে তা হলো, বিশ্বকাপে টাইগারদের সেমির স্বপ্ন-আলো কীভাবে ঢাকা পড়েছিল কাল বার্মিংহামে। তামিমের একটি ক্যাচ মিসের ভুল আশার অমল ধবল পাল টুকরো কাগজের মতো কীভাবে ছিঁড়ে দিয়েছিল।

ম্যাচ শেষে রোহিত শর্মার হাতে যখন সেরার পুরস্কার, তখন দূরে একান্ত অপরাধীর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন তামিম। শুধু একটি ক্যাচ নয়, ১৬ কোটির আশাই যেন তার হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল। ভারতের কাছে ২৮ রানের আক্ষেপ আর আফসোসে ভরা হার- এই রেজাল্টের পর শুক্রবার পাকিস্তানের সঙ্গে হাতে থাকা ম্যাচটি জিতলেও আর কোনো সেমির অঙ্ক কষতে হবে না। ৬ জুলাই লন্ডন টু ঢাকার ফ্লাইটে উঠতেই হবে মাশরাফিদের। আইসিসি আপাতত দুই সেমিফাইনালিস্ট পেয়ে গেছে- অস্ট্রেলিয়ার পর ভারত।

মুস্তাফিজের ৫ উইকেট শিকার, সাকিবের লড়াকু ৬৬ রান, সাইফউদ্দিনের হার-না-মানা ৫১ রানের ইনিংস- সবই আক্ষেপ হয়ে থাকবে তামিমের ওই ভুলটির কাছে। সাইফউদ্দিন শেষ পর্যন্ত যেভাবে বুমরাহ-ভুবনেশ্বরদের তুড়ি মেরেছেন, তাতে ২৮৬ রানে অলআউট হওয়ার পর শূন্যতাটা বড্ড বেশি ঘিরে ধরেছিল কাল এজবাস্টনে।

মাথাব্যথা, আগের দিন তাই মাঠে না এসে হোটেলেই ছিলেন তামিম। কিন্তু গতকাল মাঠে থেকেও যে অপরাধী মন নিয়ে ব্যথা সহ্য করতে হলো তামিমের, তা সারাতে হাতের কাছে কোনো ওষুধ ছিল না! রোহিতের ললিপপের মতো শিশুতোষ ক্যাচ হাত থেকে ফেলার পর কোনো সান্ত্বনাও ছিল না। কারণ, সেটা তখন ভুল নয়, ‘অপরাধ’-এর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল রোহিত শর্মা। ৯ রানে জীবন পাওয়া ভারতীয় এই ওপেনার এর পর সেঞ্চুরি (১০৪) করে যান। তার একেকটি রান হাতুড়ির মতো আঘাত করে যায় লংঅফে দাঁড়িয়ে থাকা তামিমকে। শেষ পর্যন্ত সৌম্যর বোলিং তামিমের ব্যথিত হৃদয়ে মলম হয়ে এসেছিল আর মুস্তাফিজের কাটারগুলো ‘পেইন কিলার’ হয়ে! বিরাট কোহলি, হার্দিক পান্ডিয়া, দিনেশ কার্তিক, মহেন্দ্র সিং ধোনি ও মোহাম্মদ শামির উইকেট কর গুনে গুনে শিকার করেছেন মুস্তাফিজ (একটি রানআউটও করেছেন ভুবনেশ্বর কুমারকে)। সাকিবের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে তার এই মাইলফলক, যখন এজবাস্টনের স্কোর বোর্ডে ৯ উইকেটে ভারতের রান ৩১৪।

যে দল আগের পাঁচ ম্যাচের তিনটিতে তিনশ’ ছাড়িয়ে ইনিংস খেলেছে, সেই দলের কাছে ভারতের এই রান খুব বড় কিছু মনে হয়নি। ভুলের মাশুল দেওয়ার একটা সুযোগ ছিল তামিমের কাছেও। সে জন্য সেই তামিমকে জ্বলে উঠতে হতো, যে তামিমকে দেখা গিয়েছিল ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভারত-বধের সময়। সেই তামিমকে দেখার অপেক্ষায় ছিল সবাই, পাওয়ার প্লেতে যার ব্যাট বাউন্ডারির ফোয়ারা ছোটাতে পারে। কিন্তু সেই তামিম এক বছর ধরেই বোধ হয় হারিয়ে গেছেন। এখন তাকে তাকিয়ে থাকতে হয় পার্টনারের দিকে। পার্টনার চালিয়ে খেলবে আর তামিম সাবধানী হয়ে ১০ ওভার পর্যন্ত টিকে থাকবেন। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পর তার চালানোর কৌশলটা ড্রেসিংরুমেরই। কিন্তু এদিন ৫ ওভারে ১৮ রান নেওয়ার পরও সৌম্য ব্যাট ছোটাতে পারেননি। বুমরাহ আর ভুবনেশ্বর কুমারের ১৪০-এর ওপর গতির বলগুলো দু’জনেই সাবধানে খেলেছেন। তার পরও তামিম নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। শামির বল তার ব্যাটে লেগে বোল্ড হয়ে যান তামিম। ৩১ বলে ২২ রান, তিনটি বাউন্ডারি। ক্যাচ ফেলার খেসারতটা কোনোভাবেই মেটাতে পারেননি।

কোনো তাড়াহুড়া নয়, এমনই নির্দেশ ছিল ড্রেসিংরুমের। সৌম্যও তাই একসময় ১২ বলে ১ রানে ছিলেন। কোহলিদের জোর চেষ্টা ছিল তার উইকেটটা তুলে নেওয়ার। শামির বলে এলবিডব্লিউর আবেদনও করেছিলেন সৌম্যর বিপক্ষে। আলট্রা এজে ধরা পড়ে, বল ব্যাটে লেগেছিল। রিভিউ ব্যর্থ হয়েও কোহলি তর্ক করতে থাকেন ফিল্ড আম্পায়ারের সঙ্গে। প্রেসবক্সের ভারতীয় সাংবাদিকরা বলাবলি করছিলেন, ওটা নাকি কোহলির একটা কৌশল! প্রতিপক্ষ এবং আম্পায়ারকে চাপে রাখতে হয় নাকি এভাবেই। এরপর সৌম্যও হার্দিক পান্ডিয়াকে একটা বাউন্ডারি মারার পর লোভে পড়ে অফস্টাম্পের বহু বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে চালাতে গিয়ে কোহলির হাতে শর্ট কভারে ক্যাচ দিয়ে বসেন।

তখন ভরসা বলতে ছিল কেবল সাকিব আর মুশফিক জুটি। বেশ ভালোই এগোচ্ছিলেন দু’জনে। রানরেট কখনোই পাঁচের নিচে নামেনি তখন। কিন্তু প্রিয় সুইপ শট খেলার লোভ মুশফিকও সামলাতে পারেননি। চাহালকে চালাতে গিয়েই ২৪ রানে থাকা মুশফিক ক্যাচ দিয়ে বসেন মিডউইকেটে। ভুলে ভরা ছিল তখন সবকিছুই। এশিয়া কাপের ফাইনালে দেখা লিটনকেই এদিন দেখতে চেয়েছিল বার্মিংহাম। মন্দ হয়নি তার শুরুটাও- সাকিবের সঙ্গে সিঙ্গেলস আর ডাবলসে। হার্দিক পান্ডিয়াকে ৮১ মিটারের ছক্কা হাঁকানোর পর পান্ডিয়ার স্লোয়ারটা পুল করতে গিয়ে শুধু নিজেই আউট হলেন না, তখন দলকেও বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন।

মাঠের একটি দিকের বাউন্ডারি সীমানা ছিল খুব ছোট। রোহিত শর্মা সেদিক দিয়েই চারটি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। সেখানে সৌম্য, লিটন সবাই বাউন্ডারির বড় দিকে খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন। আগের দিন টিম মিটিংয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার পরও ভুল করেছেন সবাই। ভারত যে ম্যাচটি জিতছেই, সেটি ধরে নিয়ে প্রেসবক্সের ভারতীয় লিখিয়েরা ল্যাপটপ খোলেন সাকিব ৬৬ রান করে আউট হয়ে যাওয়ার পর।

কিন্তু এরপর সাব্বির আর সাইফউদ্দিন যখন একের পর এক বাউন্ডারির রাস্তা বের করতে থাকেন, একসময় যখন হিসাব দাঁড়ায় বাংলাদেশকে জিততে ৫০ বলে ৭৭ রান দরকার, হাতে ৪ উইকেট। আইপিএলের বাজারে এই হিসাব খুচরো সবজি কেনার মতোই সহজ! তখন ঘাবড়ে গিয়েছিলেন কোহলিরাও। গ্যালারিতে বাজা হিন্দি গানের সুরও থমকে গিয়েছিল ওই সময় পর্যন্ত। তবে ৩৬ রান করে সাব্বিরের আউট হওয়ার পর আবারও সেখানে মচ্ছব শুরু হয়! স্মোকিং জোনে তখন বাংলাদেশি দর্শকের ভিড়। একে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি তামিমের ক্যাচ মিসের যন্ত্রণাভরা ক্ষোভ।

ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই মুস্তাফিজের শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে বসেন রোহিত। প্রায় পনেরো পা দৌড়ে এসে ক্যাচটি তালুতে নয়, তামিমের বুকে লেগে মাটিতে গড়িয়ে যায়। তামিম তার বাঁ দিকে দৌড়ে যাচ্ছিলেন, হয়তো এ কারণে বলের জাজমেন্টে তার সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের ক্যাচ সেই কোচিংয়ের শুরুতেই শেখানো হয়, যেখানে ক্লাস এইটের ছাত্রকে ভর্তি করা হয়। তাই ক্যাচ মিসের কোনো অজুহাতই মানায় না একমাত্র ‘ক্রিকেটে এমনটা হতেই পারে’ বলা ছাড়া। তা এদিন ফেসবুকেও সেই কথা বলার মানুষ ছিল না। সবাই বুঝে নেয়, কী অমূল্য জিনিসটাই না তামিম অসতর্কতায় ফেলে দিলেন।

ভারতের সঙ্গে প্রতিবারই কোনো না কোনো ছবি দাগ কেটে যায়। ২০১৫ সালে আম্পায়ারের ওই নো বলে হাত তোলা ছবিটা, ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফিতে সৌম্যর শেষ বলের পর মাটিতে শুয়ে পড়ার ছবিটা, এশিয়া কাপে মাশরাফির বুক চাপড়িয়ে লিটনকে ক্রিজে থাকার ছবিটা- আত্মগ্লানির এই অ্যালবামে এবার থাকবে তামিমের ক্যাচ ফসকানোর ছবিটাও! যা দেখার পর সামনের বিশ্বকাপেও ভারতের সঙ্গে মাঠে নামার আগে বলতে হবে ‘সেদিন সূর্যগ্রহণ’ হয়েছিল রাতে। একটি স্বপ্নভাঙার শব্দ শুনেছিল বাংলাদেশ।