যুগপৎ গণআন্দোলনে ১০ দফা বিএনপির


121 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
যুগপৎ গণআন্দোলনে ১০ দফা বিএনপির
নভেম্বর ২৪, ২০২২ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::

সরকারবিরোধী যুগপৎ গণআন্দোলনের ১০ দফা খসড়া তৈরি করেছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে ২৭ দফা রূপরেখার খসড়াও প্রণয়ন করেছে দলটি। একসঙ্গে আন্দোলনে আগ্রহী সমমনা দলগুলোর কাছে গত মঙ্গলবার খসড়া প্রস্তাব দুটি হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আগামীকাল শুক্রবারের মধ্যে দলগুলোর মতামত জানানোর অনুরোধ করেছে বিএনপি। সমমনাদের নতুন কোনো প্রস্তাব থাকলে যৌথ বৈঠকে সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত করা হবে। ঢাকায় আগামী ১০ ডিসেম্বরের আলোচিত মহাসমাবেশে যুগপৎ গণআন্দোলনের ১০ দফা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করতে পারে বিএনপি। একই দিন সমমনা দলগুলো স্ব-স্ব দলীয় মঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা দেবে কিনা- তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে রাজপথে দুর্বার গণআন্দোলনে সরকারবিরোধী দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে স্ব-স্ব ব্যানারে দাবি আদায়ের আন্দোলনের কর্মসূচিও পালন করছে তারা। এখন শুধু যুগপৎ আন্দোলন আনুষ্ঠানিকতার বিষয়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বৈঠক করে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা শেষ করবে বিএনপি। ওই সব বৈঠকের মাধ্যমেই আন্দোলনের দাবি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণার দিনক্ষণ, পদ্ধতিসহ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সূত্র জানিয়েছে, গণআন্দোলনের ১০ দফার খসড়ায় সংসদ বিলুপ্ত করে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ; ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ-এর আলোকে দলনিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন বা অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন; বর্তমান কমিশন বিলুপ্ত করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন; খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও আলেমদের সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহাররের পাশাপাশি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার বন্ধ ও সভা-সমাবেশে বাধা সৃষ্টি না করা; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব কালাকানুন বাতিল; বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, পানিসহ জনসেবার সব খাতে দর বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা; গত ১৫ বছরে বিদেশে অর্থ পাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ারবাজারসহ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করার লক্ষ্যে কমিশন গঠন; গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতি ঘটনার দ্রুত বিচারসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর ও সম্পত্তি দখলের বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে তাঁরা দীর্ঘদিন দেশপ্রেমিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছেন। ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে দেশের মানুষও জেগে উঠেছে। বিএনপির চলমান বিভাগীয় গণসমাবেশগুলোতে সেটার প্রমাণ মিলেছে। শত বাধা-বিপত্তি ও গণপরিবহন বন্ধ করেও মানুষের ঢেউ থামাতে পারেনি। শিগগির সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন। একই সঙ্গে মহাসমাবেশ থেকেই বিনা ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী সরকারের পতনের দাবিতে এক দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করবেন। যোগাযোগ করলে গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচির দাবি-দাওয়া ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা এখনও চূড়ান্ত বলা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করছি। পরস্পরের সঙ্গে মতবিনিময় করছি। তবে অনেক বিষয়ের সঙ্গে আমরা একমত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কবে ঘোষণা করা হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ঘোষণা করলে নিজ নিজ মঞ্চ থেকেই দেওয়া হতে পারে।

সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের জ্যেষ্ঠ নেতারা গতকাল বৈঠকে বসেন। সেখানে বিএনপির দেওয়া গণআন্দোলনের দফা ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। আজ আরেক দফা বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চের সবার মতামত নিয়ে বিএনপিকে জানানো হবে। এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে তাদের বৈঠক হবে, ওই বৈঠকে তা চূড়ান্ত হবে।

বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন সামনে রেখে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ার উদ্যোগের পর যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই পর্বের সংলাপ হয়েছে। সংলাপগুলোতে আন্দোলনের দাবি ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এমনকি সংলাপে মৌখিকভাবে বিএনপির প্রস্তাবিত খসড়া দাবি-দাওয়াগুলোর সঙ্গেও প্রায় একমত পোষণ করে দলগুলো। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা এবং দল সমর্থিত আইনজ্ঞ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং পেশাজীবী নেতাদের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। মতবিনিময়কালে বিশিষ্টজনের কাছ থেকে দেশের সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ নেন তাঁরা। বিশেষ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনের কৌশল ও দাবি এবং রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কারের রূপরেখার বিষয়ে মতামত নেয় দলটি।

দলীয় সূত্র আরও জানায়, সবার মতের ভিত্তিতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গণআন্দোলনের ১০ দফা এবং ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র সংস্কারের ২৭ দফা রূপরেখার খসড়া প্রণয়ন করে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়াল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে খসড়া দাবিনামা ও সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। একই সঙ্গে সরকারবিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে খসড়া প্রস্তাবনা দেখিয়ে তা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই গত মঙ্গলবার গণতন্ত্র মঞ্চের সাতটি দলকে খসড়া দাবি ও সংস্কার প্রস্তাবের লিখিত কপি হস্তান্তর করা হয়। সংশ্নিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে গণআন্দোলনের ১০ দফার এক পৃষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কারের রূপরেখার তিন পৃষ্ঠার খসড়া কপি হাতে এসেছে।

এ ব্যাপারে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, দেশে ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের বিষয়ে আমরা বিরোধী দলগুলো কয়েক দফা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করেছি। অধিকাংশ বিষয়ে আমরা ঐকমত্যও হয়েছি। শিগগির ঘোষণার পদ্ধতি ও দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে।

রাষ্ট্র সংস্কারে ২৭ রূপরেখা :সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন; জাতীয় সমঝোতা কমিশন গঠন; নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন; নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন সংশোধন; জুডিশিয়াল কমিশন গঠন; প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, মিডিয়া কমিশন; ন্যায়পাল নিয়োগ; গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড; নির্যাতনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের বিচার; অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন; ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার- মূলনীতির ভিত্তিতে ধর্ম পালনে পূর্ণ অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান; আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ ও সুষম উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল ও অপ্রয়োজনীয় কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ক্রয় বন্ধ; বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া; দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সুসংগঠিত; যুগোপযোগী ও দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করা; ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকারগুলোকে অধিকার স্বাধীন ও শক্তিশালী করা; নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা প্রণয়ন ও যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া; আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন; নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেওয়া; শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা-ক্যারিকুলামকে প্রাধান্যসহ জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ; ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’- এ নীতির ভিত্তিতে সর্বজনীনি স্বাস্থ্যসেবা প্রবর্তন ও জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ, শ্রমিকদের প্রাইস-ইনডেক্স বেইজড ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা ও শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
সূত্র জানায়, রূপরেখার সূচনায় বলা হয়েছে- দেশের জনগণ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, সে রাষ্ট্রের মালিকানা আজ তাদের হাতে নেই। বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার দেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে। এ রাষ্ট্রকে মেরামত ও পুনর্গঠন করতে হবে। দেশের জনগণের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয়লাভের পর বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার হটানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ‘জাতীয় সরকার’ সংস্কারমূলক ব্যবস্থা নেবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এর আগে দলের জাতীয় সম্মেলনে দেশ গঠনে ‘ভিশন-২০৩০’ দিয়েছিলেন। সে আলোকেই তাঁরা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখার খসড়া প্রণয়ন করেছেন। বিরোধী অন্য দলগুলোও এসব সংস্কারের সঙ্গে প্রায় এক মত। এখন আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।

#