রাতজাগা পাখি সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার


348 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
রাতজাগা পাখি সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার
আগস্ট ১৬, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥
আমরা যারা ঢাকার বাইরে সাংবাদিকতা করি তাদের প্রতি ঢাকা ভিত্তিক সাংবাদিকদের আচরন ভিন্নতর। তাদের কারও কারও ধারনা এরা গাঁও গ্রাম থেকে আসা , গায়ে ভালো শার্ট নেই, প্যান্টের চেহারা মলিন। বলা চলে তাদের গায়ে মাটি মাটি গন্ধ। এভাবে গ্রামবাংলার সাংবাদিকদের অবজ্ঞা করতে থাকায় এক সময় বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির প্রয়াত সভাপতি দৈনিক বাংলার মুন্সিগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা সফিউল ইসলাম পাল্টা গালি দিয়ে বলেছিলেন ‘হ , আমরা হলাম হরিজন ,আর তোমরা বুঝি ব্রাম্মণ’। সফি ভাইয়ের এই জবাব ছিলো সঠিক , যা আমরা সকলেই ধারন করি।
ঢাকার সাংবাদিকদের আমরা যতো সমালোচনাই করি না কেনো সবাই কিন্তু একই কাতারের নন। কারণ ঢাকার সাংবাদিকরা গাঁ গ্রামের সাংবাদিকদের মধ্য থেকে ভালো সাংবাদিককে বেশ চেনেন। প্রকৃতপক্ষে গাঁ গ্রামের সাংবাদিককে জুতো সেলাই থেকে চন্ডি পাঠ পর্যন্ত শিখতে হয়। এমন বিবেচনায় ঢাকার সাংবাদিকরা গ্রামীন সাংবাদিকদের প্রতি সেই শোভন আচরনও করে থাকেন। তাদেরকে কিভাবে আরও ভাল অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা ভাবেন তারা। তাদের বেতন ভাতা কিংবা অন্যান্য সুবিধা প্রদান ছাড়াও এসব সাংবাদিকের পাঠানো রিপোর্ট যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে থাকেন তারা। তাদের পাঠানো রিপোর্ট বেশ আলোচনার ঝড়ও উঠায়।
এমনই একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক , যিনি সাংবাদিকদের গুরু, তাদের অভিভাবক গোলাম সারওয়ার ,যিনি চলে গেলেন, চির নিদ্রায় সমাহিত হলেন তার কথাই বলছি। প্রয়াত সারওয়ার ভাই ছিলেন একজন গুনি মানুষ। তিনি ছিলেন শতভাগ পেশাদার সাংবাদিক। তিনি প্রাণভরে লিখেছেন এবং লিখিয়েছেন জীবনব্যাপী। লেখা দিয়ে দিনের শুরু করেছেন তিনি , আর লেখা দিয়েই রাত শেষ করেছেন তিনি। সকালে চায়ের টেবিলে বসে আগের দিন ও রাতের সংবাদ চিত্র নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করেছেন তিনি। দৈনিক যুগান্তরে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসাবে যোগদানের পর যুগান্তরকে তিনি যেভাবে সাজিয়েছিলেন সেভাবেই রয়েছে যুগান্তর, যার নাম দিয়েছিলেন তিনি ‘ পাঠকের অন্তর জুড়ে যুগান্তর’।আজও সে নাম জ্বল জ্বল করছে সেই ১৯৯৯ সাল থেকে।
গোলাম সারওয়ার ভাইয়ের সাথে কথা বলা ও দেখা সাক্ষাতের খুব বেশি সুযোগ হতো না আমাদের। কারণ আমরা তো সেই গাঁও গেরামের মাটির গন্ধ মাখা সাংবাদিক। তবে সারওয়ার ভাই তা ভাবতেন না। দৈনিক যুগান্তরে যোগদানের আগে তিনি যখন ২৭ বছর ধরে দৈনিক ইত্তেফাকের কিংবদন্তি বার্তা সম্পাদক তখন তার সাথে আমার দুই একবার দেখা অথবা কথা হয়েছে । তাও কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা জাতীয় প্রেসক্লাবে। যুগান্তরের সম্পাদক হবার পর তার সাথে প্রায়ই কথা হতো। তার কাছ থেকে নিউজের ডিকটেশন পেতাম। অ্যাসাইনমেন্ট পেতাম। তার আগে দৈনিক যুগান্তরে আমার পাঠানো সচিত্র রিপোর্ট ‘গ্রাম জুড়ে যেনো দুধের মেলা’ পড়ে ও ছেপে তিনি যারপরনাই খুশী হয়েছিলেন। আমাকে ফোন করে বলেছিলেন তুমি ভালো একটা লেখা লিখেছ। এর কিছুদিনপর ভালুকা চাঁদপুর কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সালেহা আক্তারের ওপর কর্তৃপক্ষের নিপীড়নের রিপোর্ট করেছিলাম। সারওয়ার ভাই লিখতে বলেছিলেন। তিনি এরও প্রশংসা করে বললেন ‘বেশ ভালো হয়েছে। তোমার রিপোর্টটি ফার্স্ট পেজে ছেপে দিলাম’। এই রিপোর্টে সালেহা লাভবান হয়েছিলেন । কলেজে তার পেশাগত সমস্যার সমাধান হয়ে যায় দ্রুতই। সারওয়ার ভাই এভাবে ভালো রিপোর্টের তারিফ করতেন। ভালো রিপোর্টারের প্রশংসা করতেন। নানা সময়ে যুগান্তরের অন্যান্য সাংবাদিককে বলতেন ‘ সাতক্ষীরায় যাও। সুভাষের কাছ থেকে লেখা শেখো’। এমন একাধিক ঘটনা নিয়ে কোনো কোনো এলাকার সাংবাদিকরা আমাকে বলেছেন ‘ সারওয়ার ভাইয়ের সাথে এতো খাতির আপনার’। যুগান্তরে তিনি যতো দিন ছিলেন ততোদিন ঈদ অথবা পূজা এলেই সারওয়ার ভাই টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করতেন। বাড়ির সবার কুশল জানতেন। আমার মনে হতো এটি এক মহার্ঘ। তার এমন টেলিফোন আর পাইনি অনেকদিন। কারণ তিনি চলে গেছেন যুগান্তর ছেড়ে সমকাল এ। আর এবার তো চিরনিদ্রায় গেলেন। হঠাৎ কিছুদিন আগে তার কাছ থেকে ফোন পেয়েছিলাম। বললেন ‘ আমি কাগজ বের করছি। তোমাকে জানাবো। তুমি কিন্তু সব ছেড়ে আমার সঙ্গে থাকবে’। আমি তাতে হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে বলেছিলাম ‘ ্আপনি কাগজ বের করলে আমি থাকবো না , এমনটি ভাবলেন কেনো। অবশ্যই থাকবো’। সেই সারওয়ার ভাই আর কাগজ বের করলেন না। আমারও আর তার সান্নিধ্যে নতুন করে যাওয়া হলো না। গোলাম সারওয়ার ভাই সব সাংবাদিকের সাথে সদাচরন করতেন, তাদের ভুল শুধরে দিতেন। তাদের রিপোর্ট বিষয়ক পরামর্শ দিতেন। ডিকটেশন দিতেন। তিনি রিপোর্টগুলির যে শিরোনাম তৈরি করতেন তা রিপোর্টের বিষয়বস্তুকে অল্প কথায় তুলে আনতো। শিরোনামই পাঠকের মধ্যে চমক সৃষ্টি করতো। ঢাকার পত্রিকায় তীর্যক শিরোনাম লিখবার চমৎকার ক্ষমতা ছিল তার। এজন্য বলা হয় শিরোনাম তৈরিতে গোলাম সারওয়ার ভাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। নিউজ টেবিলে তিনি ছিলেন খুবই মানানসই একজন শশব্যস্ত মানুষ। তাকে বলা হতো ‘সংবাদের ফেরিওয়ালা’। কারণ তিনি বুঝতেন কোন নিউজ কতোটা গুরুত্ব বহন করে। কোন নিউজের সামাজিক রাজনৈতিক মূল্য বেশি। কোনে নিউজের বানিজ্যিক মূল্য বেশি। কোন নিউজ কোথায় কিভাবে কয় কলামে প্রকাশ করতে হবে। এগুলি নির্ধারন করা চাট্টি খানি কথা নয়। গোলাম সারওয়ার ভাই অর্ধ শতাব্দী যাবত সেই কাজই করে গেছেন নির্বিঘ্নে। এভাবে তিনি নানা কাজের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের সবার প্রেরণা। আমাদের অভিভাবক। আমাদের পথ প্রদর্শক। ১৯৬৩ সালে দৈনিক পয়গম দিয়ে তার সাংবাদিকতার শুরু আর ২০১৮ এর মাঝামাঝি দৈনিক সমকাল দিয়ে তার শেষ যাত্রা।
শেষ যাত্রার আগে গোলাম সারওয়ার ভাই একুশে পদক ভূষিত হয়ে দেশের সংবাদজগতকে সম্মানের শিখরে নিয়ে গেছেন। প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ পিআইবির মহাপরিচালক হয়ে তিনি সাংবাদিকতার উৎকর্ষ সাধনে কাজ করে গেছেন। তিনি সম্মানিত হয়েছেন নানা পুরস্কারে নানা পদকে। দিনের ক্লান্তি শেষে মানবকুল যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন তখন গোলাম সারওয়ার একদল কর্মী নিয়ে রাতজাগা পাখির মতো কাজ করেছেন। প্রতিটি নিউজের আপডেট নিয়েছেন। কারণ কাকডাকা ভোরে পাঠকের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য তার হাতে তুলে দিতে হবে তরতাজা খবরের ডালি। দৈনিক যুগান্তরে থাকাকালে প্রত্যুষে তিনি তার মননে প্রকাশিত ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ শীর্ষক খবর পাঠকদের উপহার দিয়ে ভালো কিছুর প্রত্যাশায় শুরু করতেন দিনের কাজ। সমাজের নানা অঘটন দুর্ঘটনকে পেছনে ফেলে ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ কলামে তিনি উঠিয়ে আনতেন ‘লাউ বেচে কৃষকের লাখপতি হবার কাহিনী’, ‘আমার সন্তান যেনো থাকে দুধেভাতে’,‘মাছের বিপ্লব এনেছে প্রাণ’ ,‘ক্ষেতে কৃষকের হাসির ফোয়ারা’ ‘বাংলাদেশ এখন ইমারজিং টাইগার’ এমন শত শত সুসংবাদ।
প্রিয় গোলাম সারওয়ার আর সেই সুসংবাদগুলি লিখবেন না। প্রিয় মাতৃভূমিকে স্যালুট জানাতে লিখবেন না ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’। কাউকে লিখতে বলবেনও না। সেই তীর্যক শিরোনাম লিখে তিনি নিজে আর শিরোনাম হবেন না। অনন্তলোকে বসে তিনি শুধুই দেখবেন তার রেখে যাওয়া সংবাদকর্মীদের চারন।
—–সুভাষ চৌধুরী , সাতক্ষীরা করেসপনডেন্ট , দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি।