রেকর্ড উৎপাদন, তবু সংকট


133 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
রেকর্ড উৎপাদন, তবু সংকট
অক্টোবর ১৪, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

চাল মজুদদার ও মিল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান

অনলাইন ডেস্ক ::

গত ১১ বছরের মধ্যে দেশে এবার সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। রেকর্ড পরিমাণ এই খাদ্যশস্য উৎপাদন হওয়ার পরও ধান-চাল সংগ্রহে সংকটে পড়েছে সরকার। খাদ্য বিভাগের সঙ্গে চুক্তি করেও অনেক মিল মালিক শর্ত অনুযায়ী চাল সরবরাহ করেননি। উল্টো তারা ধান কিনে মজুদ করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র বলছে, খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান দেননি এবার। ফলে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এখন মিল মালিক, মজুদদার ও ব্যবসায়ীদের মজুদ দিয়েই সরকার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এদিকে, সরকার চালের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে অস্থিরতা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে মজুদদার ও মিল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে খাদ্য বিভাগ ও প্রশাসন।
সরকারি সূত্র জানায়, বোরো মৌসুমে সরকারের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় আমন মৌসুমে সে লক্ষ্য পূরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আগামী ১৮ অক্টোবর খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে মজুদ, সংকট, আমদানিসহ ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমন সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা এবং দামও নির্ধারণ করা হবে এই বৈঠকে।
খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চালের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকে কার্তিক মাসে। অগ্রহায়ণে নতুন ফসল ওঠার আগে কার্তিক মাসে সবসময়ই বাজার থাকে চড়া। কিন্তু এবার আশ্বিনেই বাজারে কার্তিকের প্রভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবেই বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। বেসরকারি হিসাবে বাজারদর আরও বেশি। এ অবস্থায় খাদ্য মন্ত্রণালয় যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেভাবে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বরং শিগগির কিছু চাল আমদানি করা উচিত। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরাও (ডিসি ফুড) সরকারকে চাল আমদানির পরামর্শ দিয়েছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ও চাল আমদানির জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে রেখেছে। তবে খাদ্য বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আমনের আগে চাল আমদানি করবে না সরকার।
জানা যায়, খাদ্য সংকট পূরণে অবৈধভাবে মজুদ ধান-চাল উদ্ধারের জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। এরপর অবৈধ মজুদ ধান-চাল উদ্ধারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান শুরু করেছে সংশ্নিষ্ট জেলা ও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ খাদ্য ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। যেসব ব্যবসায়ী, মজুদদার ও মিল মালিক অবৈধভাবে ধান-চাল মজুদ রেখেছেন, তাদেরকে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। খাদ্যমন্ত্রীর নিজ জেলা নওগাঁয় অবৈধভাবে মজুদের কারণে ২৪টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার জে কে রাইস মিলকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ মিলে এক হাজার টন ধান মজুদ ছিল। অবৈধভাবে ধান ও চাল মজুদ রাখায় র‌্যাবের সহযোগিতায় প্রশাসন সদর উপজেলার রুবেল অটো রাইস মিল এবং উলিপুর এলাকায় মেসার্স সাহা অটো রাইস মিলে অভিযান চালায়। এই দুটি মিলে তিন হাজার ৩৫০ টন ধানের মজুদ পায় অভিযানকারীরা। অবৈধভাবে ধান ও চাল মজুদ রাখায় রুবেল অটো রাইস মিলের মালিককে ৭০ হাজার টাকা এবং সাহা অটো রাইস মিলের মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একইভাবে জয়পুরহাট জেলার একটি বাজারের মেসার্স মুইম আলম ট্রেডার্সকে এক লাখ টাকা, মেসার্স সিমু ট্রেডার্স ও মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্সকে ৭০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। যেসব জেলায় বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে, সেসব জেলায় এভাবে প্রতিনিয়তই অবৈধ মজুদ ধান উদ্ধার ও জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব জেলায় মিল মালিকরা বেশি পরিমাণ চাল উৎপাদন করেছে, তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। কয়েকজন মিল মালিককে জরিমানাও করা হয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, দেশে গত ১১ বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। এরপরও সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। উৎপাদিত খাদ্যশস্য নষ্ট বা গায়েবও হয়নি। দেশের মধ্যেই রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে ধান-চাল মজুদ রেখেছেন। তিনি বলেন, আমার নিজ এলাকা নওগাঁয় বন্ধ মিলগুলোতে হাজার হাজার টন চাল ও ধান মজুদ রয়েছে। কৃষকদের কাছে দুই শতাংশ ধানও নেই। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে জানা গেছে, মিল বন্ধ, লাইসেন্সও নবায়ন করেনি অথচ সেসব মিলেও ধান মজুদ রয়েছে। অবৈধ মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছে।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো মিল মালিক বাজার থেকে ধান ক্রয় করে ৩০ দিনের বেশি এবং চাল তৈরি করে ১৫ দিনের বেশি মজুদ রাখতে পারবেন না। এই নিয়ম ভঙ্গ করে যারা ধান ও চাল মজুদ রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস এম তাহসিনুল হক বলেন, কয়েকজন মিল মালিক সরকারি আদেশ অমান্য করে চালের দাম বাড়িয়েছিলেন, তাদের সতর্ক করা হয়েছে। এখন প্রতিনিয়ত নজরদারি করা হচ্ছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা নিয়মিত আমাদের কাছে তথ্য নিচ্ছে। অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করছে। এ রকম আরও বেশ কয়েকজন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অভিযোগ করেন, প্রতিনিয়ত অবৈধ মজুদদারদের জরিমানা করা হচ্ছে। খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলীর দাবি, তারা নিয়ম মেনেই ধান ও চাল মজুদ করেন। কোনো মিলেই অতিরিক্ত মজুদ থাকে না। আমার জানা মতে কোনো মিলেই হিসাবের বেশি চাল নেই। মিলারদের কাছে কী পরিমাণ চাল আছে সরকারের কাছে সে হিসাবও আছে। অতিরিক্ত রাখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগ বলছে এবার রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে। এর পরও বাজারে চালের দাম বেশি। এ জন্য অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য সরকারকে মিল মালিকরা নিজেই অনুরোধ করেছে। তিনি বলেন, এবার করোনা সংকটে প্রচার হয়েছে- সারাবিশ্বে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। এ ভয়ে অনেকে মজুদ করে রাখতে পারে। তবে অবৈধ মজুদ উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলে সব চাল-ধানের সন্ধান পাওয়া যাবে। এদিকে সরকারের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি তেমন ভালো নয়। গত বছর ৮ অক্টোবর সরকারের গুদামে ১৩ লাখ ৯৩ হাজার টন চাল ছিল। একই সময়ে এখন সেটি ৯ লাখ ৩৩ হাজার টন।
সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন :করোনাকালে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছিল বোরো ধানের উৎপাদন নিয়ে। সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে এবার রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে দুই কোটি এক লাখ ৮১ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে। যা অন্যান্য অর্থবছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। আগের দুই বছর বোরো উৎপাদন ছিল এক কোটি ৮৬ লাখ টন। এ বছর আমন উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৫৫ লাখ ২ হাজার টন। আগের বছর আমন হয় এক কোটি ৩৩ লাখ টন। দীর্ঘ বন্যায় দুই লাখ টন ধান নষ্ট হওয়ার পরও চলতি আউশ মৌসুমে ৩০ লাখ ১২ হাজার টন আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বোরো, আউশ ও আমন মিলে চাল উৎপাদন হয়েছে তিন কোটি ৮৬ লাখ ৯৬ হাজার টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল তিন কোটি ৭৩ লাখ ২৮ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিন কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন কোটি ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিন কোটি ৪৮ লাখ ৮১ হাজার টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তিন কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তিন কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে তিন কোটি ৩৮ লাখ ৩৩ হাজার টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে তিন কোটি ৩৮ লাখ ৯০ হাজার টন, ২০১০-১১ অর্থবছরে তিন কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার টন, ২০০৯-১০ অর্থবছরে তিন কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টন।
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান বলেন, চাল উৎপাদনের পরিসংখ্যান কতটুকু সঠিক তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। সরকারের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী মানুষ হিসাব করলে খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। তার পরও চালের দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, অভিযান চালিয়ে ও চালের দাম নির্ধারণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কারণ, একেক চালের একেক রকম দাম। আর অধিদপ্তরের সেই সক্ষমতাও নেই। অভিযান করলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। সামনে যত সময় আসবে চালের দাম বাড়বে। তাই কম হলেও শিগগির চাল আমদানি করা উচিত। আমদানি করলে ব্যবসায়ীরা মজুদ চাল এমনি ছেড়ে দেবেন। এদিকে আমন ধান আসবে, আবার আমদানি করলে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা চাপে থাকবে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, সরকারের নির্ধারিত দামে মিল মালিকরা চাল বিক্রি করছেন না। এ জন্য কৃষি বিপণনও অভিযান পরিচালনা করছে। সাধারণ মানুষের জন্য চালের দাম আরও কমানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার এ বছর বোরোর মতো গম সংগ্রহ অভিযানেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ২৮ টাকা কেজি দরে ৭৫ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৪ হাজার ৪০০ টন গম সংগ্রহ হয়েছে। বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের শেষ দিন ছিল ৩১ আগস্ট। তবে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও সংগ্রহ করতে পারেনি সরকার। এ কারণে সময় আরও ১৫ দিন বাড়িয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর করা হয়। সর্বশেষ সময় পার হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি রয়েছে ১০ লাখ টনের ওপর।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম সমকালকে বলেন, আমনে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা উৎপাদন কম হলে আমদানি করা হবে। এ মুহূর্তে আমদানি করলে বিরোধী দলও বলবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন দেশ এখন আমদানি করছে। আতঙ্ক ছড়াবে। সার্বিক বিষয়ে আগামী ১৮ অক্টোবর এফপিএমসির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ বলেন, কিছু নব্য পাইকারি ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে, তারা অবৈধভাবে ধান-চাল মজুদ করে রেখেছেন। এ জন্য কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভয়ে তারা মজুদ ধান-চাল ছেড়ে দিচ্ছেন।