রোহিঙ্গাদের কারণে সৌদিতে বাংলাদেশিদের দুর্ভোগ


344 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
রোহিঙ্গাদের কারণে সৌদিতে বাংলাদেশিদের দুর্ভোগ
আগস্ট ২১, ২০১৫ প্রবাস ভাবনা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের কারণে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপাকে পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে জাল পাসপোর্ট ব্যবহার, ওমরাহ করতে এসে থেকে যাওয়া, চুরি, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কুত্সা রটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাদের অপরাধের দায় এসে পড়ছে বাংলাদেশিদের ওপর। যার কারণে সৌদি সরকার বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা নবায়ন, ইস্যু, আকামা নবায়ন ও কফিল পরিবর্তনের মতো বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। রোহিঙ্গারা কম টাকায় কাজ করছে। সে জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকরাও কম টাকায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

সৌদি আরবের প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানান, বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের কারণে দুর্ভোগে আছেন তারা। বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে গিয়ে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন রোহিঙ্গারা। আবার অনেকে জেদ্দার বাংলাদেশ দূতাবাসে দালালদের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট। রোহিঙ্গাদের প্রতি সৌদি সরকার বিশেষভাবে সদয় হওয়ার কারণে কাজের স্থান, ‘আকামা’ (কাজের অনুমতিপত্র) নবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এখন বাংলাদেশিরা। সৌদি কর্তৃপক্ষ গত রমজান মাসে এক ফরমানে সেদেশের কোম্পানিগুলোতে রোহিঙ্গাদের চাকরি প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে। বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি ১০ জন কর্মীর মধ্যে ১ জন রোহিঙ্গা রাখতে বলা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের যারা বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করছেন তাদের অনেককে ছাঁটাই করে সেখানে রোহিঙ্গাদের চাকরি দেয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। আবার রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তাদের দায়ভার এসে পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। সৌদি প্রবাসীদের অভিযোগ, দেশটিতে ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার হাতে এখন বাংলাদেশের পাসপোর্ট। গত রমজানের আগে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ওমরাহ ভিসা নিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার পর রোহিঙ্গারা আর ফিরে আসেননি। ফলে এখনো বন্ধ আছে ওমরাহ ভিসা। পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ভিসাধারী ফিরে না আসায় গত রমজানে কেউ ওমরাহ করতে যেতে পারেননি। বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় এই ফিরে না আসাদের রোহিঙ্গা বলে চিহ্নিত করেছেন। যে সব হজ রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশি পাসপোর্টে ওমরাহ ভিসা লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছিল তাদের চিহ্নিত করে শো-কজ করা হয়েছিল। তারপর আর কিছু হয়নি।

এ সম্পর্কে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি   আরবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য এখন একটি বড় সমস্যা। জনশক্তি রপ্তানি বন্ধের পেছনে তারা একটি বড় কারণ। সমস্যা সমাধানে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রবাসীকল্যাণ ও আইন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। এ সমস্যা সমাধানের একটা উপায় বের করার চেষ্টা চলছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত রোহিঙ্গা সন্দেহে ২৮২ ব্যক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে বাধা দেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে মিয়ানমার থেকে বহিষ্কারের লক্ষ্যে সে দেশের সেনাবাহিনী ‘অপারেশন পাই থায়া’ বা ‘পরিষ্কার ও সুন্দর জাতি অপারেশন’ নামে দ্বিতীয় অভিযান শুরু করে ১৯৯১ সালে। সেই সময় দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে চলে আসে। পর্যাপ্ত খাদ্য ও ওষুধ ছাড়াই ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশের অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছে। কারো মতে এ সংখ্যা ৫ লাখেরও বেশি। সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৫ লাখ। বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশি পাসপোর্ট জোগাড় করে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে চলে যায়।

তাদের অনেকেই উন্নত জীবনযাপনের আশায় এখান থেকে পাড়ি জমায় সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। সম্প্রতি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে শত শত গণকবর আবিষ্কার এবং সাগরপথে নৌকায় করে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং খাদ্য-বস্ত্রহীন অবস্থায় সাগরে ভেসে বেড়ানোর ঘটনায় পুরো বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মুসলিম দেশ হিসাবে সৌদি আরব মিয়ানমারে অধিকারহারা এবং নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি সৌদি আরবে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমোদন পেতে শুরু করেছেন রোহিঙ্গারা।

আরব নিউজের খবরে বলা হয়েছে, সৌদি আরব এই প্রথম বারের মতো সরকারিভাবে বর্মী মুসলমানদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দিতে শুরু করবে। বর্মী নাগরিকদের সৌদি আরবের অস্থায়ী নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয় অনুমোদন করার জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। মক্কার গভর্নরের অফিসের মাধ্যমে তাদের বসবাসের অনুমোদন দেয়া হবে। বর্মী মুসলিম কো-অর্ডিনেটর জেনারেল আইয়ুব আল জামাল বলেন, নাগরিকত্বের ব্যাপারে অনুমোদন দেয়ার কথা থাকলেও অগ্রিম পদক্ষেপ হিসেবে ৫৪০ জনকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, আনুমানিক ৪ লাখ বর্মী মুসলমান বা রোহিঙ্গা সৌদি আরবে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগেরও কম অবিবাহিত। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে দেশটিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ২ লাখ ৪০ হাজার। উক্ত কমিটি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সৌদি স্কুলসমূহে অধ্যয়নরত রোহিঙ্গা বাবা-মায়ের সন্তানদের তালিকা  তৈরি করবে। আগামী ৪ বছর বসবাসের জন্য কোনো রকম অর্থ ব্যয় ছাড়াই তাদের অনুমতি দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পর তাদেরকে স্থায়ীভাবে বাস করার অনুমতি দানের এই উদ্যোগ নেয়া হলো।

সৌদি আরবে বসবাসের অনুমতি দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনটি শহরে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ওপর জরিপ চালানো হয়। একটি বিশেষ কমিটি মক্কা শহরের কুদাইয়ের একটি কার পার্কে স্থাপিত সেন্টারে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার কাজ শুরু করে।

মক্কার বাংলাদেশি সংগঠক ও ব্যবসায়ী  ফিরদৌস চৌধুরী মিঠু ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের দাপটে এখন প্রবাসীরা কোণঠাসা। বাংলাদেশের যারা বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করছেন তাদের অনেককে ছাঁটাই করে সেখানে রোহিঙ্গাদের চাকরি দেয়া হচ্ছে। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের। সৌদি আরবের মক্কায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আলাপকালে তারা অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশিদের ‘আকামা’ (কাজের অনুমতিপত্র) নবায়নের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ সময় নিলেও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তারা উদার। বাংলাদেশিদের দুই বছরের আকামা পাওয়া কষ্টকর হলেও রোহিঙ্গাদের অনায়াসে চার বছরের আকামা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।