রোহিঙ্গা সংকট : ভারত রাশিয়া চীনের নীরবতায় হতাশা


111 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
রোহিঙ্গা সংকট : ভারত রাশিয়া চীনের নীরবতায় হতাশা
জানুয়ারি ২৮, ২০২০ প্রবাস ভাবনা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নে ওআইসিকে সঙ্গে নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

অনলাইন ডেস্ক ::

রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) ঐতিহাসিক আদেশ নিয়ে ভারত, চীন ও রাশিয়া কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর বিষয়টি হতাশার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভারতের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না থাকার বিষয়টি সবচেয়ে হতাশাজনক বলে বাংলাদেশের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র আরও জানায়, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতের এ আদেশ মিয়ানমার উপেক্ষা করলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে যাবে। সে ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া আগের অবস্থানে থাকলে আদেশটি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত কখনই রোহিঙ্গা ইস্যুতে সক্রিয় অবস্থানে ছিল না। দেশটি সব সময়ই কৌশলগত অবস্থানে থেকেছে এবং এ রায়ের ক্ষেত্রেও কৌশলগত অবস্থানে থেকেই প্রতিক্রিয়াহীন রয়েছে। তবে এ আদেশের ফলে চীনের ভূমিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তারা বলেন, আগামী ছয় মাস ওআইসিকে সঙ্গে নিয়ে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকাকে সংকট সমাধানের দিকে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার একটা বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আদেশের ব্যাপারে ভারতের একটা প্রতিক্রিয়া আমরা আশা করতেই পারি। ভারত হয়তো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে এবং থাকবে।

এ আদেশের ব্যাপারে তারাও হয়তো পর্যবেক্ষণেই রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আইসিজের আদেশের পর ভারতের একটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকলে তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। প্রতিক্রিয়া না দেখানোর বিষয়টি তাই বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস তৈরি করেছে।

সূত্র আরও জানায়, ভারত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যও নয়। ফলে ভারতের চেয়ে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিশ্ব আদালত ২৩ জানুয়ারি মিয়ানমারের জন্য যে চারটি করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, মিয়ানমার তা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে ওই আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যাবে। এ ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ প্রতিপালন না করার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে ভোটাভুটি হবে। ওই ভোটাভুটির ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া আগের মতো ভেটো দিলে পুরো আদেশটিই কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে। ফলে আদেশের পর চীন ও রাশিয়ার নীরব অবস্থান হতাশা তৈরি করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, ভূ-কৌশলগত স্বার্থের বিবেচনা থেকেই ভারত বরাবর রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে নিশ্চুপই থেকেছে। এ অঞ্চলে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দু’পক্ষের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক রেখে তার স্বার্থের বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ওই স্বার্থের বিষয়টি সামনে এলে ভারত স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গা সংকট ইস্যু থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ফলে ভারতের কাছ থেকে আদেশের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া আসবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে বাংলাদেশের নতুন করে হতাশ হওয়ারও কিছু নেই। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের নেপথ্যের কারণটি ভিন্ন। মিয়ানমারের ওপর চীনের ঐতিহাসিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ অঞ্চলে চীনের ভূ-কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা পরিস্কার। এ ক্ষেত্রে পুরো এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতরে একটা প্রতিযোগিতা এবং দ্বন্দ্বও রয়েছে। এ দ্বন্দ্বের কারণে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীনের অবস্থান স্পষ্ট।

রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতেও চীনের এখনকার অবস্থানের বড় কারণ এটাই। আর রাশিয়ার অবস্থানের কারণ এ অঞ্চলে অস্ত্রের বাজার। সেই অস্ত্রের বাজারের বিবেচনায় মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া। কারণ, সেখানে তাদের অস্ত্রের বাজার বড় এবং আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে সামনের দিনগুলোতে। একই সঙ্গে রাশিয়ার অস্ত্রের বাজার ভারতে সম্প্রসারণের বিষয়টিও আছে। এখন পর্যন্ত যে অবস্থা, তাতে আদেশটি নিরাপত্তা পরিষদে গেলে চীন ও রাশিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা আশা করা যায় না।

এই আন্তর্জাতিক বিশ্নেষক আরও বলেন, তবে বাংলাদেশের সামনে একটা বড় সুযোগ আছে। গাম্বিয়ার মামলাটি হয়েছে ওআইসির মাধ্যমে এবং ওআইসিভুক্ত কয়েকটি দেশে রাশিয়ার অস্ত্রের বড় বাজার রয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশের সামনে একটা ভালো সুযোগ এসেছে। বাংলাদেশ আগামী ছয় মাস ওআইসিকে সঙ্গে নিয়ে রাশিয়া ও চীনকে ইতিবাচক ভূমিকায় আনতে বিশেষভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে। এই কূটনৈতিক তৎপরতার কৌশল ও রূপরেখা বাংলাদেশকেই তৈরি করতে হবে এবং সফলতাও বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করছে। ফলে এখানে যথেষ্ট আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ড. ওয়ালিউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ভারত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নয়। সে কারণে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ভাবার চেয়ে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকার প্রতিই গুরুত্ব দিতে হবে বেশি। তবে আদেশের পর রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে চীনের ভূমিকায় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়। কারণ, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যার বিষয়টি স্বীকৃত হয়ে গেছে। ফলে মিয়ানমার আদালতের বেঁধে দেওয়া চারটি করণীয় প্রতিপালন না করলে তাদের ওপর পশ্চিমা একাধিক দেশের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।

তিনি বলেন, সংগত কারণেই চীন এখন নিষেধাজ্ঞা চাইবে না। ফলে তারা মিয়ানমারকে সংকটের দ্রুত সমাধানের জন্য চাপ দিতে পারে। একই কারণে বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে গেলে সেখানেও চীনের ভেটো না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। চীন ভেটো না দিলে রাশিয়াও ভেটো দেবে না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছুই।