লাল-সবুজের বিজয় : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি


622 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
লাল-সবুজের বিজয় : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
ডিসেম্বর ১৫, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

index

নাজমুল হক :

১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয় দিবস। ৪৪ বছর পূর্বে এই দিনে ৩০ লাখ তাজা প্রাণের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে রক্তস্নান লাল-সবুজ পতাকার আশ্রয়স্থল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতিরই বিজয় দিবস তাদের ইতিহাসের স্বর্ণক্ষরে লেখা। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক এই দিনটি বাঙালি জাতির গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসার গর্ব ও আনান্দের তাৎপর্য বহন করে। বিজয়ের চার দশক পার হলেও বাঙালির প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয় নি। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ হলেও মানুষ বর্তমানে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি, মানবধিকার প্রতিষ্ঠা হয় নি। বন্ধ হয় নি ঘুষ, দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি, তৈরি হয়নি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছেন “ শুধু ভিক্ষা করে কখনও স্বাধীনতা লাভ করা যায় না। স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় শক্তি দিয়ে, সংগ্রাম করে। স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয় রক্ত দিয়ে”। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উৎপত্তির পর পাকিস্তানীরা বাঙালিদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন পঙ্গু করতে চেয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্থানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভায় ঘোষনা দেন “ঁৎফঁ ধহফ ঁৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ ঢ়ধশরংঃশয”. এরপর থেকেই মূলত স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুতে রোধ করার জন্য গঠিত হয় “সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ”।
১৯৫২ সালে পুনরায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ছাত্রজনতা পুনরায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠে। ২১ ফেব্রংয়ারি আন্দোলনকে স্তিমিত করার জন্য পুলিশ ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সালাম, জব্বার, রফিক, শফিকসহ নাম না জানা আরো অনেকে। মূলত সেখান থেকেই শুরং হয় স্বাধীনতার আন্দোলন। বাঙালির স্বঅধিকার আদায়ের জন্য লহোরে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবী উৎথাপিত হয়। ১৯৮৬ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে আটক করা হয়। এর রেশ ধরে শুরং হয় তীব্র আন্দোলন। অতঃপর গনআন্দোলনের মুখে তাকে ১৯৬৯ সালে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরষ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্থানী শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহনা করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে মানুষকে স্বাধীনতা পক্ষে স্বপ্ন দেখান। স্বাধীনতা বিজয়ের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়া আহবান জানান। সারা বাংলায় শু হয় তুমুল আন্দোলন। ২৫ মার্চ কালো রাতের অন্ধকারে পাক-হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে বিপর্যস্থ জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ রোপিত হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহম্মেদ এর নেতৃত্বে মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়। পাক বাহিনী তখন আরো মরিয়া হয়ে উঠে। অসহায় বাঙালিরা দলে দলে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে থাকেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী নেতৃত্বে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এ দেশের অগনিত ছাত্র-জনতা, পুলিশ-ইপিআর, আনছারসহ সর্ব শ্রেণী পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। মুক্তি বাহিনী গেরিলা যুদ্ধের পদ্ধতি অবলম্বন করে শত্রুদের বিপর্যন্থ করতে থাকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের কারণে দেশের ভিতর শত্রু হনন করতে থাকে মুক্তিবাহিনী। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস মুক্তি সংগ্রাম চরম আকার ধারণ করে। সময়ের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলা শত্রুমুক্ত হতে থাকে। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক নতুন দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় হয়। এ দিন বিকাল ৫টা ১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের পক্ষে লে.জে. নিয়জী পাকিস্থানের পক্ষে আত্মসমার্পনের দলিলে স্বাক্ষর করে। অর্জিত হয় লাল সবুজের পতাকার দেশ।
এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রম হঠাৎ এক দিনে দানা বাধে নি। বস্তুত নিরন্তন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত হয় বিজয়। শেষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, একটি উদার ও সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী মুক্তি আন্দোলন, নারী শিক্ষার প্রসার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে নিঃশ্বেস করাসহ ন্যায়ভিত্তিক দেশ পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে দেশের বহুল প্রত্যাশিত সংবিধান রচিত হয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আত্মত্যাগ এবং দু‘লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের বিজয় অর্জিত হলেও জনগণের লালিত স্বপ্ন ও অর্থনৈতিক মুক্তি আজো অর্জিত হয় নি। ঘুষ-দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফিতির আবার্তে জনজীবন আজ দুর্বিসহ ও বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। বার বার হোঁচট খাচ্ছে গণতন্ত্র। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যারা বাংলাদেশকে নিচের দিকে নামাচ্ছে তারা এখনও নির্মূল হয় নি। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠা পায়নি। আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন ও সুবিধা আজো স্পর্শ করতে পারেনি, পারিনি সামাজিক অধিকার ও সার্বজনীন মানবধিকার নিশ্চিত করতে। যে অর্থনৈতিক মুক্তি ছিল বিজয়ের অন্যতম প্রত্যাশা-বিগত চার দশকে তার পূরণ হয়েছে সামান্য। শিল্পের বিকাশ ও প্রসার ঘটেছে নগন্য। আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্লগ হওয়ায় বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি নি। এ দেশের ৩১ দশমিক ৫ ভাগ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। বর্তমান সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস অক্টোপাসের মত জেকে বসেছে। এখনও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের শক্তি বিভিন্ন ভাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় জাতি আজো কলঙ্ক

মুক্ত হতে পারছে না। ফলে আমরা ক্রমশ বিশ্বের কাছে পিছিয়ে পড়ছি।
এরপরেও আমদের প্রাপ্তি কোন অংশে কম নয়। বাংলাদেশ নি¤œ ম্যধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করছে। রোগ ব্যাধির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে মানুষের গড় আয়ু আরো বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদাচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে, কমেছে দরিদ্রতা। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসাবে নির্বাচন ব্যবস্থা আরো স্বচ্ছ ও সু-প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্থায়ী হয়েছে বহু দলীয় ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি বার বার হোচট খেলেও চলছে ধীর গতিতে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাধ্যমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করা হয়েছে। বিজয় দিবস সমগ্র জাতিকে জাগিয়ে তুলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁদি দিয়ে জাতিকে কলঙ্ক মোচন করা হয়েছে। বিজয় দিবস জাতিকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, অত্যাচার ও শেষণের কালো হাত গুড়িয়ে দিতে, অধিকার আদায়ে আত্ম সচেতন করে তোলে। বিজয় সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের যুব সমাজকে সত্য ও ন্যায়ের পথে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যায় যোগায়। এ দিবসে উঁকি দেয় নতুন ক্ষুধা-দারিদ্র, ঘুষ-দুর্নীতি, সন্ত্রাস মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।—