লাল-সবুজ মানচিত্রের ৪৮ বছর


105 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
লাল-সবুজ মানচিত্রের ৪৮ বছর
মার্চ ২৫, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক ::

পৃথিবীর প্রত্যেক জাতিরই স্বাধীনতা তাদের ইতিহাসের স্বর্ণক্ষরে লেখা। ৪৮ বছর পূর্বে এই দিনে মুক্তিকামী মানুষ পৃথিবীর মানচিত্রে রক্তস্নান লাল সবুজ পতাকার আশ্রয়স্থল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। পাকিস্থানী হায়ানাদের গণহত্যার পরে মানুষ ঘুরে দাড়িয়ে ডাক দেয় স্বাধীনতার।
‘এক নদী রক্তের বিনিময়ে’ পাকিস্তানি হানাদার-দখলদার বাহিনী, তাদের দেশীয় অনুচর রাজাকার-আলবদও বাহিনী ও বিদেশি মদতদাতা, অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশ, সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র প্রমুখ শক্তিকে পরাজিত করে বাঙ্গালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। বিজাতীয় শাসনের নাগপাশকে ছিন্ন করে সেদিন পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক এই দিনটি বাঙ্গালী জাতির জন্য গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসার গর্ব ও আনান্দের তাৎপর্য বহন করে।
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছেন “ শুধু ভিক্ষা করে কখনও স্বাধীনতা লাভ করা যায় না। স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় শক্তি দিয়ে, সংগ্রাম করে। স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয় রক্ত দিয়ে”। আর বাঙালি জাতি তাদের সেই কাঙ্খিত স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলো।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে মানুষকে স্বাধীনতা পক্ষে স্বপ্ন দেখান। স্বাধীনতা বিজয়ের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়া আহবান জানান। সারা বাংলায় শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ২৫ মার্চ কালো রাতের অন্ধকারে পাক-হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে বিপর্যস্ত জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বোপিত হয়। ২৬ মার্চ চট্টগামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র পাঠ করেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহম্মেদ এর নেতৃত্বে মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়। পাক বাহিনী তখন আরো মরিয়া হয়ে উঠে। অসহায় বাঙ্গালীরা দলে দলে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে থাকেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী নেতৃত্বে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এ দেশের অগনিত ছাত্র-জনতা, পুলিশ-ইুপআর, আনছারসহ সর্ব শ্রেণী পেশার মানুস মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। মুক্তি বাহিনী গেরিলা যুদ্ধের পদ্ধতি াবলম্বর করে শতুদের বিপর্যন্থ করতে থাকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের কারণে দেশের দেশের ভিতর শত্র“ হনন হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস মুক্তি সংগ্রাম চরম আকার ধারণ করে। সময়ের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলা শত্র“মুক্ত হতে থাকে। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক নতুন দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় হয়।
বিশিষ্ট লেখক সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেছেন, “আলোক ব্যতীত যেমন পৃথিবী জাগে না, তেমনি স্রোত ব্যতীত যেমন নদী টেকে না, তেমনি স্বাধনিতা ব্যতীত কোন জাতি কখনও বাঁচিতে পারে না”।
এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম হঠাৎ এক দিনে দানা বাধে নি। বস্তুত নিরন্তন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত হয় বিজয়। শোষনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, একটি উদার ও সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী মুক্তি আন্দোলন, নারী শিক্ষার প্রসার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ভোটের স্বাধীনাতা, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে নিঃশ্বেস করাসহ ন্যায় ভিত্তিক আদর্শে ১৯৭২ সালে বিজয়ী দেশের বহুল প্রত্যাশিত সংবিধান রচিত হয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আত্মত্যাগ এবং দু‘লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের বিজয় অর্জিত হলেও জনগণের লালিত স্বপ্ন ও অর্থনৈতিক মুক্তি আজো অর্জিত হয় নি। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফিতির আবার্তে জনজীবন আজ দুর্বিসহ ও বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে জনজীবনে বিরাজ করছে হতাশা ও নৈরাজ্য। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠা পায় নি। আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন ও সুবিধা আজো স্পর্শ করতে পারে নি, পারে নি সামাজিক অধিকার ও মানবধিকার নিশ্চিত করতে। যে অর্থনৈতিক মুক্তি ছিল বিজয়ের অন্যতম প্রত্যাশা-বিগত চার দশকে তার পূরণ হয়েছে সামান্য। শিল্পের বিকাশ ও প্রসার ঘটেছে নগন্য। আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত শ্লগ হওয়ায় বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দাড়াতে পারি নি। এ দেশের ৪৭ দশমিক ৬ ভাগ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। বর্তমান সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস অক্টোপাসের মত জেকে বসেছে। এখনও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের শক্তি বিভিন্ন ভাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। জঙ্গি আল বদও আল সামস শক্তি বিভিন্ন ভাবে জানান দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ৪৮ বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব ও তার মূল্যায়ন দু’ভাবে করা যায়। এক হলো, যদি এখনো আমাদেরকে পাকিস্তানের অংশ হয়ে জাতিগত শোষণের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতে হতো, তাহলে আমরা সম্ভবত যে অবস্থায় থাকতাম বলে অনুমান করা যায়, তার তুলনায় বর্তমানে আমরা কি সার্বিক বিচারে ভালো আছি, নাকি খারাপ। সেই মানদন্ডে এই বিচারে, মুহূর্তকাল দ্বিধা না করে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য যে, পাকিস্তানে থাকলে এতোদিনে আমাদের যে হাল হতো তার চেয়ে আমরা অনেক ভালো আছি, সব দিক থেকে এগিয়ে আছি ঐ দেশ থেকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি কোন ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে নেই। এটি কেবল স্বাধীনতার আবেগ, আত্মমর্যাদার অনুভূতি ও স্বদেশিকতা-দেশ প্রেমের চেতনার অমূল্য সম্পদ প্রাপ্তির হিসাবেই নয়। পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রটির বাস্তব হাল-হাকিকত এখন যা, তাতে আঁেক উঠে সকলেই একবাক্যে বলবে যে, ভাগ্যিস তেমন মৌলবাদী জঙ্গী সংঘাতের লীলাভূমি, প্রতিদিনকার নির্বিচার হামলা-হত্যার নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে তো আমরা আজ বহুলাংশে মুক্ত থাকতে পারছি। এসবই আমাদের বড় প্রাপ্তি।
দেশে আজ চরম হতাশা বিরাজ করছে। কর্মসংস্থানের তেমন উল্লেখ যোগ্য সুযোগ সৃষ্টি হয় নি। লাভের মুখ দেখছে না অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান। কর্মী ছাটাই করা হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে। আর এর মূলে কাজ করছে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারের দায়িত্বশীলদের দুর্নীতি আত্মীকরণ। অন্যদিকে বিশেষ করে যুবসমাজ সঠিক কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। ফলে সমাজে এর প্রভাব হিসাবে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে তারা হতাশ হয়ে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এত সব পরেও আমদের প্রাপ্তি কোন অংশে কম নয়। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করছে। রোগ ব্যাধির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে মানুষের গড় আয়ু আরো বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদাচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে, কমেছে দরিদ্রতা। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসাবে নির্বাচন ব্যবস্থা আরো স্বচ্ছ ও সু-প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্থায়ী হয়েছে বহু দলীয় ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি বার বার হোচট খেলেও চলছে ধীর গতিতে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাধ্যমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠা জঙ্গিবাদ প্রতিহত করতে পারলে আমরা কাঙ্খিত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।

লেখক: প্রাক্তন সভাপতি, ল স্টুডেন্টস ফোরাম, সাতক্ষীরা