শহীদ জায়েদাকে স্মরণ : অনির্বাণ জায়েদানগরে ভূমিহীনদের লড়াই


129 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শহীদ জায়েদাকে স্মরণ : অনির্বাণ জায়েদানগরে ভূমিহীনদের লড়াই
জুলাই ২৮, ২০২১ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

জায়েদানগরের সেই বাতিটি আজও দেদীপ্যমান। জায়েদার সমাধিতে এখনও মানুষ শ্রদ্ধা জানায়। স্মরণ করে তার আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্বের কথা। তার বুক ফুড়ে ঘাতকদের বুলেট জায়েদার জীবনকে কেড়ে নিয়েছিল। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত জায়েদা খাতুনের ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেছে।
১৯৯৮ এর ২৭ জুলাই। বাবুরাবাদ থেকে জায়েদানগর। দুই দশকেরও বেশি সময় আগের এই দু’টি বাক্যের কথা মনে পড়লেই আমার সামনে ভেসে বেড়ায় দীর্ঘ দীর্ঘ মিছিল, বিক্ষুব্ধ সফেন সমুদ্রের মতো পথসভা, জনসভা, অগ্নিময় শব্দাবলির অফুরাণ ধ্বনি প্রতিধ্বনি, আর আকাশমুখে উত্থিত হাজার হাজার মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতিচ্ছবি।
আজ সেই ধ্বনি নেই, মুষ্টিবদ্ধ ফরিয়াদও নেই, নেই মিছিলের দৃপ্ত পদচারণা। তবু স্মৃতি যেনো উগরে ওঠে। কারণ আজ সেই ২৭ জুলাই।
সাতক্ষীরার দেবহাটা কালিগঞ্জের সেদিনের সে উত্তেজনাকর দৃশ্য আজ অনুপস্থিত হলেও ২৭ জুলাই পরবর্তীকালে সাতক্ষীরার আরও অনেক ভূমিহীন নেতা নেত্রী খাস জমির লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছেন। এখন সেসব নিয়ে চলছে কেবলই টানাপড়েন, পাল্টা প্রতিশোধ। ১৯৮৮ সালে সাতক্ষীরার বাঁকালে সরকারি খাসজমি ব্যবহারকারী ভূমিহীনদের ওপর নির্মম নির্যাতন নিপীড়নের জেরে রিকসাচালক সাবুর আলির দুগ্ধপোষ্য শিশু দোলনায় পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল, তা আরও বেগবান রূপ নেয় ১৯৯৮ এর ২৭ জুলাই বাবুরাবাদ ভূমিহীন চরে কৃষকবধূ জায়েদার আত্ম বিসর্জনের মাধ্যমে। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে মিছিলে নেতৃত্বদানকালে পুলিশ ও ভাড়াটে বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান জায়েদা খাতুন। বেগবান হয়ে ওঠে ভূমিহীনদের সংগ্রাম। হত্যার বিচার দাবিতে সাতক্ষীরা হয়ে ওঠে উত্তাল। আন্দোলনের মুখে সরকার সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক দেবদত্ত খীসা ও পুলিশ সুপার আবুবকর সিদ্দিককে স্ট্যান্ড রিলিজ করে। এ ছাড়া ভূমিহীনদের স্বার্থ বিরোধী কান্ডের সাথে জড়িত থাকার দায়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়াত সংসদ সদস্য সৈয়দ কামাল বখত সাকি ও মুনসুর আহমেদ নেতৃত্বাধীন জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি বিলুপ্ত করে ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবর রহমানকে আহবায়ক করে একটি কমিটির ঘোষণা দেন।
সরকারি হিসাব মতে সাতক্ষীরা জেলায় খাস জমির পরিমান ২৮ হাজার ২১০ একর। জেলার অর্পিত সম্পত্তির পরিমান ৬ লাখ ৫২ হাজার ৬২৯ একর। এর মধ্যে সরকারের নিয়ন্ত্রনে আছে মাত্র ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬২৮ একর। এ জমির বড় অংশই সরকারের হাতছাড়া। অপরদিকে সরকারি সুবিধা নিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে কৃষিজমিকে জলমহালে পরিনত করে ভূমির মালিকদের বারবার উচ্ছেদ করায় সাতক্ষীরা জেলায় ভূমিহীনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সমাজের এক শ্রেনীর টাউট জাল দলিল খাড়া করে এসব জমি লুটেপুটে খেতে থাকে। এরই জের হিসাবে ১৯৯৮ সালে দেবহাটা ও কালিগঞ্জের নোড়ার চক, ঝায়ামারি, ঢেবুখালি ১ ও ২, ভাঙানমারি, কামিনীবসু, কাটমহল ও কালাবাড়িয়া সহ ৯টি ভূমিহীন অধ্যুষিত এলাকায় মাগনা দামে জেলা প্রশাসন প্রভাবশালীদের নামে বন্দোবস্ত দেয়। এই জমিতে বসবাসকারী ভূমিহীনদেরই অধিকার, এমন দাবিতে দেবহাটা ও কালিগঞ্জ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয়ে যায় আন্দোলন সংগ্রাম। ১০ মে তারিখে ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ বন্দোবস্তগ্রহনকারী প্রভাবশালীদের হাতে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথম দফায় ভূমিহীন পল্লীতে হামলা করে। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রভাবশালীদের সহায়তার সরকারপক্ষ ও ভূমিহীনদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষের শেষ পরিনতি হিসাবে সামনে চলে আসে ৯৮ এর ২৭ জুলাই। তীব্র আন্দোলনের উত্তেজনা যখন চারদিকে ছড়িয়ে গেছে তখন পুলিশ তাদের ভাড়াটে বাহিনী নিয়ে ভূমিহীনদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ ও ভাড়াটে বাহিনীর গুলিতে বাবুরাবাদের কৃষকবধূ জায়েদা খাতুন নিহত হন। এসময় ২৩০ জন ভূমিহীন যাদের অধিকাংশ নারী তারা আহত হন। এ ঘটনায় দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলজুড়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বারুদের মত ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকবধূ জায়েদার এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসাবে জনমতের মুখে বাবুরাবাদ ভূমিহীন পল্লীর নামকরণ হয় জায়েদানগর। আজও সেই জায়েদানগর টিকে রয়েছে। ভূমিহীনরা সরকারের কাছ থেকে দলিলের মাধ্যমে খাসজমি লাভ করেছেন। এর পরও এখনও পুরোপুরি এই ভূমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
এদিকে ১৯৮৮তে বাঁকালে যে ভূমিহীন আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তারপর দ্বিতীয় দফায় দেবহাটা কালিগঞ্জের দেশ কাঁপানো আন্দোলনে ভূমিহীনরা শামিল হতে থাকে। পরপরই বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাসজমি পাবার দাবিতে সাতক্ষীরায় আন্দোলনরত ১৮ জন ভূমিহীন নেতা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। এরই মধ্যে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী দক্ষিনাঞ্চলের কৃষক নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর খুন হন ২০০৯ এর ৫ ডিসেম্বর। পর্যায়ক্রমে ১৯৯৯ সালে আশাশুনির কুন্দুড়িয়ায় লাঠিয়াল বাহিনীর হামলায় নিহত হন ভূমিহীন কিষানী ফরিদা খাতুন। ২০০০ সালে বিল শিমুলবাড়িয়ায় নিহত হন ইসহাক ফকির। একই সালে কালিগঞ্জের মৌতলা ও কৃষ্ণনগরের ৭০০ বিঘা খাস জমি থেকে উচ্ছেদের হামলয় পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ভূমিহীন অহেদ আলিকে। এ সময় পুলিশের হেফাজতে থাকা ইয়াহিয়া মাহবুবব প্রাণ হারান। ২০০১ সালে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে কবির হোসেন, ২০০৪ সালে বৈরাগীর চকে কৃষকবধূ ছবিরন বিবি, ২০০৫ সালে আশাশুনির দরগাহপুরে ভূমিদস্যুদের হামলায় নিহত হন কিষাণি ফাতেমা খাতুন ও নুরুল ইসলাম। একই সাথে একই উপজেলার শ্রৗউলা গ্রামে মা ও তার মেয়েকে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ২০০৬ সালে অপহরনের ১০ দিন পর বৈরাগির চকে খুন হন ভূমিহীন নেতা আবুল হোসেন। একই বছরের নভেম্বরে বৈরাগির চকে ফের খুন হন ভূমিহীন নেতা কবির সানা। ২০০৪ সালে নিহত হন সাতক্ষীরা সদরের মাগুরা গ্রামের আনারুল ইসলাম। ২০০৯ সালে শ্যামনগরের পাতাখালিতে খুন হন ভূমিহীন নেতা ইসমাইল হোসেন। ২০১৫ সালে চিংড়িখালি বৈরাগির চকে খুন হন আশরাফ মীর ও তার শ্যালক ইসহাক আলি।
এভাবে দিনের পর দিন ভূমিহীনদের আন্দোলন যেমন জোরদার হতে থাকে তেমনি তাদের ওপর নেমে আসতে থাকে সরকার ও প্রভাবশালী বাহিনীর নৃশংসতা। একই সাথে ভূমিদস্যুদের দাপটও বাড়তে থাকে।
২৩ বছর আগে আন্দোলনের যে দীপ শিখা প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল তা আজও অনির্বাণ রয়েছে। আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভূমিহীনদের মধ্যকার আত্মকলহ, রাজনৈতিক দলবাজি, সন্ত্রাস সৃষ্টি, ভূমি দখল, সাংগঠনিক বিচ্ছিন্নতা, পরস্পরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করাসহ নানা ধরনের ঘটনা। দক্ষিণ উপকূলের দরিদ্র মানুষের চাহিদা পূরণ করতে হলে এই আত্মকলহ, হানাহানির অবসান ঘটাতে হবে। একই সাথে সরকার ঘোষিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বিতরন তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে।
৯৮’এর সেই উত্তাল দিনগুলিতে সাতক্ষীরার দেবহাটা কালিগঞ্জে ভূমিহীন জনপদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে সাতক্ষীরায় ছুটে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, জাপা প্রধান সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননসহ জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব। তারা প্রত্যেকেই ভূমিহীনদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলেন। প্রত্যেকেই ওয়াদা করেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে ভূমিহীনদের মাঝে সব খাসজমি বিতরন করা হবে। সে বছরের ১৮ আগস্ট দেবহাটার দেবীশহর ফুটবল ময়দানে লক্ষ জনতার মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষনা দেন সরকারের খাসজমি ভূমিহীনদের মাঝেই বিতরন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী ঘোষনা ভূমিহীনদের আন্দোলনকে সফলতার বাতি জে¦লে দেয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেবহাটা ও কালিগঞ্জের খাসজমির বিতরন শুরু হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে। এখনও অব্যাহত রয়েছে।
ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যারা রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন তারা হলেন প্রয়াত অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম,প্রয়াত কৃষক নেতা সাইফুল্লাহ লস্কর, প্রয়াত বামনেতা আশরাফুল আলম টুটু, প্রয়াত সিপিবি নেতা অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ, প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবহাটা উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল গনি, প্রয়াত জাসদ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কুদরত ই খোদা, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল ছট্টু, ভূমিহীন নেতা প্রয়াত আবদুর রশীদ। এখনও মাথা উঁচু করে ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন দুই কিংবদন্তী নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আবু আহমেদ ও অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। এই সংগ্রামের সাথে একাত্ম হয়ে আছেন সময়ের আরও অনেক নেতা।
ভূমিহীন জনপদ বাবুরাবাদ থেকে জায়েদানগরের অধিকার আদায়ের ঝান্ডা আকাশে উড়তেই থাকবে। এই আন্দোলন দেশের ভূমিহীন মানুষের বেঁচে থাকার পথের আলো দেখিয়ে যাবে।

লেখক: এনটিভি ও যুগান্তর প্রতিনিধি, সাবেক সভাপতি সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব