শিক্ষক গাজী মোমিন উদ্দীনের রেডিও শ্রোতা হয়ে ওঠার গল্প


479 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শিক্ষক গাজী মোমিন উদ্দীনের রেডিও শ্রোতা হয়ে ওঠার গল্প
অক্টোবর ৯, ২০১৬ ফটো গ্যালারি শিক্ষা
Print Friendly, PDF & Email

স্টাফ রিপোর্টার:
গাজী মোমিন উদ্দীন, সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের প্রসাদপুর গ্রামের এক অতি সাধারন পরিবারের মানুষ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে শখের বসে রেডিও শুনতে শুনতে পুরোদস্তুর রেডিও শ্রোতা হওয়ার গল্প লিখেছেন আমাদের প্রতিনিধি। গল্পের শুরুতেই তিনি বলেন,ছোট বেলায় রেডিও শুনতাম মানে গান শুনতাম,যা রীতিমত নেশায় পরিণত হয়েছিল। মার্কনীর এই যন্ত্রের সামনেই চলতো আমার পড়াশুনা, নিত্যকাজকর্ম সবই। মাবাবা ভাইবোন প্রথম প্রথম এটিকে অনাসৃষ্টি মনে করলেও ধীরে ধীরে তাদেরও একান্ত সঙ্গী হয়ে উঠল রেডিও। গান শোনার যন্ত্র মনে হলেও রেডিও যে একটি তথ্যযন্ত্র তা  বুঝতে বেশি দেরি হয়নি। অসম্ভব জনপ্রিয় গণমাধ্যম এই রেডিও শুনতে আমাদের বাড়ি ভিড় করতো নারী পুরুষ যুবা সবাই। বিশেষ করে খুলনা বেতারের সোমবারের রাত দশটার নাটক শুনতে উঠানে বসতো পাড়া নয় গ্রামশুদ্ধ মানুষ। মা উঠানে পাটি বিছিয়ে দিতেন। ভলিউম ঘুরাতে ঘুরাতে একদিন ভাঙা ভাঙা বাংলা শুনে নিয়মিত শুনতে লাগলাম।  এটি ছিল বিদেশী বেতারে শোনা প্রথম অনুষ্ঠান। ১৯৯০ সালে প্রথম শোনা সেই বিদেশী অনুষ্ঠান ছিল চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনালের অনুষ্ঠান সিয়ার আই। আর পিছনে ফেরা নয়, রেডিও শোনা শুরু হল পরিকল্পনামাফিক। এতে পড়াশোনার ক্ষতি তো দুরের কথা, বেতার থেকে শোনা বিভিন্ন শব্দ, বাক্য ব্যবহার করতাম পড়াশুনার বিভিন্ন লেখায়। বেশ নতুনত্ব দেখে শিক্ষকেরাও খুশি হতেন। ক্লাসে প্রথম হয়েছি বরাবরই। ঘরে বাইরে,রাস্তায়,বাজারে যেখানে গিয়েছি, সাথে রেডিও থাকতোই। অনেকেই পিছনে হাসতো, তামাসা করতো, বিদ্রুপের হাসি হেসে বলতো, কি রে রেডিওতে যাবি কবে। আমি কখনও কারও কথায় খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাতাম না,আজও। যা ভাল লাগে তাই করতাম।  প্রাইমারীর গন্ডি পেরিয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হলাম, লেখার গতি বাড়ল রেডিওতে, বাড়ল স্টেশনের সংখ্যাও। বাংলাদেশ বেতার ঢাকা,খুলনার পাশাপাশি ভয়েজ অব আমেরিকা, ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন, ডয়েচেভেলে জার্মানী বেতার তরঙ্গ, ফেবা রেডিও, এডভেন্টিস্ট ওয়ার্ল্ড রেডিও, আশারবাণি রেডিও, রেডিও কায়রো, রেডিও তেহরান,রেডিও থাইল্যান্ড, রেডিও ভেরিতাস এশিয়ার বাংলা ও ইংরেজি বিভাগ। রেডিও বাজতো আর আমি পড়তাম,  রেডিওতে লেখায় পোস্টকার্ড আর খাম কিনে দেওয়ার সাহায্য করতো এক বন্ধু। পরে সেও পুরোদস্তুর রেডিও শ্রোতা হয়ে যায়,এখনও আছে। অনেকেই অনেক শখ লালন করেন, আমার শখ ছিল রেডিও শোনা ও লেখা। খুলনা বেতারের লিপিকা,সেতু,ডাকবাক্স, মিতালী,বন্ধন,অংকুর,ঢাকা বেতারের সমীপেষু,বাধন, ভয়েস অব আমেরিকার মিতালি, বিবিসির সংলাপ, জার্মানীর শ্রোতা সংঘের আসর,ফিলিপিনের আলাপন,চীনের শুভেচ্ছা,গ্রীসের কলকাকলীসহ অসংখ্যা অনুষ্ঠান এখনও প্রবলভাবে টানে। আজও আছি বেতারে। শতাধিক রেডিও ক্রয়,বেতার থেকে পাওয়া শতাধিক রেডিও বিভিন্ন শ্রোতাকে দিয়েছি। এখনও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে রেডিও দেই। এই দীর্ঘ সময়ে দেশ-বিদেশী বহু শ্রোতা বন্ধু হয়েছেন, বেড়াতে এসেছেন। অনন্য আনন্দের এক অফুরান বিনোদন রেডিও। সমাজ সংসারের এমন কোন বিষয় নেই,যা নিয়ে রেডিওতে অনুষ্ঠান নেই। নারী ও শিশুদের, কৃষক, শ্রমিক,ছাত্রছাত্রী,যুবক সকলের চাহিদা পুরন করে রেডিও চলেছে জনগনের জয়্যাত্রায়। শ্রোতাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সম্মেলনে গিয়েছি অনেকবার। আজ অনেকেই বেচে নেই,তাদের কথা খুব মনে পড়ে। বেচে থাকা অনেকের সাথে যোগাযোগ কমে গিয়েছে। অনেকে বাবা হয়ে,দাদা নানা হয়েও বেতারে আছেন,রয়েছে সম্পর্ক। কুড়িগ্রামের আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার, শরীয়তপুরের মিজান নকিব,খুলনার আরশাদ আলি বিশ্বাস,স্বদেশ কুমার,বিকাশ রঞ্জন ঘোষ,রেশমা আক্তার রুমী,বাগেরহাটের বাধন,যশোরের মুজিবুল হক,মুনছুর আলি, কুষ্টিয়ার শাহানারা রশিদ ঝর্না, মাগুরার আমজাদ আলি,বকুলকুমার, নারায়নগঞ্জের এইচ এম তারেক,সাতক্ষীরার কামাল সরদারসহ অনেক শ্রোতাক্র ভুলতে পারিনা। বর্তমান সময়ে রেডিও শ্রোতা আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও শ্রোতা আছে বলেই সব রেডিও স্টেশন এখনঅও টিকে আছে। এরপর হাইস্কুল শেষ করে কলেজে এসেও পুরোদমে চলেছে নানান বেতারে লেখালেখি। খুলনা বেতারের সেতুতে সাক্ষাতকার দিতে গিয়ে সে কি রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি আজও আমাকে তাড়িত করে। ফোনে সাক্ষাতকার দিয়েছি বিভিন্ন বিদেশী বেতারে। আজ সব স্মৃতি একত্রিত হয়ে আমাকে করে তোলে আরও রোমানঞ্চিত। এখনও সরকারি চাকুরীর পাশাপাশি বেতার শোনা,লেখালেখির এতটুকু কমতি নেই। পরিবার নিয়ে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছি। বেতার আবার জেগে উঠেছে শ্রোতাদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে। রেডিও অনেক তথ্যের ভান্ডার। শ্রোতাদের একত্রিত করার অনন্য শক্তিসম্পন্ন ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান।  আমরা ছিলাম,আছি থাকব যতদিন বেতার থাকবে। সুস্থ সংস্কৃতি,  মাদকমুক্ত সমাজ,অপরাধম্যক্ত যুবসমাজ আর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানসহ অসাম্প্রদায়িক সমাজগঠন করতে রেডিও মুখীতার বিকল্প নেই।রেডিও বিমুখ মানুষ যদি আবার রেডিও শোনা শুরু করে অনেক ভাল জীবনযাপন করবে বলে আজীবন রেডিওর সাথে সম্পৃক্ত এই শ্রোতা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। রেডিও সর্বত্র, রেডিও সবার জন্য এই শ্লোগান নিয়ে রেডিওর সব কার্যক্রমের সাথে থাকার প্রত্যয় তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।