শিক্ষাবর্ষ নিয়ে তিন বিকল্প


179 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শিক্ষাবর্ষ নিয়ে তিন বিকল্প
আগস্ট ১৩, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

মাধ্যমিকে ৭০, ৫০ ও ৩০ দিন কর্মদিবস, প্রাথমিকে ৫০ নম্বরের বার্ষিক পরীক্ষা, সিলেবাসের অত্যাবশ্যকীয় পাঠ পরের শ্রেণিতে

অনলাইন ডেস্ক ::

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসেই হবে এ বছরের বার্ষিক পরীক্ষা। সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করতে তিন ধরনের বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া গেলে কমপক্ষে ৭০ কার্যদিবস পাঠদান করা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে বিলম্ব হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। তাই ৭০ দিনের পাশাপাশি ৫০ ও ৩০ দিন কার্যদিবস ধরে পৃথক তিন ধরনের সিলেবাস তৈরি করা হচ্ছে।

৭০ দিন সময় পেলে সিলেবাসের কোন অংশটুকু পড়ানো হবে, ৫০ দিন পেলে কতটুকু পড়ানো যেতে পারে এবং ৩০ দিন সময় পেলে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়গুলো পড়াতে হবে, তা নিয়েই এই তিন পরিকল্পনা। মাধ্যমিক পর্যায়ের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা পাঠ্যবই বিশ্নেষণ করে এ তিন ধরনের প্রস্তাব তৈরি করছেন। এরপর এসব প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

শিক্ষার এই ‘রিকভারি প্ল্যান’ (পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা) চূড়ান্ত করতে গতকাল বুধবার এনসিটিবিতে দু’দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু হয়েছে। কর্মশালায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার এ কর্মশালা শেষ হবে।

জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা সমকালকে বলেন, কারিকুলাম ও সিলেবাসের নানা সংক্ষিপ্তরূপ তারা করছেন। পুরো বছরের পাঠ পরিকল্পনা এখন রি-ডিজাইন করা হচ্ছে। কবে নাগাদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে তার ওপর নির্ভর করে পৃথক পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা কেবল বিকল্প নানা পাঠ পরিকল্পনা সাজিয়ে দেবেন। স্কুল খোলার পর এক মাস পেলে কী পড়ানো হবে, দুই মাস সময় পেলে কী পড়ানো হবে, তা নিয়েই এ পরিকল্পনা। তারা চাইছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে বর্তমান শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল হক বলেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করার কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে অংশগুলো এই শিক্ষাবর্ষে পড়ানো সম্ভব হবে না, পরবর্তী শ্রেণিতে আগামী বছর সিলেবাসের সেই অংশটুকু অত্যাবশ্যকীয় পাঠ হিসেবে পড়ানো হবে। এতে করে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার কোনো ঘাটতি হবে না।

গতকালের কর্মশালায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেপ্টেম্ব্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে স্কুল খোলা সম্ভব হলে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস পড়িয়ে বার্ষিক পরীক্ষার আয়োজন করা হবে। বর্তমান সিলেবাসের যে অংশটুকু গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো রেখে বাকিগুলো বাদ দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব না হলে অটো পাসের মাধ্যমে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ক্লাসে উন্নীত করা হবে। অন্যদিকে, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) প্রাথমিকের রিকভারি প্ল্যান তৈরি করেছে। বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু) তৈরি করেছে মাধ্যমিকের রিকভারি প্ল্যান। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেই এনসিটিবিতে কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিটি শ্রেণির ‘কারিকুলাম ম্যাপিং’ করে রিকভারি প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৩৯ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে এ বছর জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা না নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, একাধিক বিকল্প নিয়ে ভাবা হচ্ছে। তাই কোনো কিছুই এখনও চূড়ান্ত নয়। শিক্ষাবর্ষ প্রায় শেষের দিকে। এ অবস্থায় খুব দ্রুত নিতে হবে সিদ্ধান্ত। সুপারিশগুলোকে শেষ মুহূর্তে যাচাই-বাছাই করে শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানাবে সরকার।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও এইচএসসি, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কমপক্ষে এক মাস সময় নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বেডু জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৮৮টি কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। ১৬ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মাত্র ৪১ দিন কর্মদিবস পেয়েছিল, কিন্তু এ সময়ে তেমন একটা লেখাপড়া হয়নি। যদি ১ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু করা সম্ভব হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা ৬৬ দিন পাচ্ছে। ১ অক্টোবর থেকে ৫২ দিন কর্মদিবস থাকে। এই সময়েও ক্লাস শুরু করা সম্ভব হলে শীতকালীন ১০ দিনের ছুটি বাতিল করা বা কমানোর সুপারিশও আছে বেডুর। বেডু মনে করছে, সেপ্টেম্ব্বরে স্কুল খুললে সিলেবাস কমিয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষাই নেওয়া সম্ভব। অক্টোবর বা নভেম্বরে খুললে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সেটি সম্ভব না হলে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই অটো পাসের মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণিতে প্রমোশন দিতে হবে শিক্ষার্থীদের।

‘প্রাথমিকে অটো পাস নয়’ : এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন গতকাল বলেছেন, প্রাথমিক স্তরে এখনই অটো পাস দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। ডিসেম্বরের আগে স্কুল খোলা কিছুতেই সম্ভব না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে অটো পাস দেওয়ার বিষয়টি ভাবা হবে। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আগামী মাসে (সেপ্টেম্বরে) স্কুল খুললে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পিইসি পরীক্ষা হবে। তবে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে স্কুল খোলা হলে নিজ নিজ স্কুলে এমসিকিউ ৫০ নম্বর ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। ডিসেম্বরে স্কুল খোলা হলে প্রাথমিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে অটো পাস দেওয়ার কথা ভাববে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে তাদের প্রস্তাবগুলো আগামী রোববার প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। তারপর প্রধানমন্ত্রী যা সিদ্ধান্ত দেন, তার আলোকে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেএসসি ও এইচএসসির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য :জেএসসি পরীক্ষা বাতিল এবং এইচএসসি পরীক্ষার কাল্পনিক তারিখ সংক্রান্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল গণমাধ্যমে এক বক্তব্য পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বছরের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা হচ্ছে না মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী কভিড মহামারিকে বিবেচনায় নিয়ে জেএসসি পরীক্ষার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চেয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা তাদের পর্যবেক্ষণসহ কিছু বিকল্প প্রস্তাব প্রদান করেছেন। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। ইতোমধ্যে কিছু গণমাধ্যম উল্লেখিত বিষয়ে সারসংক্ষেপ প্রণয়ন করা হয়েছে মর্মে সংবাদ প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে, এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের তারিখ নিয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কল্পিত তারিখ প্রকাশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে আরও বলা হয়, মহামারিকে বিবেচনায় নিয়ে জেএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বিকল্প নিয়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভাবছে। এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কথা বিবেচনায় নিয়ে শিগগিরই সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অসমর্থিত কোনো মাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত না হতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।