শিশুদেরকে ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা দিতে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নেই


148 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শিশুদেরকে ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা দিতে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নেই
নভেম্বর ১৬, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ মাখন লাল বিশ্বাস ॥

বর্তমান সময়ে অনলাইনে শিশুদের যৌন হয়রানি একটি ভয়াবহ সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। যদিও সেটা আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারনে সেভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না। শিশুদের বিকাশে অনলাইনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এর অপব্যবহারের দিকটা বিবেচনা করে এ সম্ভাবনার দুয়ার শিশুদের জন্য বন্ধ না করে বরং অনলাইনে শোষনমূলক বিষয় এবং উপকরন হতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অনলাইনের প্লাটফরমকে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত করে তুলতে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নেই। গত কয়েক বছরে আমাদের সমাজে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারে সমাজের মানুষ একদিকে যেমন কোথায় কি ঘটছে জানতে পারছে, অপরদিকে তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের প্রভাবে সমাজে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে তা নিয়ে সকল বিবেকবান মানুষের এখন উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা বেড়েই চলেছে। আমরা এর থেকে শিশুদেরকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর। আদিম যুগের বর্বরতা ও অন্ধকার যুগকে উপেক্ষা করে যতই আমরা উন্নতির মাধ্যমে সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, ততই পেছন থেকে কিছু অশুভ চক্র তথা যৌন অপরাধকারীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে শিশুদেরকে ক্রমান্বয়ে নির্যাতন ও নিপিড়নের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। যা থেকে সুরক্ষা দিতে না পারলে আমাদের কোমলমতি শিশুদের উচ্চাভিলাসী স্বপ্নের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের সন্তানেরা আমাদের ভবিষ্যৎ উত্তরসূরী, আমাদের কর্ণধাররা এরকম একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাড়িয়ে আছে। সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের জন্য ইন্টারনেট এখন উন্মুক্ত। ইন্টারনেট হলো বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত অসংখ্য নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। যোগাযোগ ও তথ্য আদান প্রদানের অন্যতম একটি মাধ্যম। কাজেই এরকম এক অবারিত জ্ঞানের ভান্ডার আহরন থেকে শিশুদের বিরত রাখা তাদের বিকাশের পথে বড় ধরনের অন্তরায়। তাই আমাদের সকলকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সত্যিকার অর্থে ঝুকিপূর্ন ইন্টারনেট ব্যবহার শিশুদের জন্য নির্যাতন ও হয়রানির একমাত্র কারন। ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যবহার কারী শিশুরা যত বেশী ইন্টারনেটের ভাল-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে অবহিত থাকবে তত বেশী তারা ইন্টারনেটের সুফল ভোগ করতে পারবে ও এগিয়ে যাবে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে অনেকে নানাধরনের অপরাধ ও হয়রানির সংগে জড়িয়ে পড়ছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্মে কিশোরীরা নানা ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ ধরনের হয়রানি বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে যেমন- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লিল, অপমানজনক মন্তব্য, কোন মেয়ের ছবি তার অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া, ছবি বিকৃত করে নেটে ছড়িয়ে দেওয়া, গোপনে ভিডিও করা, পর্নোগ্রাফি বা অশ্লিল ছবি কোন পোষ্টে ট্যাগ করে দেওয়া, বিভিন্ন ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে কোন কিছু হাছিলের চেষ্টা করা, ফেক আইডি থেকে বাজে ম্যাসেজ বা ভিডিও শেয়ার করা, আবেগীয় সম্পর্ক স্থাপন করে নানা ধরনের যৌন কর্মে বাধ্য করা, অর্থ বা উপহার প্রদানের মাধ্যমে যৌনতামূলক কাজে প্ররোচিত করা ইত্যাদি। এছাড়া অনেক সময় ধারন করা স্থির চিত্র বা ভিডিও বানিজ্যিকভাবে ত্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা গ্রহন করে থাকে। এভাবে কিশোরীরা অনলাইনে যৌন শোষন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি আমাদের সবাইকে ইতিবাচক হতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা ও সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করার ব্যপারে আমরা যত বেশী শিশুদের প্রতি ইতিবাচক হবো তত বেশী আমাদের শিশুরা নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকবে। শিশুদেরকে অনলাইনের ব্যবহার থেকে সুরক্ষিত রাখতে মা বাবা ও শিক্ষকদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য মা-বাবা ও শিক্ষকদেরকে শিশুদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরনের মাধ্যমে খোলামেলা ও সুদৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে শিশু নির্যাতিতরা লর্জ্জা,সংশয়,ভয়ে ও সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার কারনে মুখ খুলতে চায় না ও অভিভাবককে বিষয়টি অবহিত করে না। এর ফলে তারা নানা ধরনের নির্যাতনের স্বীকার হয়। শিশুর হাতে ডিভাইস তুলে দেওয়ার সাথে সাথে তাকে শিখিয়ে দিতে হবে এর নিরাপদ ব্যবহার, তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটের সাথে। সরকারকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারবিধি পাঠ্যপুস্তকে সংযুক্ত করতে হবে এবং চলমান আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। বিকৃত যৌন আসক্তির মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন ও তাদের মুখোশ উন্মোচন করা দরকার ।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শিশু যাদের মধ্যে আছে সুপ্ত প্রতিভা। তাদের এই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ইন্টারনেটের কোন বিকল্প নেই। এইসব ভবিষ্যৎ কোমলমতি প্রতিভাবান নিষ্পাপ শিশুদেরকে নিরাপদযোগ্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে বিকশিত করে তোলার উপর নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যত স্বপ্ন ও কাঙ্খিত বাংলাদেশ। আমাদের দেশে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রন আইন ২০১২ প্রণীত হয়েছে; কিন্তু সামাজিক ভীতি সাধারণ মানুষকে এতটাই জিম্মি করে রেখেছে যে তারা ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশুর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি খারাপ উক্তি করলে, অশালীন কোনো আচরন করলে শাস্তি ও জরিমানার বিধান থাকা সত্বেও কেউ কোন রকম উদ্যোগ নিতে সাহস পায় না।
ইন্টানেটের মাধ্যমে যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতন থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখার জন্য সামাজিক আন্দোলন তথা জনসচেতনতা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অগ্রগতি সংস্থার বাস্তবায়নে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সহযোগিতায় সকলে একতাবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে, কিশোর-কিশোরী তথা শিশুর আলোকিত ভবিষ্যত গড়ে তোলার লক্ষে ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধে জনসচেতনতা গড়ে তুলি ও অনলাইনে নির্যাতন ও শোষনমূলক বিষয় ও উপকরন হতে শিশুদের সুরক্ষিত রাখি। সেইসাথে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে তাদেরকে উৎসাহিত করি। আমাদের সংবেদনশীল সচেতন মানসিকতাই পারে এ ধরনের কঠিন অবস্থা থেকে শিশুদেরকে নিরবিচ্ছিন্ন সুরক্ষা দিতে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বির্র্নিমানের কাঙ্খিত স্বপ্ন সফল করতে।

লেখক : মাখন লাল বিশ্বাস (প্রধান শিক্ষক), বাঁকাল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সদর, সাতক্ষীরা।